করোনা-পরবর্তী শিক্ষা নিয়ে প্রাসঙ্গিক ভাবনা

করোনা মহামারির কারণে বিশ্বের প্রায় সব দেশেই পড়াশোনায় কমবেশি বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছিল। এই যে শিক্ষায় বিশ্বব্যাপী এমন ব্যাঘাতের ঘটনা ঘটেছে, এর মানে হচ্ছে, কয়েক কোটি শিশু শ্রেণিকক্ষে থাকলে যে একাডেমিক জ্ঞান অর্জন করত, তা তারা করতে পারেনি। উন্নত দেশে নানাভাবে সেটি থেকে উত্তরণের চেষ্টা করা হচ্ছে। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে, বিশেষ করে হাওরাঞ্চল, চরাঞ্চল, পাহাড়ি অঞ্চল ও শহরের বস্তি এলাকায় বসবাস করা পরিবারের শিশুরা একাডেমিক শিক্ষা থেকে পিছিয়ে পড়ার পর এদের একটা অংশ আর স্কুলমুখী হয়নি। বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্য বলছে, শুধু একাডেমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হওয়া নয়, দীর্ঘ সময় স্কুল বন্ধ থাকায় এসব শিশুর একটা অংশ নানামুখী অপরাধের সঙ্গে জড়িত হয়ে গেছে; অর্থাত্ তাদের নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় হয়েছে। আশঙ্কা এটাই, সিলেবাস ছোট করেই আমরা মনে করছি আমাদের শিক্ষার ক্ষতি বুঝি পুষিয়ে দেওয়া গেল! আসলেই কী তাই? গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ, এ থেকে উত্তরণে এসব নিয়ে কে ভাববেন?

পত্রিকায় দেখলাম, ২০২৩ সাল থেকে নতুন শিক্ষাক্রমের বাস্তবায়ন শুরু হবে। বর্তমানে যে শিক্ষাক্রম চলছে, এর সঙ্গে নতুন শিক্ষাক্রমের পার্থক্য কী? বলা হয়েছে, নতুন শিক্ষাক্রমে পরীক্ষার চেয়ে জোর দেওয়া হয়েছে শিখনকালীন মূল্যায়নে। এর মানে হচ্ছে, শিক্ষকেরা শ্রেণিকক্ষেই শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করবেন। এ নিয়েই আশঙ্কা। কারণ স্কুল গত রমজান মাসে কয়েক দিন খোলা রাখার সিদ্ধান্তে অনেক শিক্ষককে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে প্রতিক্রিয়া জানাতে দেখেছি, তাতে এই শঙ্কা অমূলক নয়। আর বিভিন্ন সময়ে উঁচু বেতন স্কেলের জন্য অনেককে সোচ্চার হতে দেখি। দেশ যখন বৈশ্বিক শিক্ষাসূচকের তলানিতে অবস্থান নেয়, এ নিয়ে শিক্ষা খাতের কাউকে একটা মন্তব্যও করতে দেখি না। ঢাকা শহরে প্রতিটি গলিতে কোচিং সেন্টার গড়ে উঠেছে কেন? স্কুল-কলেজে পড়াশোনা ঠিকমতো হয় না বলেই বেশির ভাগ অভিভাবক মনে করেন। উন্নত দেশগুলোর শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর অনুপাত ১ :১২/১৫, আর বাংলাদেশের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর অনুপাত ১ :৩৫। এটি সুষ্ঠু শিক্ষাদানে বড় বাধা, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।

আসন্ন অর্থবছরে (২০২২-২৩) প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন শিক্ষা খাতে টাকার অঙ্কে মোট বরাদ্দ বাড়ছে। চলতি অর্থবছরের তুলনায় আসন্ন অর্থবছরে মোট ৯ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা বেশি বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ দুই মন্ত্রণালয়ের জন্য আসন্ন অর্থবছরে মোট ৮১ হাজার ৪৪৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা চলতি বছরের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছিল ৭১ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকা। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য এবার ৩১ হাজার ৭৬১ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা চলতি অর্থবছরের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছিল ২৬ হাজার ৩১৪ কোটি টাকা। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের জন্য ৩৯ হাজার ৯৬১ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা এ বছরের জন্য করা হয়েছিল ৩৬ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের জন্য ৯ হাজার ৭২৭ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ করা হয়েছিল ৯ হাজার ১৫৩ কোটি টাকা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিক্ষা খাতে করোনা ভাইরাসের প্রভাব কাটিয়ে উঠতে এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য বাজেটে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ প্রয়োজন।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল। যুদ্ধের সময় বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ থাকলেও দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু যেসব খাতকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছিলেন, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল শিক্ষা খাত। ১৯৭২ সালে মোট বাজেটের মধ্যে শিক্ষা ও স্বাস্হ্য খাতের হিস্যা ছিল ২২ শতাংশ। বঙ্গবন্ধু শিক্ষা খাতে জিডিপির ৪ শতাংশ বরাদ্দ দিতে চেয়েছিলেন। তার সময়ে তৈরি কুদরাত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন তাদের রিপোর্টে বলেছিল, শিক্ষা খাতে মোট বাজেটের ৫-৭ শতাংশ দরকার। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা (ইউনেস্কো) দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা খাতে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৬ শতাংশ অথবা মোট বাজেটের ২০ শতাংশ বরাদ্দের কথা বলে আসছে। তবে একবারে এই বরাদ্দ ২০ শতাংশ দেওয়া সম্ভব না হলে অন্তত জাতীয় বাজেটের ১৫ শতাংশ বরাদ্দের কথা বলেছিলেন শিক্ষাবিদেরা। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরেই শিক্ষায় বরাদ্দ ১২ শতাংশের আশপাশেই ঘুরপাক খাচ্ছে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাত মিলে ১৫ দশমিক ৭ শতাংশ বরাদ্দ করা হয়েছিল। তবে একক খাত হিসেবে শিক্ষায় এই বরাদ্দ ১১ দশমিক ৯২ শতাংশ। গত অর্থবছরেও শিক্ষায় বরাদ্দ ছিল ১১ দশমিক ৬৯ শতাংশ। আগামী অর্থবছরেও টাকার অঙ্কে বরাদ্দ কিছুটা বাড়লেও তা ১২ শতাংশের আশপাশেই থাকবে।

২০২০ সালের ৮ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ বাড়তে থাকলে ১৭ মার্চ থেকে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করে সরকার। নানা সময়ে হয় লকডাউন। শিক্ষা কার্যক্রম অন্য সবকিছুর মতোই বন্ধ হয়ে যায়। মাঝখানে ইন্টারনেটভিত্তিক যে অনলাইন শিখন চালু হয়, তা-ও নানা প্রতিবন্ধকতায় খুব সফল হয়েছে বলা যায় না। সবচেয়ে বড় কথা, শিক্ষার্থীদের বড় একটা অংশ অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করবে সেই সক্ষমতা নেই। করোনা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলে দীর্ঘ ১৮ মাস পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একসময় খুলে দেওয়া হয়। অবশ্য শ্রেণি কার্যক্রম সেই সময় স্বল্প পরিসরে চালু করা হয়। সিলেবাস ছোট করা হয় দফায় দফায়। এরপর ২০২১ সালে নতুন করে করোনার সংক্রমণ বেড়ে গেলে আবারও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছুটি ঘোষণা করে সরকার। এভাবে সীমিত আকারে বন্ধ-খোলা—এসব চলতে থাকে। সর্বশেষ ২০২২ সালের জানুয়ারির শেষ সপ্তাহ থেকেও ছুটি শুরু হয়ে ৬ ফেব্র‚য়ারি পর্যন্ত চলে। স্কুল বন্ধ থাকার সময়সীমা পরবর্তী সময়ে আরো দুই সপ্তাহ বাড়ে। শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা থেকে দূরে থাকে দীর্ঘ একটা সময়। এভাবে শিক্ষাব্যবস্থায় এই সংকট তৈরি হয়।

এশিয়ায় শিক্ষা খাতের ওপর ‘কোভিড-১৯-এর প্রভাব ও মোকাবিলা কার্যক্রমবিষয়ক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ’ শীর্ষক একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল ইউনিসেফ ও ইউনেসকো যৌথভাবে। তারা এটি প্রকাশ করে ২০২১ সালের ১৯ অক্টোবর। সেই প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২০ সালের প্রথম দিকে কোভিড-১৯ মহামারি শুরুর পর থেকে স্কুল বন্ধ থাকায় বাংলাদেশে ৩ কোটি ৭০ লাখ শিশুর এবং দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও পূর্ব এশিয়াসহ এশিয়ার প্রায় ৮০ কোটি শিশুর পড়াশোনা ব্যাহত হয়েছে। এছাড়া ২০২১ সালের আগস্টে ইউনিসেফের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, করোনাকালে লম্বা সময় ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় প্রাক-প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষার স্তর পর্যন্ত বাংলাদেশে ৪ কোটিরও বেশি শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের হিউম্যান ক্যাপিটাল ইনডেক্স-২০২০-এর একটি সমীক্ষাও বলছে, বাংলাদেশে একটি শিশু প্রাক-মহামারিকালে চার বছর বয়সে স্কুলে পড়া শুরু করে সর্বোচ্চ ১৮ বছরের মধ্যে স্কুলজীবন শেষ করে থাকে। কিন্তু এই মহামারিকালে শিশুদের স্কুল শুরু করতে হচ্ছে প্রায় পাঁচ-ছয় বছর বয়স থেকে। ফলে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন থেকে শুরুতেই দুই-তিন বছর হারিয়ে যাচ্ছে।

স্বস্তির কথা হলো, বর্তমানে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম পুরোদমে চলছে। তবে মহামারি চলাকালে যেসব শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছিল, অসম শিখন সমস্যা যাদের পিছিয়ে দিয়েছে, তাদের নিয়ে ভাবতে হবে। মাথায় রাখতে হবে, করোনার কারণে অনেক শিক্ষার্থী শিক্ষা থেকে দূরে সরে গেছে। তাদের আবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরিয়ে আনতে প্রচেষ্টা চালাতে হবে। সব মিলিয়ে করোনার কারণে শিক্ষায় বিশাল আকারের যে ক্ষতি হয়েছে, তা পুষিয়ে নিতে সরকারকে শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনতে হবে। পাশাপাশি চালাতে হবে ই-শিখন কার্যক্রম।

লেখক: কথাসাহিত্যিক