কেউ যদি আমাকে জিগ্যেস করে তোমার প্রিয় ফুল কী? বিনা দ্বিধায় আমি কচুরিপানা ফুলের নাম বলি। কারণ? সে তো অনেক! প্রথম কারণ, অনাদর আর অবহেলায় বড় হয়েও যে সৌন্দর্যের দিক থেকে নামিদামি ফুল থেকেও অনেক স্নিগ্ধ আর মোহনীয় হওয়া যায়, তার উত্কৃষ্ট উদাহরণ কচুরিফুল। দ্বিতীয় কারণ, বাজারে এই ফুল বিকিকিনি হয় না, অর্থাৎ অর্থমূল্য নেই। আমার কাছে এই নেই অর্থমূল্যটাই অমূল্য। আর সবচেয়ে বড় কারণ, কচুরিপানা পুরো অংশটাই পরিবেশবান্ধব, যা বিভিন্ন ঘনমাত্রায় ক্ষতিকর ভারী ধাতুসমূহ যেমন ক্রোমিয়াম, নিকেল, কোবাল্ট, ক্যাডমিয়ামকে শোষণ করে নেয়, যা অনেকেরই অজানা। গুগল সার্চে অনাদরীয় উদ্ভিদকুলের শীর্ষ তালিকায় কচুরিপানা থাকলেও নানা আঙ্গিকে কচুরিপানার তুলনা শুধুই কচুরিপানাই।
জনশ্রুতি আছে যে, প্রুশিয়ার রানী আইকরনিয়ার শখের টবে থাকা কচুরিপানা, কোনো এক বৃষ্টিস্নাত গোধূলিবেলায় পার্শ্ববর্তী জলাশয়ে চলে আসে। তারপর দ্রুত বর্ধনশীল ও বংশ বিস্তারে পটু কচুরিপানা এক জলাশয় ছাপিয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। কচুরিপানার সাতটি প্রজাতির বৈজ্ঞানিক নামের Eichornia Crassipes এর গণ অংশটি রানী আইকরনিয়ার নাম হতেই নেওয়া বলে অনেকে ধারণা করেন। তবে অধিকাংশের মতে, প্রুশিয়ান শিক্ষামন্ত্রী কার্ল ফ্রেডরিক আইকরনের সম্মানে এই নামকরণ করা হয়েছে। বিভিন্ন নামেই এই কচুরিকে ডাকা হয়ে থাকে, কোথাও Terror of Bengal নাম প্রচলিত। ডিপ্লয়েড গোছের ৩২টি ক্রোমজমের সমন্বয়ে গঠিত এই আগ্রাসি উদ্ভিদটি অঙ্গজ প্রজননের মাধ্যমে জ্যামিতিক হারে বিস্তৃত হয়। বাংলাদেশে কচুরির ইতিহাস খুব বেশিদিনের না। এক সৌন্দর্যপিপাসী স্কটিশ ব্যবসায়ী-পর্যটক জর্জ মরগ্যানের হাত ধরে আজ থেকে প্রায় দেড়শত বছর আগে বাংলায় আসে আমাজন অববাহিকার দাপুটে এই পানা। অত্যন্ত দ্রুতগতিতে বংশবৃদ্ধি করতে সক্ষমতা এই গাছটির গুণগত বৈশিষ্ট্য, একই সঙ্গে এই গুণটিই হলো এই উদ্ভিদের সবচেয়ে বড় দোষ। এই উদ্ভিদ বাংলায় আগমনের অল্প কিছুদিনের মধ্যেই হয়ে পড়ে সমগ্র জাতির মাথাব্যথার কারণ।
সম্ভবত ব্রিটিশ ভারতে কচুরিপানাই একমাত্র উদ্ভিদ, যা দমনের জন্য ‘কচুরিপানা নির্মূল আইন ১৯৩৬’ প্রণীত হয়। এই কচুরি নিয়ে এতটাই ত্যক্ত বিরক্ত হলো জনগণ যে, ভোটের মাঠেও উত্তাপ ছড়াল এই কচুরিপানা। নালা-নর্দমায় নির্বিচারে বেড়ে উঠা কচুরিপানা জায়গা করে নিল একেবারে রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনি ইশতেহারে! ১৯৩৭-এর নির্বাচনে পূর্ব বাংলার সব দলের অঙ্গীকার ছিল কচুরি নির্মূল করা। শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক নির্বাচনে জয়লাভ করে কচুরিবিরোধী কর্মসূচি গ্রহণ করেন। অবাক করার মতো বিষয় হলো, কচুরি নির্মূলে দেশব্যাপী আপামর জনতা কচুরি নির্মূল সপ্তাহ পালন করে। কচুরির পক্ষেও ব্রিটিশ ভারতে তখন কিছু লোক ছিল। কেননা কচুরির রাসায়নিক ব্যবচ্ছেদে ভালো পরিমাণ পটাশের উপস্হিতি পাওয়া যায়। কচুরিপানা নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার আর প্রাদেশিক সরকার মুখোমুখি অবস্থানে চলে যায়। দেশভাগের পর ষাটের দশকে সামরিক শাসক আইয়ুব খান রাসায়নিক ব্যবহারের মাধ্যমে কচুরি নির্মূলের পরিকল্পনা করেন, কিন্তু জলজ বাস্ত্তসংস্থান হুমকির মুখে পড়বে বিধায়, সুধীসমাজের চাপে তাকেও বিরত থাকতে হয়। এবার একটু সাহিত্যে আসি। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কলমেও উঠে এসেছে এই কচুরিগাঁথা। কবির গানের কথায় কচুরি ধ্বংসের আহ্বান এসেছে প্রগাঢ়ভাবে-
এরা বাংলার অভিশাপ, বিষ এরা পাপ,
এসো সমূলে কচুরিপানা করে ফেলি সাফ!
(কচুরীপানা; কাব্যগ্রন্থ: শেষ সওগাত)
যেহেতু কচুরিপানা মাইলের পর মাইল জুড়ে বিস্তৃত, তাই এর উপস্হিতি জলজ প্রাণীর অক্সিজেন প্রাপ্যতা হ্রাস করে থাকে। তাছাড়া এর মূলের আশেপাশের পানির নমুনাতে বিভিন্ন রোগের অনুঘটক জীবাণুর অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছে।
কচুরিকথন ক্ষতিকর প্রভাব বললেই তো আর চলে না। কচুরিপানা যেহেতু সমূলে উত্পাটন সম্ভব হয়নি, তাই প্রায়োগিক দিক খুঁজে বের করা দরকার। পুষ্টিগুণ ছাড়াও সহজলভ্যতা ও অর্থমূল্য না থাকায়, প্রান্তিক কৃষকের অনন্য এক আস্থার নাম এই কচুরিপানা। প্রত্যন্ত অঞ্চলে গৃহস্হ বাড়ির গবাদিপশুর নিত্যদিনের খাবারের জোগান দিয়ে থাকে এই পানা, তাই কচুরি শুধু অভিশাপই নয়, মোট দেশজ উত্পাদনের অন্যতম একটি উত্স হিসেবে যুগের পর যুগ অবদান রেখে চলেছে নিঃশব্দে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি কুটিরশিল্পে কচুরিপানার ফাইবারগুলো দিয়ে পর্দা, ন্যাপকিন, পাপোশসহ নানা গৃহস্থালি সামগ্রী বানানো সম্ভব। এই জিনিসগুলো অধিকাংশই পরিবেশবান্ধব ও প্লাস্টিক সামগ্রীর বিকল্প হিসেবে প্রণিধানযোগ্য। এই ফাইবার থেকে তৈরি করা যেতে পারে ফ্যাশনেবল গাউন, যা ইতিমধ্যে ফিলিপাইনে ফ্যাশন শো-তে উঠে এসেছে।
আধুনিক জীবপ্রযুক্তি ব্যবহার করে কচুরিপানা থেকে বায়োমাস তৈরি করে ফারমেন্টেশনের মাধ্যমে বায়ো-ফার্টিলাইজার প্রস্ত্তত করার প্রযুক্তি নানা দেশে ব্যবহূত হচ্ছে। সস্তা কাঁচামাল হওয়ায়, বায়ো-ফার্টিলাইজারের দাম কম রাখা সম্ভব হচ্ছে। পাশাপাশি ‘টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট’র অন্যতম একটি স্তম্ভ ‘সবুজকৃষি’ অর্জনেও কচুরিজাত বায়ো-ফার্টিলাইজার হতে পারে এক অসাধারণ বিকল্প। কচুরির পাতা আর মূলের মাঝে ফাঁপা কাণ্ডসদৃশ অংশটি দূষিত পানি থেকে ভারী ধাতুসমূহ শোষণ করে নিতে পারে যা বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় ইতিমধ্যে প্রমাণিত।
অতএব, কচুরিপানা শুধুই কচুরিপানা না। এর সঙ্গে মিশে রয়েছে ইতিহাস, সংস্কৃতি, সাহিত্য কিংবা বিজ্ঞানভিত্তিক প্রযুক্তি।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়