ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে যা হতে পারে

ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ চতুর্থ মাসে চলছে। রুশ সেনাবাহিনী এখনো দেশটি দখলে নিতে পারেনি বা যুদ্ধে জয় দাবি করার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। যুদ্ধে রাশিয়ার আসল লক্ষ্য কী, সেটা প্রতিবেশী ইউরোপীয় দেশগুলোর কাছে স্পষ্ট নয়। যুক্তরাষ্ট্রও রাশিয়ার পরিকল্পনা ঠিকমতো অনুধাবন করছে, সেটা সম্ভবত বলা যাবে না। বর্তমান পরিস্থিতি যেন পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য এক ধাঁধা। ইউক্রেনকে সহায়তা করবে, না রাশিয়ার মুখ রক্ষা করে যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসতে সহযোগিতা করবে, নাকি বিকল্প জ্বালানি উৎসের দিকেই সম্পূর্ণ মনোযোগ নিবদ্ধ রাখবে, তা বুঝে উঠতে পারছে না।

রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন কীভাবে এই যুদ্ধ দেখছেন, পশ্চিমারা কি বিষয়টি সেভাবে দেখছে? উত্তেজনা হ্রাস করতে হলে পশ্চিমাদের পরিস্থিতি ভিন্নভাবে দেখতে হবে। পশ্চিমারা ধরে নিতেই পারে, ইউক্রেনের একটি বিশাল অংশ দখলে নেওয়াই রাশিয়ার লক্ষ্য। এই ধারণার ভিত্তিতে রুশ সেনাবাহিনী যদি সেটা করতে না পারে অথবা মিশন অসম্পূর্ণ রেখে সৈন্য ফিরিয়ে নিতে শুরু করে, তাহলে যুদ্ধে রুশ বাহিনীর পরাজয় বিবেচিত হতে পারে। কিন্তু ইউক্রেন দখলে নেওয়াই যুদ্ধের লক্ষ্য, সে রকম কথা মস্কো এখনো বলেনি। যতটুকু মনে হয়, রাশিয়ার উদ্দেশ্য ইউক্রেনের রাশিয়ার বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়ানোর শক্তি একেবারে নিঃশেষ করে দেওয়া। ইউক্রেনের ন্যাটো সামরিক জোটে ঠেকানোই শুধু নয়, ভবিষ্যতে দেশটি যেন রাশিয়ার জন্য কোনো রকম হুমকি হয়ে উঠতে না পারে, সেটি নিশ্চিত করাও এই যুদ্ধের অন্যতম লক্ষ্য। সেদিক থেকে দেখলে রাশিয়া এখনো ঠিক পথে এগোচ্ছে। এ লক্ষ্য পূরণের জন্য রাশিয়ার প্রয়োজন ইউক্রেনের ভূখণ্ডে নিয়মিত সেনা উপস্থিতি বজায় রাখা। রাজধানী কিয়েভ দখল করা বা পুরো ভূখণ্ড দখলে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। পুতিনের দৃষ্টিতে দেখলে তিনি হেরে যাননি, বরং জেতার পথেই রয়েছেন।

এখন ধরে নেওয়া যাক যুদ্ধ শেষ, রাশিয়া নিজ ধারণামতো জিতে গেছে। পরমাণু বিপর্যয় থেকে বেঁচে গেল ইউরোপ। সংঘাত আশপাশে না ছড়ানোয় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল পশ্চিমারা। রাশিয়ার ক্রিমিয়া দখল মেনে নিল ইউক্রেন, দোনবাসকে স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দিল, রুশ দাবিমতো সেনাবাহিনীর আকার ছেঁটে ফেলল এবং প্রতিশ্রুতি দিল কখনোই ন্যাটোতে যোগ দেবে না। প্রশ্ন হলো, তাহলেই কি সংঘাত শেষ হয়ে যাবে? অনেকেই বলতে পারেন, সে রকম কিছু হলে যুদ্ধ থামবে। বিষয়টি কি আসলেই এত সরলরেখায় দেখা সম্ভব? যুদ্ধটি আসলেই রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে। ইউক্রেনকে রাশিয়া দেখছে মূলত পশ্চিমা শক্তিগুলোর প্রতিনিধি হিসেবে। ক্রেমলিন কার্যত লড়ছে পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে, একে একটি প্রক্সি যুদ্ধ বললেও খুব একটা ভুল হবে না। ইউক্রেনের নেতৃবৃন্দ যে মস্কোর সঙ্গে স্বেচ্ছায় এই যুদ্ধে নেমেছে তা নয়। যুদ্ধ শুরুর আগেই ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে ইউক্রেনে সামরিক সরঞ্জাম পাঠাতে শুরু করেছিল, সেটি এখনো সবার স্মরণে আছে।

ইউক্রেন রাশিয়ার দাবি মেনে নিলেই সংকটের সুরাহা হবে মনে করা ঠিক নয়। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার ভূরাজনৈতিক উদ্বেগের বিষয়টি মেনে নিলেই কেবল একটা রফা হতে পারে। সেটা না হলে পুতিন সম্ভবত পশ্চিমাদের প্রতি তার লড়াই অব্যাহত রাখবেন। মস্কো মনে করে, ওয়াশিংটন তাদের ভূরাজনৈতিক উৎকণ্ঠা যুগের পর যুগ উপেক্ষা করে এসেছে। ইউক্রেন যুদ্ধ সেই উপেক্ষারই ফল। দেশটি দুই পক্ষের দড়ি টানাটানির মাঝে পড়ে গেছে। যুদ্ধ শুরুর পর কেবল শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়া ছাড়া পশ্চিমাদের সেভাবে পাশে পায়নি কিয়েভ।

ধরা যাক, যুদ্ধ অনেক দিন চলল। নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর মূল্য বেড়ে যাওয়ায় জনবিক্ষোভের মুখে অভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারালেন পুতিন। বর্তমান পরিস্থিতিতে সে রকম সম্ভাবনা না থাকলেও যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে পরিস্থিতি কোন দিকে গড়াবে বলা যায় না। সে অবস্থায় মাশুল গুনতে হবে দেশটির এলিট শ্রেণিকে। তাদের প্রত্যাশা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকুক। রুশ এলিট শ্রেণি সে কারণে পশ্চিমা গণমাধ্যম নিয়ে সন্দিহান। তাদের ধারণা, পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলোই যুদ্ধ প্রলম্বিত করছে। যুদ্ধ শিগ্গির বন্ধ না হলে বর্তমানে উচ্চ দরে গ্যাস বিক্রি করে রাশিয়া যে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হয়েছে, সেটা ধরে রাখা যাবে না। পুতিনের শাসনামলে এ পর্যন্ত প্রতিটি রাজনৈতিক আন্দোলনকে সফলভাবে দমন করা হলেও যুদ্ধ চলাকালে সেটি করা সম্ভব না-ও হতে পারে। সম্প্রতি পুতিনের ঘনিষ্ঠ কিছু কর্মকর্তা আটক হওয়ার পর এই ধারণা এখন অমূলক নয় যে, রাজনৈতিক দিক থেকে তার প্রশাসনে একটি চাপা উত্তেজনা এখন বিরাজ করছে