গল্পের মতো বানিয়ে তোলা সত্য নয় হয়তো, কিন্তু ঘটনা আর রটনা একে অন্যের অনুসারী। সরাসরি না হলেও, প্রকারান্তরে, রটনাও ঘটনার জন্ম দেয়, নিহিত বাস্তবকে নিয়ে আসে প্রকাশ্যে। দুর্যোগ অথবা সুযোগ যে অবশ্যম্ভাবী, অপরিহার্য, ঘটনাই সত্যের রূপান্তরিত সত্যকে আমাদের দৃষ্টিগোচরে নিয়ে আসে। ইউক্রেনে তো বটেই, গোটা পূর্ব ইউরোপ জুড়েও আসন্ন বাস্তবের এরকম পূর্বচিহ্ন গজিয়ে উঠছে।
দনবাসে রুশ আক্রমণ অব্যাহত। ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানের লক্ষণ নেই। বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ বলছেন, রাশিয়ার আগ্রাসি মনোভাব থমকে যাবে। অধিকৃত এলাকা ছেড়ে মস্কো তার সেনা সরিয়ে নেবে। বিশ্ব জনমতের চাপে সাধারণত যা হয়ে থাকে, ইউক্রেনেও সেরকম ঘটবে। আদপে কি এরকম হতে পারে? কী বলছে বিশ্বাসের বাস্তব আর তথ্য।
গত কয়েক মাসে যুদ্ধের সর্বনাশা অভিমুখ ভিন্ন ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। আমেরিকা তলে তলে ইউক্রেনকে অস্ত্র জোগাচ্ছে। পূর্ব ইউরোপে ন্যাটো বাহিনীর তত্পরতাও থামেনি। এর মানে কী? দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ এবং অস্ত্রব্যবসায়ীদের মুনাফা বৃদ্ধির লাগাতার প্রচেষ্টা!
মাসখানেকেরও বেশি সময় জুড়ে, রাশিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দিয়ে এবং অন্যান্য সূত্রেও আমেরিকাকে সতর্ক করে বলেছে, দূরপাল্লার রকেটের মতো অত্যাধুনিক অস্ত্র ইউক্রেনে পাঠানো বন্ধ হোক। না হলে, ‘অপ্রত্যাশিত পরিণতি’র সম্মুখীন হতে হবে। আমেরিকা আমল দেয়নি। যুদ্ধে সরাসরি না জড়িয়েও নিজের লক্ষ্য থেকে সরে যায়নি।
প্রেসিডেন্ট বাইডেন রাশিয়ার সর্বশেষ হুমকিও গ্রাহ্য করেননি। বিভিন্ন সূত্রে বলা হচ্ছে, এ পর্যন্ত আমেরিকা ও ন্যাটো থেকে ইউক্রেন যেসব অস্ত্র পেয়েছে, সেগুলোর তুলনায় আমেরিকায় নির্মিত এম-১৪২ হাই মবিলিটি আর্টিলারি সিস্টেম রাশিয়াকে চূড়ান্ত হুমকির দিকে ঠেলে দেবে এবং রাশিয়াও নতুন অস্ত্র সম্ভার নিয়ে পালটা আঘাত হানবে। আমেরিকার এম১৪২ রকেটকে প্রতিরোধ করতে বা গুঁড়িয়ে দিতে পারে—এ রকম অস্ত্রে মস্কোর ভান্ডারও সমৃদ্ধ, যা বিধ্বংসী আর আত্মরক্ষক।
পশ্চিমি সংবাদমাধ্যম রাশিয়ার সামরিক শক্তিকে যথাসম্ভব খাটো করে দেখছে। রটিয়ে বেড়াচ্ছে, দনবাসে রাশিয়া কোণঠাসা। তার ঘনঘন হামলায় জনক্ষয় ঘটলেও, ইউক্রেনের শক্তিক্ষয় যত্সামান্য। রুশ সেনারা প্রবল চাপে আছে। মার্কিন আর্টিলারি সিস্টেম ইউক্রেনের হাতে পৌঁছলে যুদ্ধচিত্র বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা বিস্তর।
যেসব সেন্টার থেকে রাশিয়া দনবাসে যুদ্ধ পরিচালনা করছে, সেসব জায়গা থেকেই সমরাস্ত্র রণাঙ্গনে নিয়ে যাচ্ছে। সেখানেই মোতায়েন করেছে দূরপাল্লার কামান আর ক্ষেপণাস্ত্র। অর্থাত্ প্রস্ত্ততি আর প্রতিরোধে মস্কো কোনো ধরনের ত্রুটি রাখছে না। তার মানে ইউক্রেনের হাতে অত্যাধুনিক মার্কিন অস্ত্রের সমাগম মানেই সমশক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা আর আঘাত ও পালটা আঘাত অনিবার্য। দীর্ঘস্হায়ী যুদ্ধও অবশ্যম্ভাবী।
প্রথম আর দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের মাঝামাঝি পর্বে যে সংকট তৈরি হয়েছিল, এখন তার ক্ষমতা, ধ্বংসশক্তি এবং নেপথ্যের অর্থশক্তির ভূমিকা বহু বেশি প্রকট ও আগ্রাসি। অর্থশালী প্রতিটি রাষ্ট্র নতুন নতুন অস্ত্র তৈরিতে মত্ত। এসব অস্ত্র উত্পাদনের লক্ষ্য কী? আত্মরক্ষা না দুর্বল দেশগুলোতে অস্ত্র রপ্তানি? বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠীও কি ধনী দেশগুলোর অস্ত্র সরবরাহের আওতায় পড়ে না? রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের পালটা ব্যবস্হা গড়ে তুলতে সন্ত্রাসবাদ কি বিদেশি অস্ত্রের ওপর নির্ভরশীল নয়?
রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ দুষ্টশক্তিকে অস্ত্র উত্পাদন ও অস্ত্র ব্যবসার প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক সুযোগের খোঁজ দিয়েছে। এই অশুভ ব্যবসার অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্ব¼ী যখন যুদ্ধরত, তখন ন্যাটো দেশগুলো কি চুপ করে বসে থাকবে, না অস্ত্র উত্পাদন ও রপ্তানি বাড়িয়ে তুলবে? নিউ ইয়র্ক পত্রিকায় বাইডেনের সাম্প্রতিক লেখায় বেমালুম ফাঁস হয়ে গেল তার স্পষ্ট মনোভাব—‘আমরা ইউক্রেনকে বলছি না তারা তাদের সীমান্েতর বাইরে গিয়ে আমাদের কাছ থেকে পাওয়া অস্ত্রগুলো ব্যবহার করুক। আমরা পুতিনকে ক্ষমতাচু্যতও করতে চাই না। তাকে টিকিয়ে রাখা না রাখা রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ অভিপ্রায়। তার সঙ্গে যতই মতবিরোধ থাকুক, যতই তার আচরণকে অপছন্দ করি না কেন, আমরা ন্যাটো এবং রাশিয়ার মধ্যে যুদ্ধ চাই না। তার মানে বাইডেন চাইছেন, পুতিন ক্ষমতায় থাকুন। ইউক্রেনসহ পূর্ব ইউরোপে ন্যাটোকে অস্ত্র সরবরাহও অব্যাহত থাক। অর্থাত্ অস্ত্রের বাড়তি উত্পাদন বন্ধ হবে না। বাজার বেড়েছে, আরো বাড়ুক।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কিও বাইডেনের এই অনুভূতিই ব্যক্ত করেছেন। দেশের নিউজ চ্যানেলে বলেছেন, রাশিয়ার ভেতর হামলার চালানোর ইচ্ছা নেই আমাদের। আমরা শুধু ইউক্রেনের ঘরোয়া সমস্যা নিয়ে ব্যস্ত। চিন্িতত। জেলেনেস্কির এরকম মন্তব্যের কারণ কী? বাড়তি অস্ত্র সংগ্রহ এবং স্হায়ী যুদ্ধপরিস্হিতি তৈরির আবহ গড়ে তোলা?
জেলেনস্কি ওস্তাদ খেলোয়াড়। সুবিধাবাদী মানুষ। স্বৈরাচার চাপিয়ে দিতে অভ্যস্ত। মুখে গণতান্ত্রিক। আচরণে স্বৈরতান্ত্রিক। রুশ পুতুলকে সরিয়ে ক্ষমতায় বসেই মার্কিন পুতুল সাজতে তত্পর হয়ে উঠেছিলেন। পরে ন্যাটোর দিকে বাধ্যবাধকতার শর্তে হাত বাড়ালেন। এখন ন্যাটোর ভাষায় কথা বলছেন। ওদের হয়েই স্বপ্ন দেখছেন। সামনে জেলেনস্কির মুখাভিনয়। অদ্ভুত অভিনেতা। কখনো হাসছেন। কখনো কাঁদছেন। তার হাসিকান্নার আড়ালে, সম্মুখেও ইউক্রেন ধুঁকছে। উদ্বাস্ত্ত জনস্রোত, পূর্ব ইউরোপের দিকে প্রতিদিন পা বাড়াচ্ছে। ইরাক থেকে সিরিয়া, ইয়েমেন থেকে প্যালেস্টাইন, লেবানন থেকে আফগানিস্তান পর্যন্ত এতদিন যে রক্তশূন্য স্রোত দেখেছি আমরা, তারই বর্ধিত চেহারা আজ ইউক্রেন থেকে ক্রমশ পূর্ব দিকে ধাইছে। এর শেষ কোথায়? কোথায় তার অন্তহীন সূচনা?
ইউরোপের বক্ষমূলে আঘাত পড়েনি। পড়লে সে সমস্বরে জিগির তুলত, সমবেদনায় আর্তনাদ করে উঠত। সে এখন লাভ-লোকসানের হিসাব-নিকাশে মগ্ন। অস্ত্র গড়ছে। পাচার করছে প্রকাশ্যে, গোপনে। গোপনের সংকেত আর লেনদেন বড় বেশি ভয়ংকর। মনে পড়ে? পড়ে নাকি তালিবান ও উসামা বিন লাদেনের স্বশিক্ষিত, প্রত্যাশিত যোদ্ধারা বিদেশি অর্থ ও অস্ত্র পেয়েই পরিকল্পিত কায়দায় গুঁড়িয়ে দেয় মার্কিন টাওয়ার? সদর দপ্তরেও আঘাত হানল। ঐ রকম পুনরাঘাতের জঙ্গিরা ফিরে আসবে না, তার নিশ্চয়তা কোথায়? নির্বোধ হাতে গোলাভর্তি বন্দুকের দৃষ্টি সব সময় একপেশে। ক্রোধ তার বোধকে ভোঁতা বানিয়ে দুই হাতে অসংখ্য হিংস্রকে মিলিয়ে দেয়। লেলিয়ে দেয় ধ্বংসকাণ্ডে। ইউক্রেনকে ঘিরে এ রকম ঘটবে না, তা নিশ্চিতভাবে বলা কি সম্ভব? বুকের ওপর খড়্গ, মুখ খুলবে কে?
লেখক:ভারতীয় সাংবাদিক, সম্পাদক, আরম্ভ পত্রিকা