দ্রব্যমূল্য ও ব্যবসানীতি

জিনিসপত্রের দাম ক্রমাগত বাড়ছে। বেড়েই চলেছে। চাল, ডাল থেকে শুরু করে তেল, চিনি, আটা, ময়দা, দুধ, ডিম, মশলা—সবকিছুর দাম বাড়তি। এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন স্বল্প আয়ের মানুষ। খরচের বাজেট বারবার কাটছাঁট করেও হিসাব মেলাতে পারছেন না তারা। হিমশিম খাচ্ছেন সংসার চালাতে। অবশ্য তাদের কথা আর কে-ই-বা ভাবে?

সরকারের বিপণন সংস্হা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, এক বছর আগে প্রতি কেজি খোলা ময়দা ৩৫ টাকায় বিক্রি হলেও এখন তা বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকায়। ৩২ টাকা কেজির প্যাকেট আটা বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকায়। বছরখানেক আগেও বড় দানা মসুর ডালের কেজি ছিল ৭০ টাকার মধ্যে। সেই ডালই এখন ১১০ টাকা ছাড়িয়েছে। আর ছোট দানা মসুর ডালের কেজি ১৪০ টাকা। বছরের ব্যবধানে মসুর ডালের দামও বেড়েছে ৪০ শতাংশের বেশি।

আর তেল তো যেন ঘিয়ে পরিণত হয়েছে। এক লিটার সয়াবিন ১৮০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক বছরের ব্যবধানে তেলের দাম বেড়েছে ৪৮ দশমিক ৮০ শতাংশ থেকে ৫০ দশমিক ৪৫ শতাংশ। টিসিবির তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে আটার দাম ৪৬ দশমিক ২৭ শতাংশ এবং ময়দার দাম ৬৬ দশমিক ২০ শতাংশ বেড়েছে।

স্বল্প আয়ের মানুষের আমিষের জোগানের সবচেয়ে বড় উত্স ডিম ও ব্রয়লার মুরগি। সেই ডিমের দাম গত এক বছরের ব্যবধানে বেড়েছে ৩০ দশমিক ৬৫ শতাংশ। আর ব্রয়লার মুরগির দাম বেড়েছে ২২ শতাংশের বেশি। গত এক বছরের ব্যবধানে মসলার দামও বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। ১১ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে এমন মসলার মধ্যে রয়েছে এলাচ, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, জিরা, শুকনা মরিচ, হলুদ, লবঙ্গ ও তেজপাতা। শুধু তা-ই নয়, এই সময়ে সব ধরনের গুঁড়ো দুধের দামও ১০ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১৮ দশমিক ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।

এদিকে এখন বোরো মৌসুম শুরু হলেও বাজারে চালের দাম বাড়ছে। ব্যবসায়ীরা বলেছেন, দেশে নিত্যপণ্যের চাহিদার একটি বড় অংশ আমদানি করে মেটাতে হয়। করোনা মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধসহ বিভিন্ন কারণে বিশ্বে খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে। বেড়েছে পরিবহনসহ অন্যান্য ব্যয়ও। ফলে আমদানিকৃত ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়ছে। তাই ব্যবসায়ীরা দাম বাড়াতে বাধ্য হচ্ছেন।

মানুষ অবশ্য ব্যবসায়ীদের কথা খুব একটা বিশ্বাস করে না। কারণ আমাদের দেশের ব্যবসায়ীরা লাভ ছাড়া তেমন কিছু বোঝেন না। তারা সব সময় দাম বাড়ানোর মওকা খোঁজেন। চান্স পেলেই জিনিসপত্রের দাম বাড়ান। দাম বাড়ানোর জন্য নানা কারসাজি করেন। আর বাড়তি দাম মানেই বাড়তি লাভ। দাম বাড়ার কারণে কার কী অসুবিধা হলো, সেটা তাদের দেখার বিষয় নয়। তাদের মূল ধান্দা হচ্ছে মুনাফা বা লাভ।

আসলে, ব্যবসানীতি একটা আজব জিনিস। এটা প্রচলিত আর দশটা নীতির চেয়ে আলাদা। আর ব্যবসায়ীরা তাদের ‘নীতি’তে অত্যন্ত কঠোর। জেল-জরিমানার ভয় দেখিয়েও তাদের ‘নীতি’ থেকে সরানো যায় না। এ ব্যাপারে একটি গল্প বলা যাক। পিতা ব্যবসার দায়িত্ব দিচ্ছেন পুত্রকে। তাকে নিয়ে ছাদে গেলেন। তারপর বললেন, ছাদের একদম ধারে গিয়ে দাঁড়াবে এবং আমি যখন বলব, লাফ দাও, তখন লাফ দেবে।

-সে কী বাবা, এই দোতলার ছাদ থেকে লাফ দেব? আমি মারা যাব যে!
-শোনো, ব্যবসায় উন্নতি করতে চাও তো আমার ওপর বিশ্বাস রাখো। আমার ওপর কি বিশ্বাস আছে?
-হ্যাঁ।
-তাহলে লাফ দাও।

ছেলে লাফ দিল এবং যথারীতি মাটিতে আছড়ে পড়ে দুই পা ও এক হাত ভেঙে গুরুতর আহত হলো। বাবা দ্রুত সিঁড়ি ভেঙে ছেলের কাছে ছুটে গেলেন এবং বললেন, ব্যবসায় এটাই তোমার প্রথম শিক্ষা যে, কাউকে বিশ্বাস করবে না।

হ্যাঁ, ব্যবসায়ীরা কাউকে বিশ্বাস করে না। নিয়ম, আইন, কারো কথা, অনুরোধ, ধর্মের বাণী, হুমকি-ধমকি শোনেও না। তারা চলে নিজের মতো, নিজস্ব ‘বিশ্বাস’ নিজস্ব ‘নীতি’ নিয়ে। আর এ কথা বলাই বাহুল্য যে, তাদের একমাত্র ‘নীতি’ হচ্ছে যে কোনো মূল্যে লাভ করা। সব ব্যবসায়ীই ব্যবসায় উন্নতি করতে চান। আরো বেশি, তার চেয়েও বেশি লাভ করতে চান। এজন্য তারা নিজস্ব তরিকায় পথ চলেন। সেটা কেমন? ব্যবসায়ী বাবা তার ছেলেকে উপদেশ দিচ্ছেন।

ব্যবসায়ী: দেখো, ব্যবসায় উন্নতি করতে দুটি কথা সব সময় মনে রাখবে। একটি হচ্ছে সততা, অন্যটি সুবুদ্ধি।
ছেলে: সততা মানে কী বাবা?
ব্যবসায়ী: সততা মানে কাউকে যখন তুমি কথা দেবে, সেটা তোমার রক্ষা করা উচিত।
ছেলে: আর সুবুদ্ধি?
ব্যবসায়ী: সুবুদ্ধি মানে কাউকে কোনো কথাই দেবে না।

ব্যবসায়ীদের নিয়ে যত কথাই বলি না কেন, তাদের কিন্তু অনেক বুদ্ধি খাটিয়ে চলতে হয়। অনেক ঝুঁকি নিতে হয়। পরিশ্রম করতে হয়। লাভের জন্য নানা কূটকৌশলও প্রয়োগ করতে হয়। এ ব্যাপারে বহুল প্রচলিত একটি গল্প বলা যাক।

একদিন এক গ্রামে এক লোক এসে গ্রামবাসীকে জানাল, সে বানরের ব্যবসা করে। তাই সে গ্রামের বানর কিনতে চায়। প্রতিটি বানরের দাম ৫০০ টাকা। এ কথা শুনে গ্রামের অনেকেই বানর ধরে এনে বিক্রি করল। এরপর সেই লোকটা ঘোষণা করল, তার আরো বানর চাই এবং সে সেগুলো ৬০০ টাকা করে কিনবে। এতে উত্সাহিত হয়ে যারা আগে ছিল, তাদের সঙ্গে আরো কিছু লোক যোগ হয়ে বানর জোগাড় করতে লাগল।

এবার অবশ্য একটু সমস্যাই হলো বানর জোগাড় করতে। সেই বানরগুলোও সব কিনে নিয়ে বলল, তার আরো লাগবে। গ্রামবাসী বলল, গ্রামের সব বানরই তো ধরা শেষ। এখন বানর কোথায় পাব! লোকটা বলল, যাও এবার ৮০০ টাকা দেব। তত্ক্ষণাত্ সব লোক ছুটে গেল বানর জোগাড় করতে। এবার বনবাদার উজাড় করে আর একটাও বানর নেই এমন নিশ্চিত হয়ে সবাই বানর জোগাড় করে ফিরে এলো এবং বিক্রি করল ৮০০ টাকা করে। খবর শুনে যারা বানর বিক্রির সঙ্গে যুক্ত ছিল না, তারা আফসোস করতে লাগল আর অপেক্ষা করতে লাগল লোকটা আরো বানর কেনে কি না। হ্যাঁ, লোকটা আরো বানর কিনতে চায়, এবার ১ হাজার টাকা করে। গ্রামের মোড়ল দাবি করল :না, এবার কিনতে হবে ১ হাজার ২০০ টাকায়, না হলে বানর জোগাড় করা হবে না। তো লোকটা রাজি হলো। এবার গ্রামবাসী আশপাশের সমস্ত গ্রাম তন্ন তন্ন করে খুঁজে বেড়াল, যারা জোগাড় করতে পারল না তারা নিজেদের জমানো পয়সা দিয়ে বানর কিনে এনে লোকটার কাছে বানর বিক্রি করল।

যা-ই হোক, লোকটা বেশ অনেক বানর জোগাড় করল। এবার তার বানর নিয়ে গ্রাম ত্যাগ করার পালা। গ্রাম ত্যাগের আগে সে বলে গেল যে, কেউ যদি আরো বানর জোগাড় করতে পারে, তাহলে সে বানরপ্রতি ১ হাজার ৫০০ টাকা দিয়ে কিনে নেবে। গ্রামবাসী এটাই আশা করছিল, কিন্তু হায়, বানর কোথায় আর পায়। এমন সময় হাজির হলো বানর ব্যবসায়ীর সহকারী।

সে সবাইকে বলল, দেখো, লোকটার সব বানর আমি কিনে নিয়েছি। এখন তোমরা যদি আমার কাছ থেকে সব বানর ১ হাজার ৩০০ টাকা করে কিনতে চাও, তবে আমি তোমাদের কাছে এই বানরগুলো বেচব। আর লোকটি এলে তোমাদের সব বানর ১ হাজার ৫০০ টাকা করে কেনার ব্যবস্হা করব। আর সে যদি না আসে, তবে আমিই তোমাদের সব বানর ১ হাজার ৫০০ টাকা করে কিনে নেব। এই কথা শুনে গ্রামবাসী পাগলের মতো লাফালাফি, মারামারি করে কিনে নেয় সব বানর, আর অপেক্ষা করতে থাকে ঐ ব্যবসায়ী কবে আসে।

কিন্তু হায়, দিন যায়, মাস যায়। সেই ব্যবসায়ী কিংবা তার সহকারী কারো দেখা মেলে না। হাতে তাদের তখন অসংখ্য বানর, যা কিনা ১ হাজার ৩০০ টাকা করে কেনা!

আমাদের দেশের ‘ব্যবসা-নীতি’ অনেকটা এভাবেই চলছে!

লেখক: রম্যরচয়িতা