অর্থবিত্তের অসম প্রতিযোগিতা কেন?

ঠিক কী পরিমাণ অর্থবিত্ত থাকলে জীবন স্বাচ্ছন্দ্যে কাটবে তা কেউ বলতে পারে না। তাই কিছু মানুষ অসম প্রতিযোগিতার মোহে অর্থ সঞ্চয় ও সম্পদের পাহাড় গড়তে মরিয়া। সমাজে কারো পৈত্রিক সূত্রেই প্রচুর সহায়সম্পত্তি থাকে, সেইসঙ্গে নিজের উপার্জিত সম্পদ যোগ হয়। দিন শেষে মানুষ শান্তি চায়। শান্তির জন্য অঢেল বিত্তবৈভবের দরকার নেই। বয়স বাড়ে, বার্ধক্য আসে। প্রচুর অর্থ-সম্পদ বার্ধক্যকালে তেমন কাজে লাগে না। তবে সন্তানদের মনোযোগ ও সেবা-শুশ্রূষার প্রাপ্তির প্রত্যাশা করে প্রায় সবাই। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সমাজে এই স্বাভাবিকতার ব্যত্যয় ঘটে মাঝেমধ্যে। 

দেখা যায়, সম্পদ ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে সন্তানদের টানাপড়েনের মধ্যে পড়ে বৃদ্ধ বয়সে জীবন হয়ে ওঠে বিষময়। সমাজ পরিবর্তনে বৃদ্ধাশ্রমের দেখা মিলছে। ভেঙে যাচ্ছে বড় পরিবারগুলো। আমাদের দেশে শেষ বয়সে মানুষের নিরাপত্তা হুমকির মুখে। সন্তান, নাতি-নাতনি ও স্বজনহারা হয়ে নীরবে-নিভৃতে মনোকষ্টে বহু প্রাণ ঝরে যাচ্ছে। শেষ জীবনে যাঁরা অসহায় হয়ে পড়ছেন তাঁদের বেশির ভাগ অঢেল সম্পদের মালিক। যাঁদের সন্তানরা দেশের বাইরে থাকেন অথবা কোনো মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে কর্মরত। এই তালিকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক থেকে শুরু করে শিল্পপতি, ব্যবসায়ী, রাজনীতিক ও সাবেক মন্ত্রী-এমপিও রয়েছেন। মূলত তাদের বিপুল অর্থ-সম্পদ নিয়েই চলে বিবাদ। একদিকে রেখে যাওয়া অর্থের ভাগ-বাটোয়ারা, অন্যদিকে সঙ্গীহীন অসহায়ত্ব। সম্পদের প্রতি সন্তানদের লোভ-লালসার কথা বলে শেষ করা যাবে না। বদ্ধ মা-বাবাকে পিটিয়ে জখম, মেরে ফেলা—এগুলো আমাদের সমাজেই ঘটছে, যা পত্রিকায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়। 

এছাড়া বোন-ভাই বা অসহায় জনকে পাগল সাজিয়ে মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করে আর খোঁজখবর না-নেয়ার ঘটনাও ঘটছে। সহায়সম্পদ আত্মসাতের জন্যই বেশির ভাগ ঘটনা ঘটে। সম্পদের মোহে মানুষ নদী দখল করে, পাহাড় কাটে, অন্যের জমি দখল করে, বন উজাড় করে, সরকারি জমি দখল করে। কিন্তু কী হয় তাদের? তারা কি এক জীবনে সব খেয়ে যেতে পারে? পারে না। বরং মৃতের পরিত্যক্ত (বৈধ বা অবৈধ) অঢেল সম্পত্তি পরবর্তী প্রজন্মের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। মানুষের সহায়সম্পদ কম থাকলে বৃদ্ধকালে অসহায়ত্বেও যেমন শেষ থাকে না, তেমনি অঢেল সম্পদ থাকলেও একাকিত্ব ও অসহায়ত্বের বিড়ম্বনা পোহাতে হয়। দেখা যায়, ধনী বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের খেদমতে কাজের মানুষ রেখে বা হাসপাতালে দিনের পর দিন ভর্তি রেখে কাছের মানুষেরা ব্যস্ত দিন অতিবাহিত করে বা প্রবাসী সন্তানরা কেয়ারটেকার রেখে দেয়। জীবন পালটে গেছে। খুব দ্রুতই সমাজ ইংল্যান্ড, আমেরিকা বা উন্নত দেশের মতো ব্যস্ত জীবনে ঢুকছে। ফলে বাবা-মা, দাদা-দাদি, স্বজন ও পরিবারকে সময় দেওয়ার ‘সময়’ থেকে ছুটি নিচ্ছে সন্তানরা। সহায়সম্পদ নিয়ে মারামারি, খুনোখুনি, মামলা- মোকদ্দমা এই সমাজের কালচারে পরিণত হয়েছে। সম্পদ ডেকে আনে বিপদ। এই বিবাদ একদল মানুষসংশ্লিষ্ট। এখন অর্থ-বিত্ত সমাজের সীমিত সংখ্যক মানুষের হাতে ঘুরপাক খাচ্ছে। 

সমাজের একটা বিরাট সংখ্যক মানুষ গরিব হয়ে পড়ছে। ধনী-গরিবের বৈষম্য প্রকট হচ্ছে। একজনের ধন আছে, অন্যজনের নেই বা কম আছে—এমন লোকদের মধ্যে একশ্রেণি অন্যের সম্পদ লুটে নিচ্ছে। মূলত হিংসা থেকেই দখল, বেদখল, চুরি-ডাকাতি, অপহরণ, খুন, ধর্ষণ বাড়ছে। সীমিত সম্পদে তুষ্ট ও তৃপ্ত থাকতে পারলে সাম্য ও মানবিক মর্যাদা সম্পন্ন সমাজ গঠন সম্ভব হবে।