চট্টগ্রামে নিমজ্জিত বিস্তীর্ণ এলাকা থেকে সরেনি পানি

লাগাতার মাঝারি ও ভারী বর্ষণে পাহাড় ও উঁচু স্থান থেকে নেমে আসা বৃষ্টির পানিতে গতকাল সোমবারও নগরীর বিস্তীর্ণ এলাকা নিমজ্জিত ছিল। দোকানপাট ও বাড়িঘরে পানি থৈ থৈ করছিল। বিকালে আরেক দফা মাঝারি বর্ষণ হলে জলাবদ্ধতার শিকার লোকজনের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়। গতকাল দুপুরেও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরীর বহদ্দারহাটের বাড়ির নিচতলা হাঁটুপানিতে নিমজ্জিত ছিল।

পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম জানান, গতকাল সোমবার বিকাল ৩টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে ১৬২ দশমিক ৮ মিলিমিটার। বৃষ্টি বেশির ভাগই রাতে হয়েছে। আজ মঙ্গলবার থেকে বৃষ্টিপাতের মাত্রা কমে আসতে পারে বলে পূর্বাভাস রয়েছে। এছাড়া নদীবন্দরগুলোকে ১ নম্বর নৌ সতর্কতা সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। সমুদ্রে কোন সংকেত নেই।

এছাড়াও উঁচু সড়ক এবং সড়কের নিচে কালভার্টের সরু নির্গমন পাইপের কারণে হালিশহর আবাসিক এলাকার আই ব্লকের ঘরবাড়ির নিচতলা গতকাল সারা দিন পানিতে নিমজ্জিত থাকায় অবর্ণনীয় দুর্ভোগের শিকার হন মানুষ। এছাড়াও চান্দগাঁওয়ের খাজা রোড, শোলকবহর মাদ্রাসা রোড, শোলকবহরের বাদুরতলা, পাঁচলাইশের কাতালগঞ্জ, চান্দগাঁওয়ের মোহরা, হামিদচর, চররাঙামাটিয়া, বাকলিয়া, চকবাজার, কাপাসগোলা, বহদ্দারহাট বাস টার্মিনাল, কাপ্তাই রাস্তার মাথা, বাকলিয়ার মিয়াখান নগর, প্রবর্তক মোড়, মেহেদীবাগ, ষোলশহর ২ নম্বর গেট, মুরাদপুর, আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকা, আগ্রাবাদ এক্সেস রোড, ছোটপুল, বড়পুল, গোসাইলডাঙ্গা এবং হালিশহরের বিভিন্ন এলাকা গতকাল সারা দিন পানিতে নিমজ্জিত ছিল। কোথাও কোথাও চলাচলের জন্য জনসাধারণকে নৌকাও ব্যবহার করতে দেখা গেছে। খাল ও নালায় বাঁধ থাকায় পানি সরতে না পেরে অনেক ঘর ও দোকানপাটে পানি ঢুকে যায়।

এদিকে নগরীর কাতালগঞ্জ আবাসিক এলাকার ১ নম্বর সড়কে একটি বাড়ির পানিতে নিমজ্জিত নিচতলায় আইপিএস বন্ধ করতে গিয়ে বিদ্যুত্স্পৃষ্ট হয়ে দুই জন মারা যান। গতকাল ভোরে স্থানীয় পেট্রোল পাম্পের সামনে খান বাড়ির নিচতলায় এই দুর্ঘটনা ঘটে। মৃত ব্যক্তিরা হলেন জোরারগঞ্জ থানার সত্তরোয়া এলাকার ছালেহ আহমেদের পুত্র গাড়িচালক মো. হোসেন (৩৮) ও খাগড়াছড়ির রামগড় থানার গজলতলা এলাকার মৃত আবদুর রউফের পুত্র বাড়ির কেয়ারটেকার আবু তাহের (৬৫)।

পাঁচলাইশ থানার ওসি নাজিম উদ্দিন মজুমদার জানান, খান বাড়ির নিচতলায় বৃষ্টির কারণে পানি উঠেছিল। নিচতলায় আইপিএসের সংযোগ কেয়ারটেকার আবু তাহের বন্ধ করতে গেলে বিদ্যুত্স্পৃষ্ট হয়ে আহত হন। তাকে বাঁচাতে গিয়ে মো. হোসেনও বিদু্যত্স্পৃষ্ট হন। সেখান থেকে দুই জনকে উদ্ধার করে একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাদের মৃত ঘোষণা করেন।

চট্টগ্রামে পাহাড়ধসে ঘুমন্ত শিশুর মৃত্যু

ভারী বৃষ্টিপাতে নগরীতে পাহাড়ধসে আরো একটি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে গত তিন দিনের টানা বৃষ্টিতে চট্টগ্রামে পাহাড়ধসে মৃতের সংখ্যা দাঁড়াল ৫।

ভারী বৃষ্টিপাতের মধ্যে গত রবিবার দিবাগত রাতে নগরীর পাঁচলাইশ থানার গ্রিনভ্যালি আবাসিক এলাকায় পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। নিহত মো. রায়হান (১২) স্থানীয় ভাসমান চা দোকানি দীন মোহাম্মদের পুত্র। সে স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র। তাদের বাড়ি কুমিল্লার লাকসাম উপজেলায়।

পাঁচলাইশ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নাজিম উদ্দিন মজুমদার জানান, গ্রিনভ্যালি আবাসিকের মসজিদের পেছনে পাহাড়ের পাদদেশে দীন মোহাম্মদের একটি ভাসমান চা দোকানে ঘুমিয়েছিল রায়হান। রাতে একসময় পাহাড়ধসে পড়ে দোকানের ওপর। ঘুমন্ত অবস্থায় ধসে পড়া মাটির নিচে চাপা পড়ে প্রাণ হারায় রায়হান। ভোরে দীন মোহাম্মদ দোকান খুলতে গিয়ে এলাকাবাসীর সহায়তায় মাটি সরিয়ে রায়হানের লাশ উদ্ধার করেন। পুলিশ ঘটনাস্থলে যাওয়ার আগেই রায়হানের লাশ নিয়ে স্বজনরা গ্রামে বাড়ি লাকসামে চলে যান।

উল্লেখ্য, এর আগে গত শুক্রবার রাতে নগরীর আকবর শাহ এলাকায় দুটি পাহাড়ধসের ঘটনায় চার জন নিহত ও দুই জন আহত হন। নগরীর ফিরোজ শাহ কলোনির ১ নম্বর ঝিল বরিশালঘোনা এলাকায় পাহাড়ধসে মারা যান শাহীনূর আক্তার (২৬) ও তার বোন মাইনুর আক্তার (২৪)। আহত হন তাদের বাবা-মা ফজল হক (৭০) ও মোশারা বেগম (৬৫)। নগরীর ফয়’সলেক সংলগ্ন সি ওয়ার্লডের পাশে বিজয়নগর এলাকায় আরেকটি পাহাড়ধসের ঘটনায় লিটন (২৩) ও ইমন (১৪) নামে দুজন মারা যান।

দীঘিনালায় পানিবন্দি কয়েক শ পরিবার

দীঘিনালা (খাগড়াছড়ি) সংবাদদাতা জানান, টানা তিন দিনের বন্যায় খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় মেরুং ও কবাখালী ইউনিয়নের কয়েক শ পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বন্যায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এসব এলাকার অনেক অভ্যন্তরীণ সড়ক। তলিয়ে গেছে শত শত একর ফসলি জমি। দেখা দিয়েছে খাবার পানির তীব্র সংকট।

১ নম্বর মেরুং ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মাহমুদা আক্তার লাকী জানান, মেরুং ইউনিয়নে দুটি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। রবিবার রাত থেকে ৫০টি পরিবার আশ্রয়কেন্দ্রে উঠেছে। নিজ অর্থায়নে বন্যার্ত এসব আশ্রিতদের ভুনা খিচুড়ি দেওয়া হয়েছে।

৩ নম্বর কবাখালী ইউপি চেয়ারম্যান জ্ঞান চাকমা জানান, শান্তিপুর, নারিকেল বাগানসহ বেশ কয়েকটি এলাকার শতাধিক পরিবার পানিবন্দি রয়েছে। এদেরকে পর্যায়ক্রমে আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে আনা হবে।

দীঘিনালা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আবদুল সালাম জানান, দীঘিনালায় বর্তমানে পানিবন্দি মোট ৫৫৬টি পরিবার এবং দুটি আশ্রয়কেন্দ্রে রয়েছে মোট ১১১টি পরিবার। এসব পরিবারের কাছে দ্রুত ত্রাণ পৌঁছানোর ব্যবস্থা হচ্ছে।