মাওয়া পুরোনো ঘাটের এক চায়ের দোকানে বসে ষাটোর্ধ আসাদুলের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। পরিশ্রমে ভেঙে যাওয়া শরীর। আদি বাড়ি ঝিনাইদহ। প্রায় ১০ বছর যাবত্ এ অঞ্চলে বসতি গেড়েছেন এই ভাঙারি ব্যবসায়ী। মধ্যদুপুরে বসে জিরিয়ে নেওয়ার ফাঁকে বনরুটি আর চা খাচ্ছিলেন।
এই এলাকায় এখন এমনিতেই লোকজনের আনাগোনা কম। তার ওপর মধ্যদুপুর। মাথার ওপর সূর্যের জ্বলন্ত অগ্নিপিণ্ড। এমন অবস্থায় চায়ের দোকানের ছাউনি বড়ো শান্তির জায়গা।
খোশগল্পের এক ফাঁকে জিগ্যেস করলাম, পদ্মা ব্রিজ হয়ে গেল। এখন উদ্বোধনের পালা। কেমন লাগছে আপনার?
চায়ে একটা চুমুক দিয়ে বললেন, বছর দশেক ধইরে দেখতাসি মানুষের লঞ্চ আর ফেরি পার হওয়ার কষ্ট। বিশেষ কইরা ঈদের সময়। লাখ লাখ মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করত ফেরির জন্য। লঞ্চ, স্পিডবোটও সময়মতো পাইত না। স্বচক্ষে দেখসি মানুষের ভোগান্তি। নারীদের বাথরুমের ভালো ব্যবস্থাও নাই। আমি কতজনরে বলসি, কিছু মনে না করলে আমার ভাঙা ঘরে আইসা বাথরুম সারেন। শুধু আমি না, এই এলাকার প্রায় সব মানুষই এমন সাহায্য করসে।
বলে চললেন আসাদুল, আর যদি ফেরি বা লঞ্চ ডুবি হইতো পদ্মাপাড়ে মানুষের আহাজারি কান্দন, লাশ আর লাশ। এইটা আপনাকে বইলা বোঝানো যাবে না।
একটু থামলেন আসাদুল। তারপর যেদিকে পদ্মা সেতু, সেদিকে হাত দেখিয়ে বললেন, দক্ষিণের কোটি কোটি মানুষের জন্য সরকার যে কি বানাইয়া দিসে, তা বইলা বোঝানো যাবে না। কত্ত বছরের চাওয়া। কোনো সরকার পারল না। এই সরকারই জেদ দেখাইয়া শুরু করল, শেষও করল। এবার যেন গলাটা ধরে এল আসাদুলের। আরো এক চুমুক দিয়ে কাপটা ফেরত দিলেন। আমিও আমার চায়ে একটা চুমুক দিয়ে নিলাম।
জিগ্যেস করলাম, কিসের জেদ। কার জেদ? কার ওপর জেদ?
কণ্ঠনালীতে আবেগের যে দলা পাকিয়ে উঠেছিল, তা ঝেড়ে ফেলতেই যেন হালকা কাশি দিলেন পোড় খাওয়া এই মানুষটি। থুতনির নিচে বেড়ে ওঠা হালকা দাড়িতে আঙুল বোলালেন।
এতক্ষণ হাঁটু ভাঁজ করে মাটিতে বসেছিলেন। এবার দাঁড়ালেন। আরো ছয়-সাতজন লোক বসেছিলেন। বলে উঠলেন, আমার বয়স সত্তরের কাছাকাছি। একাত্তরের যুদ্ধ আমি দেখসি। দেখসি মুক্তিবাহিনীর জেদ। বাংলার মানুষ এই জেদ পাইছিল শেখের কাছ থেইকা।
সঙ্গে সঙ্গে চা দোকানি কথাটা কেড়ে নিয়ে বলে উঠল, হেই শেখের বেটি হইসে বাপের মতোই। দেখবেন দ্যাশটারে কোথায় নিয়া যাইব।
দোকানির উদ্দেশ্যে বললাম, ভাই ব্রিজ চালু হলে তো আপনার এখানে ঘাট বন্ধ হবে। আপনার চায়ের ব্যবসার ক্ষতি হবে না?
দ্রুত জবাব পেলাম, রিজিকের মালিক আল্লাহ। এখনই ব্যবসা অর্ধেক হইয়া গেসে। তবে বিরিজ চালু হইলে দেখার জন্য লোক আসবে, নদীতে ঘুরতে আসবে। তাই বেশি চিন্তা করি না।
ওপাশের বেঞ্চিতে বসা এক যুবক তাকে থামিয়ে বললেন, বাংলাদেশের দীর্ঘতম সেতু আমাদের এখানে। ১৬ কোটি মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, আবেগ, স্বপ্ন বাস্তবায়নের নতুন রূপ দেখতে চাইলে মাওয়া আসবেন।
বলে চললেন, এই সেতু নিয়া কত ষড়যন্ত্র হইসে। দেশের ভেতরে বাইরে কত পানি ঘোলা করা হইসে যেন সেতুটা না হয়। কত চোখ রাঙানি।
সঙ্গে সঙ্গে দোকানিও বলে উঠল, একদম ঠিক কথা। এই এলাকায় বিরিজ দরকার ছিল, বানাইয়া ফেলসে।
এসময় তিন তরুণ দোকানের সামনে এসে দাঁড়াল। ওদের মধ্যে একজন পকেট থেকে টিস্যু বের করে মুখ মুছে দোকানির দিকে তাকিয়ে বলল, মামা, দুধচিনি দিয়া তিন কাপ চা দেন।
এক কোনায় বসে আমাদের আলোচনা শুনছিলেন এক মাঝবয়সি লোক। এবার বলে উঠলেন, আমি বরিশালে সবজি চাষ করি। সময় বেশি লাগে বইলা এই সবজি ঢাকায় পাঠাইতে পারি না। ফেরি সময়মতো পাইলে কমপক্ষে ছয় থেইকা সাত ঘণ্টা লাগে। হেই সবজির অবস্থা কি দাঁড়ায় বুঝেন। আর এখন লাগবো মাত্র তিন ঘণ্টা।
আমি যোগ করলাম, শুধু বরিশাল না, দক্ষিণ অঞ্চলের একুশ জেলার অর্থনীতি ও সমাজে আসবে অকল্পনীয় পরিবর্তন।
আমাকে থামিয়ে দিয়ে ব্যবসায়ী যুবক বলে উঠল, আরে আমিই তো ঐ দিকে কিছু জমি কিইনা রাখসি। পিরোজপুরে আমার দুই বন্ধু মিইল্লা গার্মেন্টস দিসে।
আমি বললাম, এই সেতুর কারণে প্রথম বারের মতো পুরো দেশ একটি বিরতিহীন যোগাযোগ ব্যবস্থায় চলে আসবে।
নবাগত তিন তরুণের একজন বলে উঠল, আমরা সিলেট থেকে আসছি। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ইউনিভার্সিটিতে পড়ি। আমার বাড়ি দিনাজপুর। পাশের বন্ধুদের দিকে দেখিয়ে বলল, ওদের একজনের বাড়ি সিলেট, আরেক জনের বাড়ি চট্টগ্রাম। আমরা পদ্মা ব্রিজ দেখতে আসছি । আমাদের প্ল্যান, এই ব্রিজ উদ্বোধন হয়ে গেলে আমরা কুয়াকাটা বেড়াতে যাব। আমি দেখলাম আড্ডায় যোগ দেওয়া প্রতিটি মানুষের চোখের মণি জ্বলজ্বল করছে। গল্প শুনছে আর এক একটি নতুন স্বপ্ন যেন খেলা করছে চোখের তারায় তারায়।
শাহজালাল ইউনিভার্সিটির ছাত্রটি আবার বলা শুরু করল, আমি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র। পদ্মার যে প্রবল স্রোত, তাতে এই নদীতে ব্রিজ বানানো মোটেও সহজ কাজ না। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই পদ্মা সেতুর কাজ শেষ হয়েছে।
এই আড্ডার প্রথম বক্তা আসাদুল অনেকক্ষণ পর ফের কথা বললনে, শুনতাসি সরকার নাকি এরই মধ্যে পদ্মার দুই পাড় উন্নত করার জন্য কাজ হাতে নিসে। কি কি জানি বানাইবো, সবগুলার নামও কইতে পারি না।
তাকে সাহায্য করলাম, পদ্মার দুই পাড়ে অলিম্পিক ভিলেজ, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট সিটি, হাইটেক পার্ক, আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র, বিমানবন্দরসহ নানা উন্নয়ন কাজের কথা ভাবছে সরকার।
যুবক ব্যবসায়ী সঙ্গে সঙ্গে আমার কথা কেড়ে নিল, ঐ পাড়ে একটা তাঁতের পল্লি গড়ে উঠতাসে শুনসি। বললাম, হ্যাঁ। পদ্মা সেতুর কাছেই ২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে শেখ হাসিনা তাঁতপল্লি গড়ে উঠছে। পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর আগামী পাঁচ বছরে ১০ লাখ অর্থাত্ বছরে ২ লাখ মানুষের নতুন করে আয়-রোজগারের সুযোগ ঘটবে। ১০ বছর পর এ সংখ্যা তিন গুণ হয়ে যাবে।
দিনাজপুরের সেই তরুণ মোবাইল ফোন দেখিয়ে বলল, মোবাইলের ফেইসবুক আর ইউটিউবে হাজার হাজার গুজব ছড়ানো হয়েছে। বলা হয়েছে, পদ্মা ব্রিজ হবে না, মজবুত হবে না। যত্তসব বিভ্রান্িত ছড়ানো। কোনোটাই ধোপে টিকে নাই। এখন বলছে, খরচ বেশি হয়েছে। চোখমুখ লাল হয়ে উঠল তার। বলে চলল, আরে ভাই, জাপানিরা বলছে, ১৬ থেকে ১৭ বছরের মধ্যেই টাকাটা উঠে আসবে।
অনেকক্ষণ পর দোকানি আবার মুখ খুলল। আড্ডা জমে গেলে তার চা বিক্রিও বেড়ে যায়। মুখে বিস্তৃত হাসি নিয়ে বলল, সরকার পদ্মা সেতুর ওপর যে লাইটিং করতাসে শুনলাম, এইডা দেখার জন্য এই অঞ্চলে মানুষের আনাগোনা আরো বাড়ব।
‘হ। তোমার তাইলে আর চিন্তা কি? তোমার ব্যবসা তো মিয়া জমজমাটই থাকব।’ আসাদুলের ত্বরিত মন্তব্য।
আমার অর্ধেক চাও খাওয়া হয়নি। টের পেলাম চা ঠান্ডা হয়ে গেছে। চায়ের কাপ ফেরত দিয়ে দোকানিকে টাকা দিলাম। অনেক গল্প হলো। আমার সঙ্গী যারা আশপাশে ছিল, তথ্য অধিদফতরের কর্মকর্তারা, যাওয়ার জন্য তাড়া দিচ্ছে। তথ্য অধিদপ্তরের এই দলটি এসেছে ঢাকা-মাওয়া হাইওয়ে এক্সপ্রেস পরিদর্শনে।
ফেরার প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করলাম। সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রওনা দিলাম ঢাকার দিকে। আকাশে তখন মেঘ জমতে শুরু করেছে।
ঢাকা আসতে আসতে মাথায় ঘুরতে থাকল আড্ডার কথা। কি আবেগ আর স্বপ্ন নিয়ে মানুষগুলো পদ্মা সেতুকে ভাবে। পদ্মা সেতু নিয়ে যে চোখ রাঙানিগুলো ছিল, সেগুলো যে দেশের উন্নয়ন রোধ করার অপচেষ্টা, মানুষ তা বুঝে গেছে, সব পেছনে ফেলে পদ্মা সেতু আজ সত্যি। আকাশের কালো মেঘের মতোই।
মনে পড়ছে সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের আশা কবিতার সেই অংশ-‘মেঘ দেখে তোরা করিস নে ভয়/ আড়ালে তার সূর্য হাসে। হারা শশীর হারা হাসি/ অন্ধকারেই ফিরে আসে।’
লেখক: তথ্য অধিদপ্তরের সিনিয়র তথ্য অফিসার