আমাদের দেশের রপ্তানিসজাত পণ্যের মধ্যে প্রক্রিয়াজাত চামড়া অন্যতম। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে চামড়া এবং চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করে প্রতি বছর প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় হচ্ছে। বিদেশে আমাদের দেশের চামড়ার বেশ কদর রয়েছে। গুণগত দিক দিয়ে আমাদের দেশে উৎপাদিত চামড়ার মান অনেক উন্নত।
আমাদের দেশের চামড়ার মান ভালো হওয়ার কারণে পৃথিবীর বিখ্যাত জুতা কোম্পানিগুলো এখানে তাদের জুতার কারখানা স্থাপন করেছে। দেশের চামড়া বিদেশে রপ্তানি হয় পাকিস্তান আমল থেকে। চামড়াশিল্পের সূচনা ঘটে ১৯৬৪ সালের দিকে। তখন পশ্চিম পাকিস্তান এবং আমাদের দেশের শিল্পপতিরা এদেশে বহু ট্যানারি স্থাপন করেছিলেন। তখনো এদেশ থেকে চামড়া বিদেশে রপ্তানি হতো। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর চামড়াশিল্পে কিছুটা ভাটা পড়লেও আবার ৯০ দশকের দিকের চামড়াশিল্পে চাঙ্গা ভাব আসে। ২০০৩ সালের দিকে চামড়া এবং চামড়াজাত পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়।
প্রাপ্ত তথ্য মতে জানা যায়, বাংলাদেশে প্রতি বছর ৩৫০ মিলিয়ন স্কয়ার ফুট চামড়া উৎপন্ন হয়। এর মধ্যে শতকরা ২০ থেকে ২৫ ভাগ চামড়া স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে। বাকি চামড়া বিদেশে রপ্তানি হয়ে থাকে। রপ্তানিকৃত চামড়াগুলো টেইনিং এবং ফিনিশিং মানের হয়ে থাকে। আরো জানা যায়, সারা বিশ্বের মোট চামড়ার ১০ ভাগ চামড়া বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি করা হয়। রপ্তানি আয়ের বেশির ভাগ আয় আসে চামড়াশিল্প থেকে। বর্তমানে বাংলাদেশে বিশ্ববিখ্যাত ব্রান্ডের জুতার কারখানা থাকায় এখানে উৎপাদিত চামড়া জুতা কারখানাগুলোতে ব্যবহূত হচ্ছে। এতে চামড়াশিল্পের আয় হয় প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা।
আমাদের দেশে প্রতি বছর ৩৭৮ মিলিয়ন জোড়া চামড়ার জুতা তৈরি হয়ে থাকে। জুতা উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান হচ্ছে অষ্টম স্থান। বাংলাদেশে বিশ্ববিখ্যাত জুতা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে এবিসি মার্ট, এডিডাস, নাইক, হোগোবস, কে-মার্ট, মার্ক স্পেনসার, স্টেইভ মেডেন, টিমবার ল্যান্ড, সিয়ার্স, এলডো, এইচ অ্যান্ড এম, মাইকেল কোরসসহ বিভিন্ন বিখ্যাত ব্র্যান্ড। জুতা ছাড়াও আমাদের দেশে চামড়ার ব্যাগ, জ্যাকেট, বেল্ট, ওয়ালেট, সুটকেসসহ আরো অনেক পণ্যসামগ্রী উত্পন্ন হয়ে থাকে। আমাদের দেশের জুতাশিল্পে লাখ লাখ লোক কর্মরত আছেন। এতে বেকার সমস্যার কিছুটা সমাধান হয়েছে। জুতাশিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের মধ্যে ৬০ ভাগ শ্রমিক হচ্ছে নারী শ্রমিক। ২০২০-২০২১ অর্থবছরে বাংলাদেশের জুতাশিল্পের আয় হয় ৯৪১.৬৭ মিলিয়ন ডলার। প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায়, দেশের চামড়া এবং জুতাশিল্পের চাহিদা আন্তর্জাতিক বাজারে দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। আগামী ২০২৬ সাল নাগাদ আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের চামড়াশিল্পের রপ্তানি আয় দাঁড়াবে ৪৪০ বিলিয়ন ডলার। এটা আমাদের দেশের রপ্তানি আয়ের ক্ষেত্রে বিরাট সফলতা বলা যায়। দেশের চামড়াশিল্পের আধুনিকায়ন করতে গিয়ে বিদেশ থেকে উচ্চমূল্যে যন্ত্রপাতি আমদানি করতে হচ্ছে।
কাঁচা চামড়া প্রক্রিয়াজাত করতে বিদেশ থেকে কেমিক্যাল আমদানি করতে হচ্ছে। এতে প্রক্রিয়াজাত চামড়ার মূল্য অনেকগুণ বেড়ে যাচ্ছে। অথচ আমাদের দেশে কাঁচা চামড়া সহজলভ্য হওয়ার কারণে কাঁচা চামড়ার কোনো মূল্য নেই। গত কয়েক বছর আগেও কাঁচা চামড়ার অনেক মূল্য ছিল। চোরাই পথে কাঁচা চামড়া পাচার হয়ে যেত। এখন চামড়ার আড়তদার থেকে শুরু করে ট্যানারির মালিকরা পর্যন্ত কাঁচা চামড়া ক্রয় করতে চাইছেন না। কাঁচা চামড়ার চাহিদা এবং মূল্য কমে যাওয়ার রহস্যটা কি, তা আজো জানা গেল না। গত কয়েক বছর ধরে কুরবানির ঈদের সময় গরু, ছাগল, মহিষের চামড়া বিনা মূল্যেও কেউ নিতে চায়নি। এতে লাখ গরু, ছাগল এবং মহিষের চামড়া নষ্ট হয়েছে। ক্ষতি হয়েছে কোটি কোটি টাকার মূল্যবান সম্পদের। এভাবে প্রতি বছর কাঁচা চামড়া নষ্ট হতে থাকলে চামড়াশিল্প ধ্বংস হয়ে যাবে। চামড়া রপ্তানি কমে গেলে আয়ও কমে যাবে। দেশের সম্ভাবনাময় চামড়াশিল্পকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে হবে। এ ব্যাপারে সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
আসন্ন কুরবানির ঈদের সময় কাঁচা চামড়ার বিপর্যয় রোধে সম্প্রতি শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন এমপি বিভিন্ন পদক্ষেপ হাতে নিয়েছেন। এ ব্যাপারে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, এমপি, সচিবদের নিয়ে আলোচনা করেছেন। আসন্ন কুরবানির ঈদের সময় সরকারিভাবে কাঁচা চামড়া ক্রয়ের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। স্থানীয়ভাবে চামড়া ক্রয় করে লবণ দিয়ে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করলে প্রান্তিক পর্যায়ে চামড়ার ভালো দাম পাওয়া যাবে। এ লক্ষ্যে চামড়াশিল্প ব্যবস্থাপনা কতৃর্পক্ষ গঠন, দেশের বিভিন্ন কৌশলগত স্থানে অস্থায়ী চামড়া সংরক্ষণাগার স্থাপন, প্রয়োজনীয় লবণপ্রাপ্তি নিশ্চিতকল্পে জেলা এবং উপজেলা পর্যায়ে লবনের ডিলার নিয়োগ করা হবে, সরকার কর্তৃক নিধার্রিত মূল্যে চামড়া ক্রয়-বিক্রয় নিশ্চিত করতে সব স্টেকহোল্ডারদের সমন্বয়ে একটি কেন্দ্রীয় মনিটরিং সেল গঠন করতে হবে। সঠিকভাবে কুরবানির চামড়া ছাড়ানো, সংগ্রহ এবং সংরক্ষণের ব্যাপারে গুরুত্ব দিতে হবে। শিল্পমন্ত্রীর গৃহীত পদক্ষেপগুলো যদি বাস্তবায়িত হয় তবে দেশের সম্ভাবনাময় চামড়াশিল্প নিশ্চিত ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পাবে। আশা করি, সরকার এব্যাপারে আরো বেশি তত্পর হবেন।
লেখক: প্রাবন্ধিক