রাষ্ট্রের যারা দায়িত্বে থাকেন তাদের কাজ হলো জনগণকে উত্তম সেবা দেওয়া। বিশেষ করে যারা পিছিয়ে পড়া মানুষ এবং দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে সেসব জনগোষ্ঠীকে প্রয়োজন অনুযায়ী সেবা দেওয়াই হচ্ছে মূল কাজ। আমরা বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি বাস্তবায়িত হতে দেখেছি। তবে এ ধরনের সুবিধা উন্নত রাষ্ট্রগুলোয় দেওয়া হলেও বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে এর অনুশীলন তেমন দেখা যেত না। ২০০৮ সালের আগে বাংলাদেশের কোনো সরকারই দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় এত ব্যাপক কর্মসূচি হাতে নেওয়ার সাহস দেখায়নি। বর্তমান সরকার ২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর থেকে গত ১৩ বছরে যে কয়টি কর্মসূচি হাতে নিয়েছে তা জনগণের মনে দাগ লেগেছে।
২০২১-২০২২ অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় ১৩০টি সহায়তা কর্মসূচি ছিল। উক্ত কর্মসূচির জন্য প্রস্তাবিত বাজেট ধরা হয়েছে ১ লাখ ৭ হাজার ৬১৪ কোটি টাকা। যা মোট বাজেটের (৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা) ১৭.৮৩% এবং জিডিপির প্রায় ৩.১১%। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতার মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকার দেশে দরিদ্রতার হার কমিয়ে আনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। গত ১৩ বছরে দেশে দরিদ্রতার হার অনেক কমেছে যদিও কোভিড-১৯ অতিমারির কারণে সরকার দারিদ্র্যবিমোচনে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। গত দুই বছরের বেশি সময় ধরে চলমান কোভিড অতিমারির কারণে সরকারকে বিভিন্ন সময় কয়েক মাস ধরে লকডাউন বাস্তবায়িত করতে হয়েছে। করোনার প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণ করার ফলে অর্থনীতি স্থবির হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। যদিও অন্যান্য দেশের তুলনায় দেশের অর্থনীতির অবস্থা শক্ত অবস্থানে ছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বড় বড় অর্থনীতির দেশে যখন ৩ শতাংশের নিচে প্রবৃদ্ধি তখন বাংলাদেশের অবস্থান ৬ শতাংশের ওপরে ছিল।
বর্তমানে দেশের দ্রব্যমূল্য ঊর্ধ্বমুখী। এমনিতে গত দুই বছরে কোভিড-১৯ মহামারির কারণে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আয় কমেছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব বাণিজ্যের অস্থিরতার কারণে চাল, ডাল, চিনি, ময়দা, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে। দেশে মুদ্রাস্ফীতি বেড়েছে। এতে করে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনধারণ কঠিনতর হয়ে যাচ্ছে। তাদের জীবনযাপন সহজতর করতে দেশের অর্থনীতিবিদরা গরিব মানুষের হাতে সহায়তা হিসেবে নগদ টাকা বাড়ানোর পরামর্শ দিচ্ছেন। কিন্তু সামনের বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় কর্মসূচির বেশির ভাগ ভাতার বাজেট অপরিবর্তিত থাকছে।
আগামী অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় এ খাতে ১ লাখ ১৩ হাজার ৫৭৬ কোটি টাকা বাজেট বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এটা প্রস্তাবিত বাজেটের (৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকা) ১৬.৭৫ শতাংশ । জিডিপির ২.৫৫ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে ২০ লাখ ৮ হাজার প্রতিবন্ধীকে ৭৫০ টাকা করে ভাতা প্রদান করা হচ্ছে। সরকার আগামী অর্থবছরে সুবিধাভোগী ৩ লাখ ৫৭ হাজার বৃদ্ধি করে ২৩ লাখ ৬৫ হাজার উন্নতি করার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। মাসিক ১০০ টাকা বাড়িয়ে ৮৫০ টাকা করা হয়েছে। এই খাতে ২ হাজার ৪২৯ কোটি টাকার প্রস্তাবনা করা হয়েছে। আগামী অর্থবছরে তৃতীয় লিঙ্গের পাশাপাশি প্রতিবন্ধীদের চাকরি দিলে বিশেষ কর ছাড়ের প্রস্তাব করা হয়েছে।
যদি কোনো প্রতিষ্ঠান মোট কর্মচারীর ১০ শতাংশ বা ১০০ জনের বেশি তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তিদের নিয়োগ দেয়, তবে ঐ কর্মচারীদের পরিশোধিত বেতনের ৭৫ শতাংশ বা প্রদেয় করের ৫ শতাংশ যেটি কম তা নিয়োগকারীকে করে রেয়াত হিসেবে অনুমোদনের বিধান বর্তমানে চালু আছে। বর্তমান বিধান সংশোধন করে উভয় ক্ষেত্রে যদি কোনো প্রতিষ্ঠান তার মোট কর্মচারীর ১০ শতাংশ বা ২৫ জনের অধিক প্রতিবন্ধী বা তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তিদের নিয়োগ দেয়, তবে ঐ কর্মচারীদের পরিশোধিত বেতনের ৭৫ শতাংশ বা প্রদেয় করের ৫ শতাংশ যেটি কম তা নিয়োগকারীকে কর রেয়াত হিসেবে অনুমোদনের প্রয়োজনীয় বিধান সংযোজনের প্রস্তাব করা হয়েছে। তারপরও নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তৃতীয় লিঙ্গ ও প্রতিবন্ধীদের চাকরিতে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে বোঝা হিসেবে মনে করে। মানবিক হওয়ার আগ্রহ কম দেখা যায়।
মোট বয়স্ক ভাতা বৃদ্ধি পাচ্ছে না, বয়স্ক ভাতার জন্য ৩ হাজার ৪৪৫ কোটি টাকা অব্যাহত থাকবে। চলতি অর্থবছরে জনপ্রতি মাসিক ৫০০ টাকা করে ৫৭ লাখ ভাতা রোগীকে বয়স্ক ভাতা দেওয়া হচ্ছে। ২৪ লাখ ৭৫ হাজার বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতারা প্রতি মাসে ৫০০ টাকা করে ভাতা পান, তা অব্যাহত থাকবে।
অন্যদিক আগামী অর্থবছরে সরকার গরিবের চালের দাম বাড়িয়ে দিল পাঁচ টাকা। সাধারণত চালের বাজার নিয়ন্ত্রণসহ স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য খাদ্য প্রাপ্তি সহজলভ্য করার লক্ষ্যে সরকার ওএমএস কার্যক্রমের মাধ্যমে নিয়মিতভাবে সুলভ মূল্যে চাল ও আটা বিক্রি করছে। চলতি অর্থবছরে এ কর্মসূচিতে ৫ লাখ ৭০ হাজার টন চাল ও ৪ লাখ ৮৫ হাজার টন আটা বিক্রি করা হচ্ছে। এর মধ্যে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় স্বল্প আয়ের ৫০ লাখ মানুষের মধ্যে ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রি হচ্ছিল নতুন কার্যক্রমে, তা পাঁচ টাকা বাড়িয়ে ১৫ টাকা করা হচ্ছে। এ বরাদ্দ বছরের কর্মহীন সময় যথা সেপ্টেম্বর, অক্টোবর, নভেম্বর এবং মার্চ ও এপ্রিল—এ পাঁচ মাসে ১৫ টাকা কেজি চাল দেওয়া হবে। পরিবারপ্রতি মাসে দেওয়া হবে ৩০ কেজি চাল। এখানে উল্লেখ্য যে, করোনা আসার পর উপকার ভোগী ৫০ লাখ থেকে বাড়িয়ে ৬২ লাখ ৫০ হাজার করা হয়েছিল। খাদ্য মন্ত্রণালয় এবারও সেই সংখ্যাটি চেয়েছিলেন। কিন্তু অর্থ বিভাগ রাজি হয়নি। আগামী অর্থবছরে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিতে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা ভতুর্কি দেওয়া হবে। ১০ টাকা থেকে ১৫ টাকা করায় ভতুর্কি কমবে ৩৭৭ কোটি টাকা। এক্ষেত্রে উপকারভোগী কমানো ঠিক হয়নি।
লেখক: ব্যাংকার, কলামিস্ট।