করোনাকালে হজের প্রস্তুতি

সাম্প্রতিক কালে করোনা মহামারির কারণে মসজিদুল হারম ও মসজিদে নববিতে নানান বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। পর্যায়ক্রমে বিধিনিষেধ অনেকটা শিথিল করা হয়েছে। কিন্তু আগামী হজের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ কতটুকু থাকে তা এখনই বলা মুশকিল। হজ মোবারক সফর, ধর্মীয় সফর, এবাদতের সফর। এ সফর যাতে মহান আল্লাহ পাকের দরবারে কবুল হয় তার জন্য শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতি থাকা আবশ্যক।

পাঁচ দিনব্যাপী হজ কার্যক্রম চলে ৮ জিলহজ থেকে ১২ জিলহজ পর্যন্ত। পবিত্র কাবা এবং মিনা, আরাফাত, মুজদালেফা নিয়ে হজ অনুষ্ঠিত হয়। পবিত্র কাবা থেকে ১৬ কিলোমিটার এরিয়ার মধ্যে পাঁচ দিনব্যাপী পর্যায়ক্রমে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে গমন করে হজ কার্যক্রম সমাপ্ত করতে হয়। হজে রয়েছে তিন ফরজ, ছয় ওয়াজিব। ফরজ নিয়ে মতপার্থক্য না থাকলেও হজের ওয়াজিব ও সুন্নত নিয়ে আমাদের হানাফি মাজহাব ও আহলে হাদিসের মধ্যে রয়েছে মতপার্থক্য। অনেক হজযাত্রী ইন্টারনেটে হজ বিষয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করে ওয়াজিব ও সুন্নতের মধ্যে মতপার্থক্য বুঝতে পারেন।

হজের তিন ফরজ: (১) এহরাম পরিধান করা, (২) এহরাম অবস্থায় ৯ জিলহজ আরাফাতে অবস্থান করা, (৩) ১০ থেকে ১২ জিলহজের মধ্যে পবিত্র কাবা তাওয়াফ করা।

ছয় ওয়াজিব হলো: (১) এহরাম অবস্থায় ৯ জিলহজ দিবাগত রাতে মুজদালেফায় অবস্থান করা, (২) ১০, ১১, ১২ জিলহজ তিন শয়তানের প্রতি তরতিব মতে পাথর নিক্ষেপ (রমি) করা, (৩) হজে তামাত্তো ও কেরানকারীগণ দমে শুকরিয়া (হজের কোরবানি) করা, (৪) অতঃপর মাথা মুণ্ডন বা চুল কাটা, (৫) পবিত্র মক্কায় সাফা-মারওয়া সায়ি করা, (৬) বিদায় তাওয়াফ তথা পবিত্র মক্কা থেকে বিদায়কালীন কাবা শরিফ তাওয়াফ করা। কোনো কোনো হজের কিতাবে ১০ জিলহজ ধারাবাহিকভাবে চারটি কাজ ওয়াজিব উল্লেখ করা আছে। যথা— (১) বড় শয়তানকে সাতটি পাথর নিক্ষেপ করা, (২) কেরান ও তামাত্তো হাজি হলে দমে শুকরিয়া তথা হজের কোরবানি করা, (৩) মাথা মুণ্ডন বা চুল কাটা, (৪) পবিত্র মক্কায় গিয়ে কাবা শরিফ তাওয়াফ করা।

হজের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য এহরাম পরিধান করা। এ পোশাক সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। এ পোশাক পরিধান করলেন মানে তিনি হয়তো হজ করবেন, নয় তো ওমরাহ করবেন। আপনি যদি বাংলাদেশ থেকে জেদ্দা হয়ে পবিত্র মক্কায় যান তবে চট্টগ্রাম বা ঢাকা বিমানবন্দর থেকে এহরাম পরিধান করে নেবেন। আর আপনি যদি দেশ থেকে হজের আগে পবিত্র মদিনায় যান তবে আপনি চট্টগ্রাম বা ঢাকা বিমানবন্দর থেকে এহরাম পরিধান করবেন না। পবিত্র মদিনা থেকে পবিত্র মক্কা আসার সময় এহরাম পরিধান করবেন। জুলহুলায়ফা মিকাত থেকে এহরামের নিয়ত করবেন। অতঃপর ওমরাহ বা হজের নিয়ত করতে হবে।

হজ তিন প্রকার। কেরান, তামাত্তো, এফরাদ। কেরান হজে ওমরাহ ও হজের এহরাম একসঙ্গে। তামাত্তো হজে ওমরাহ ও হজ পৃথক পৃথক। এফরাদ হজে পৃথকভাবে ওমরাহ নেই।

পবিত্র মক্কায় হজের উদ্দেশ্যে হজযাত্রীগণ জমায়েত হতে থাকেন। ৭ জিলহজ হজ কার্যক্রম অনেকটা শুরু হয়ে যায়। ১০-১২ বছর বা তারও আগে ৩০-৪০ লাখ নর-নারী হজ করতেন। অতঃপর সৌদি সরকার হজ করতে কড়াকড়ি আরোপ করায় তা ২৬ লাখে নেমে আসে। চলতি বছর ২০২২ সালে সমগ্র বিশ্ব থেকে মাত্র ১০ লাখ নর-নারী হজ করবেন, যা স্বাভাবিকের তুলনায় তিন ভাগের এক ভাগ বা অর্ধেকের কম। তন্মধ্যে বাংলাদেশ থেকে ৫৭ হাজার ৫৮৫ জন হজ করবেন।

স্বাভাবিক অবস্থায় অধিকাংশ হজযাত্রী ৭ জিলহজ বিকালে হজের প্রস্তুতি নিয়ে মিনায় অবস্থিত তাঁবুতে চলে যান। ৮ জিলহজ দিবাগত রাত চলে যেতেন আরাফাতে। এই দুই ক্ষেত্রে বর্তমান হজযাত্রীর সংখ্যা অর্ধেকের চেয়ে কম হওয়ায় মিনায় গমন ৮ তারিখ সকালে এবং আরাফাতে গমন ৯ তারিখ সকালে সুন্নত নিয়মে হবে; নাকি আগের নিয়মে এক দিন আগে হবে তা আপনি পবিত্র মক্কায় গিয়ে বুঝতে পারবেন। ৯ তারিখ সূর্যাস্তের পর মুজদালেফায় আসবেন। ১০ তারিখ ফজরের নামাজ পড়ে আসবেন মিনায়। ১০, ১১, ১২ জিলহাজ এই তিন দিন মিনায় অবস্থান হজের অংশ। ১২ জিলহজ বিকালে হজ কার্যক্রম শেষ করে মিনা থেকে পবিত্র মক্কায় চলে আসা রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। কিন্তু ১২ তারিখ দিবাগত রাত মিনায় থেকে ১৩ তারিখ শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করে মিনা ত্যাগ করা সুন্নত। যা নবি পাক (স.) করেছেন।

লেখক: সভাপতি, হজযাত্রী কল্যাণ পরিষদ, চট্টগ্রাম