একটি ঢাল শত্রুকে প্রতিরোধ করে এবং সংকল্পকে নির্দেশ করে। এটি একই সঙ্গে লড়াইয়ের সময় পেছনে লুকানোর বস্তুও। রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ করার পর থেকে, নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন বা ন্যাটোকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় রাজনীতিবিদরা সাহসিকতার বিভিন্ন ধরনের উদ্দেশ্যেই ব্যবহার করেছেন।
কিন্তু কী হবে, যদি এই ঢাল ভেঙে যায় বা মৌলিক কোনো ত্রুটি দেখা দেয়? পশ্চিমা শক্তিগুলো হয়তো সেটা খুঁজে বের করতে পারে। এই মাসে মাদ্রিদে ন্যাটোর শীর্ষ সম্মেলনকে শীতল যুদ্ধের পর থেকে এযাবত্কালের সবচেয়ে পরিণতি ও ‘পরিবর্তনমূলক’ আলোচনা হিসেবে বিবেচিত করা হয়েছে। রাশিয়ার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ‘মুক্ত বিশ্ব’কে রক্ষা করতে ৩০ দেশের জোট কীভাবে একত্রিত হয়েছে তার জন্য অনেকে অভিনন্দন আশা করেছেন। তার পরও বিশাল প্রশ্নবোধক চিহ্ন রয়ে গেছে।
মার্চ মাসে পোল্যান্ডে বক্তৃতা দিতে গিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট এবং ডি ফ্যাক্টো ন্যাটো বস জো বাইডেন একটি টোন সেট করেছিলেন। তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যুদ্ধ থেকে দূরে থেকেও ‘আমাদের সম্মিলিত শক্তির মাধ্যমে ন্যাটো অঞ্চলের প্রতিটি ইঞ্চি’ রক্ষা করা হবে। দুই মাস পার হতেই, বাইডেন দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি সম্পর্কে বিরক্তিকরভাবে অস্পষ্ট রয়ে গেছেন।
যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী বেন ওয়ালেস গত সপ্তাহে আইসল্যান্ডে একই রকম প্রতিধ্বনি করেছিলেন। ওয়ালেস সতর্ক করে বলেছিলেন, রাশিয়ার ভ্লাদিমির পুতিন পরবর্তী সময়ে লিথুয়ানিয়া, লাটভিয়া এবং এস্তোনিয়াকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে, কারণ, ইউক্রেনের মতোই, তিনি ঐ দেশগুলিকে স্বাধীন দেশ হিসেবে দেখেন না। কিন্তু, বাইডেনের মতো, ব্রিটেনের একটি স্বাধীন ইউক্রেনের টিকে থাকার ব্যাপারে কোনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনা নেই।
যদিও অনেক মিত্র এগিয়ে এসেছে, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ইউরোপীয় ন্যাটো সদস্যরা ভয় পেয়ে এমন একটি জোটের পেছনে গিয়ে দাঁড়িয়েছে, যাকে তারা আগে অবজ্ঞা করে আসছিল। তারা কিয়েভের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ জাতীয় প্রতিশ্রুতি এড়াতে এই সংগঠনকে ব্যবহার করছে, যাতে মস্কো আলাদাভাবে রাগান্বিত না হতে পারে।
ইইউ কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের দিবাস্বপ্ন দেখে, ফ্রান্সের ইমানুয়েল ম্যাক্রঁ টক টু অ্যাকশন পছন্দ করেন। জার্মানির ওলাফ স্কোলজ বিভ্রান্তি এবং বিলম্বের প্রতীক। হাঙ্গেরির নিষেধাজ্ঞা-নিরোধক প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান প্রায়শই অন্য পক্ষের হয়ে ব্যাট করছেন বলে মনে হয়।
ফিনল্যান্ড ও সুইডেনের সদস্যপদ আবেদনগুলিকে নাকচ কর্েয তুরস্কের সমস্যা সৃষ্টিকারী প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইপে এরদোয়ান নিষ্ঠুরভাবে নিজের কাজে লাগাতে চেষ্টা করছেন। এটিও একটি ঐক্যফ্রন্টের দুর্বলতা।
ন্যাটোর আক্রমণাত্মক মহাসচিব জেনস স্টলটেনবাগ এই ফাটলগুলি মেরামত করতে লড়াই চালিয়ে যাবেন। পোল্যান্ড এবং অন্যান্য ‘ফ্রন্টলাইন’ রাজ্যগুলি রাশিয়ার সীমান্েত অতিরিক্ত সৈন্য, ভারী অস্ত্র এবং বিমানের স্থায়ী অবস্থানসহ একটি কঠোর ব্যবস্থা চায়। জবাবে, ন্যাটো কর্মকর্তারা ‘দৃঢ় এবং ঐতিহাসিক’ সিদ্ধান্তের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
ইউক্রেনের ক্ষেত্রে ২০০৮ সালের বুখারেস্ট শীর্ষ সম্মেলনে গভীরভাবে দেওয়া প্রতিশ্রুত সদস্যপদ পাওয়ার আশা পরিত্যাগ করেছে, ন্যাটোর সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের আহ্বান বাতিল হয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী দিমিত্রো কুলেবা বলেছেন, ‘অবশ্যই, আমরা সমর্থনের আওয়াজ শুনব... আমরা এর জন্য অত্যন্ত কৃতজ্ঞ।’ আগে ন্যাটোকে ‘কিছুই না করার’ জন্য অভিযুক্ত করেছিলেন। মাদ্রিদে যোগদান করেও তিনি এমন বিশেষ কিছু আশা করছেন না, যেমন, ব্ল্যাক সি নিরাপত্তা।
শেষ মন্তব্যটি ক্ষমার অযোগ্য। ইউক্রেনের বন্দরগুলির ওপর মস্কোর অবৈধ অবরোধকে রুখতে মার্কিন-ইউরোপীয়দের চলমান ব্যর্থতা বিশ্বব্যাপী খাদ্য ঘাটতি তৈরি করেছে। এটি এরকম অনেকগুলি ক্ষেত্রের মধ্যে একটি, যেখানে ন্যাটো রাশিয়ান বাহিনীর ওপর আরো বেশি চাপ প্রয়োগ করতে পারে এবং করা উচিতও তাই—যা পুতিনকে গণহত্যার যুদ্ধ শেষ করতে বাধ্য করতে পারে।
ন্যাটো বেশি কিছু করছে না কেন? একসঙ্গে মিলে, সব যুক্তি, সব ব্যাখ্যার যে ভাবটা দেখানো হচ্ছে তার চেয়ে বরং কোনো কিছু না করা তাৎপর্যপূর্ণভাবে অনৈক্য, শক্তিহীনতা তুলে ধরছে।
প্রাথমিকভাবে ইউক্রেনকে সমর্থন করা, ন্যাটোকে উৎসাহিত করেছিল। গত বছরের আফগান প্রত্যাহারের নিম্নগামী ভাবমূর্তি থেকে ওপরে তুলেছিল।
কিন্তু যদি প্রত্যাশিতভাবে যুদ্ধ বাড়তে থাকে, উভয় পক্ষই মরিয়া হয়ে ওঠে, কূটনৈতিক অচলাবস্থা আরো ঘনীভূত হয়, এবং যদি বৃহত্তর সংঘাতের হুমকি আরো বেড়ে যায়, তবে ন্যাটোর দীর্ঘ অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্বলতা এবং অরক্ষিত অবস্থা যুদ্ধের পেছনে থাকা লোকদের জন্য আরো বিপজ্জনক হয়ে উঠবে। একে সোভিয়েত-উত্তর ধাপ্পাবাজি বলা হতে পারে।
এত বড় একটি সংগঠনে নির্বিঘ্ন রাজনৈতিক ঐক্য আশা করা বাস্তবসম্মত নয়। বাস্তবতা হলো, সামরিক সক্ষমতার প্রেক্ষিতে প্রতিটি সদস্যের কথা বলার সমান সুযোগ রয়েছে। হোক তা অযৌক্তিকভাবে অসম। উদাহরণস্বরূপ, রাশিয়ান পারমাণবিক বা রাসায়নিক উসকানি ন্যাটোর মধ্যে পক্ষাঘাতগ্রস্ত কণ্ঠস্বর তৈরি করার মাধ্যমে বিরোধপূর্ণ অবস্থান তৈরি করতে পারে— এবং পুতিন অবশ্যই এটি ভালোভাবে অবগত। একই সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর বিশাল-অত্যধিক নির্ভরশীলতা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র একটি সামরিক পরাশক্তি, যার সম্মতি ছাড়া কিছুই ঘটে না এবং যার শক্তির পেছনে লুকিয়ে থাকারা তাদের পথ খুঁজতে চেষ্টা করে।
সাংগঠনিক এবং সামরিকভাবেও ন্যাটোর বিস্তার সব জায়গায়। এর তিনটি যৌথ কমান্ড সদর দপ্তর রয়েছে—ইতালি, নেদারল্যান্ডস ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। তবে এর সর্বোচ্চ কার্যালয় বেলজিয়ামে অবস্থিত। যৌথ প্রশিক্ষণ অনুশীলন, অস্ত্র সংগ্রহ এবং বুদ্ধিমত্তা ভাগাভাগির প্রশ্নে বিভিন্ন দেশের অস্ত্র ব্যবস্থার আন্তঃকার্যক্ষমতার অভাব রয়েছে। ইউরো-আটলান্টিক অঞ্চলে রাশিয়ার হুমকি এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সম্প্রসারণবাদী চীনের আগ্রাসি চ্যালেঞ্জের মধ্যেও ন্যাটো ক্রমবর্ধমানভাবে প্রসারিত হচ্ছে।
জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের নেতাদেরও মাদ্রিদে আশা করা হচ্ছে। তাদের একত্রিত দুঃস্বপ্ন :একটি ‘সীমাহীন’ সর্বগ্রাসি চীন-রাশিয়ান বৈশ্বিক অক্ষের সম্ভাবনার মধ্যে তারা ১৯৩৯ সালের নাত্সি-সোভিয়েত চুক্তির ছবি দেখতে পায়।
ন্যাটো তার ১০ বছর মেয়াদি ‘কৌশলগত ধারণা’ প্রকাশ করতে চলছে যে— কীভাবে এই জটিল পরিস্থিতির মোকাবিলা করা যায়। পাশাপাশি ট্রান্স-ন্যাশনাল সন্ত্রাসবাদ, অস্থিতিশীল জলবায়ু পরিবর্তন, সাইবার যুদ্ধ এবং গণতন্ত্রবিরোধী রাষ্ট্রের উত্থান প্রভৃতি বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া যায়। যদিও এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। আরো একটি বিষয়, রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর বাইডেন প্রশাসনের নতুন করে এশিয়াভিত্তিক জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল পুনর্নির্মাণ করতে হয়েছিল। যদিও তা বিলম্বিত সময়ে তড়িঘড়ি করে করতে হয়েছে। এতকিছুর পরও যদি এই অসংখ্য ফ্রন্টকে কার্যকরভাবে এগিয়ে নিতে হয়, তাহলে ন্যাটোকেও পেছন ফিরে তাকাতে হবে— অতীতের ভুল স্বীকার করতে হবে এবং বর্তমান সংকটের জন্যও কিছুটা দায় নিতে হবে।
চেচনিয়া এবং সিরিয়ার যুদ্ধ, ২০০৮ সালে জর্জিয়ায় আক্রমণ, ক্রিমিয়াকে অধিভুক্তি এবং ২০১৪ পরবর্তী সময়ে দনবাস প্রক্সি যুদ্ধ— এসব অপরাধে পুতিনকে শাস্তি দিতে ব্যর্থ হওয়ার পরও ইউক্রেনকে ন্যাটোর সদস্যপদের প্রশ্নে আটকে রেখে আত্মতুষ্ট পশ্চিমা নেতারা অজান্েতই আজকের বিপর্যয়ের পথ তৈরি করেছে।
১৯৯১ সালে সোভিয়েতের পতন ঘটলে ন্যাটো বলটি ফেলে দেয়। ঠিক যেমন ফাইনালের বাঁশি বাজানোর আগে ফুটবল-সমর্থকরা মাঠের ভেতরে প্রবেশ করে! তারা ভাবে খেলা শেষ। কিন্তু বিষয়টা তা ছিল না, এবং এখনো তা নয়।
এই মুহূর্তে, পুতিন ঐ ঢালের ওপর আঘাত করছেন। পশ্চিমাদের পরীক্ষা ফেলেছেন। যদি এর ঝুঁকি-প্রতিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন না হয়, তাহলে শিগ্গিই লুকানোর জন্য কোথাও জায়গা কুঁজে পাওয়া যাবে না। ন্যাটো কি আবার ব্যর্থ হবে?
লেখক: দ্য গার্ডিয়ানের যুক্তরাষ্ট্র সম্পাদক ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক
দ্য গার্ডিয়ান থেকে ভাষান্তর: সুমৃৎ খান সুজন