কিংবদন্তি সাংবাদিক আবদুল গাফফার চৌধুরী জাদুর কলম নিয়ে জন্মেছিলেন। তিনি অত্যন্ত মেধাবী, প্রথিতযশা সাংবাদিক ও লেখক ছিলেন। সমাজ, দেশ, রাষ্ট্র, বাঙালির কৃষ্টি-সংস্কৃতি-এমন কোনো ক্ষেত্র নেই, যেখানে তার পদচারণা ছিল না। ভাষা আন্দোলনের কালজয়ী গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ লিখে বাঙালির হৃদয়ে তিনি অমর হয়ে আছেন। যতদিন বাঙালি, বাংলা ভাষা এবং বাংলাদেশ থাকবে, তত দিন আবদুল গাফফার চৌধুরী স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
বৃহস্পতিবার (৯ জুন) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) অডিটোরিয়ামে আবদুল গাফফার চৌধুরীর স্মরণসভায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
স্মরণসভায় প্রধান আলোচক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সামাদ বলেন, ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার বিচার হবে আমরা কল্পনাও করতে পারিনি। তারপরেও এটা হয়েছে। আর যারা এই বিচার দাবি করেছেন, তাদের মধ্যে পথিকৃৎ হলেন সাংবাদিক আবদুল গাফফার চৌধুরী। তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও রক্ষার কথা বলেছেন। একইসঙ্গে বাঙালি সংস্কৃতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে তার জোরালো ভূমিকা ছিল।’
অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সামাদ বলেন, ‘১৯৯২ সালে এক আলোচনায় বিশিষ্ট সাংবাদিক গাজীউল হক বলেছেন, আমরা বঙ্গবন্ধুকে রক্ষা করতে পারিনি। কিন্তু আমাদের শেখ হাসিনাকে রক্ষা করতে হবে। পরবর্তীতে আবদুল গাফফার চৌধুরীও বিভিন্ন সময় একই কথা বলেছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘গাফফার ভাই আমাদের বিভিন্নভাবে উদ্বুদ্ধ করেছেন, সাহস যুগিয়েছেন। আজকে তার জীবনী মোবাইলে টোকা দিলে বের হয়ে আসে। তার জীবনী থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে।’
বিশিষ্ট এই কবি ও শিক্ষাবিদ বলেন, ‘যেই জ্ঞান আত্মশক্তি জোগায় না, সেই জ্ঞান বৃথা। কিন্তু তারপরেও আজকে আমরা দেখতে পাচ্ছি, আজকে জ্ঞান নাই, বিদ্যা নাই কিন্তু ধূর্ত হচ্ছে সবাই। এখান থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।’
গাফফার চৌধুরীকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘১৯৫০ সাল থেকে সাংবাদিকতা করে ধাপে ধাপে তিনি এ পর্যন্ত এসেছেন। নিজেকে অমর করে রাখা মোটেও সহজ কাজ নয়। কিন্তু তিনি সেই কাজটাই করতে পেরেছেন। আজকে শুধু বাংলাদেশে নয়, সিয়েরালিওনের লোকেরা তাঁর গান আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফ্রেবুয়ারি নিজেদের ভাষায় ও বাংলা ভাষায় গাইছেন।’
নাট্যকার ও অভিনেতা মামুনুর রশীদ বলেন, ‘কিংবদন্তি সাংবাদিক আবদুল গাফফার চৌধুরী জাদুর কলম নিয়ে জন্মেছিলেন। তার লেখার এমন টান যে শুরু করলে শেষ না করা পর্যন্ত নিস্তার নাই। প্রবল স্মৃতিশক্তিই তার অসাধারণ সম্পদ।’
স্মৃতিচারণ করে মামুনুর রশীদ বলেন, ‘আবদুল গাফফার চৌধুরী ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে গত হওয়ার আগ পর্যন্ত লেখা দিয়ে বিশাল ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। তার লেখা রক্তক্ষয়ী বাংলাদেশকে ধারণ করে আছে। বাংলাদেশ এবং বাংলা ভাষা যত দিন থাকবে, তত দিন আবদুল গাফফার চৌধুরী আমাদের মাঝে অমর হয়ে থাকবেন।’
সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ বলেন, ‘আবদুল গাফফার চৌধুরী অত্যন্ত স্পষ্টবাদী মানুষ ছিলেন। তিনি কখনও নিরপেক্ষ ছিলেন না। তিনি মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতার পক্ষে ছিলেন। তার এই গ্রহণযোগ্যতার কারণ ছিল স্পষ্টবাদিতা। তার সমালোচনা ছিল বন্ধুর উপদেশের মতো।’
গোলাম কুদ্দুছ বলেন, ‘তিনি প্রকৃতপক্ষে মুক্তিযুদ্ধের বন্ধু, বাঙালির বন্ধু, বাঙালি সংস্কৃতির বন্ধু এবং বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সরকারের বন্ধু ছিলেন।’
স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘আবদুল গাফফার চৌধুরী বাঙালিত্বকে মগজে-মননে কৈশোর থেকেই ধারণ করেছেন এবং মৃত্যু পর্যন্ত বিচ্যুত হননি। বাংলাদেশ, বাঙালি, বাঙালির সংস্কৃতি তাকে প্রতিটি মুহূর্তে জাগ্রত রাখতো। আবদুল গাফফার চৌধুরীকে হারিয়ে আমরা আমাদের শেষ বাতিঘর হারিয়ে ফেললাম। তার মতো একজন কবে তৈরি হবে জানি না।’
সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি বলেন, ‘আবদুল গাফফার চৌধুরী কলাম, বক্তব্য, গান দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের লড়াইয়ে উদ্বুদ্ধ করেছেন। তিনি শারীরিকভাবে লন্ডন থাকলেও অন্তরে বাঙালিত্বকে অনুভব করতেন এবং তিনি আমাদের চেয়ে সঠিকভাবে অনুভব করতেন। তার লেখাগুলো ছিল অনুকরণীয়, অনুসরণীয়। কারণ তিনি বাঙালির অন্তরের ভাবনা জানতেন।’
বিশিষ্ট সাংবাদিক ও কলামিস্ট স্বদেশ রায় বলেন, ‘লেখক ও সাংবাদিক আবদুল গাফফার চৌধুরী সম্পর্কে সবাইকে জানতে হবে। কারণ তিনি বাঙালির দীর্ঘ পথপরিক্রমায় অন্যতম ব্যক্তি।’
স্বদেশ রায় বলেন, ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা যখন শরণার্থী শিবিরে, তখন তিনি আমাদের মানসিক শক্তি জোগাতেন। আর তার বক্তব্য শুনে আমাদের মনের ভেতর একটা অন্যরকম প্রত্যয় আসতো।’
গৌরব ‘৭১ এর সভাপতি মনিরুল ইসলাম মনির সভাপতিত্বে এবং জাগরণ টিভির প্রধান সম্পাদক ও গৌরব ‘৭১ এর সাধারণ সম্পাদক এফ এম শাহীনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বিবার্তা২৪.নেট-এর সম্পাদক বাণী ইয়াসমিন হাসি, বাংলা জার্নালের প্রকাশক ও বিবার্তা২৪ডটনেটের বার্তা সম্পাদক হাবিবুর রহমান রোমেল, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বিশেষ সহকারী গুলশাহানা ঊর্মি, গৌরব ’৭১ এর সাংগঠনিক সম্পাদক রবিউল ইসলাম রুপম, বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বরিকুল ইসলাম বাঁধন প্রমুখ।
প্রসঙ্গত, গৌরব ’৭১ এর আয়োজনে অনুষ্ঠানের সহযোগিতায় ছিল জাগরণ টিভি, বিবার্তা২৪.নেট ও নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত মাসিক অন্যদেশ।