ভ্লাদিমির পুতিন আগ্রাসনের শেষ দিনগুলোর ব্যাপারে যা ভেবেছিলেন তা হয়নি। ইউক্রেনে তার আক্রমণ এখন চতুর্থ মাসে গড়িয়েছে। ইউক্রেনীয় জনগণ রাশিয়াকে বিস্মিত করেছে এবং তাদের ত্যাগ, দৃঢ়তা ও যুদ্ধক্ষেত্রে সাফল্য বিশ্বকে অনুপ্রাণিত করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে মুক্ত বিশ্ব এবং অন্যান্য অনেক দেশ নজিরবিহীন সামরিক, মানবিক ও আর্থিক সহায়তা নিয়ে ইউক্রেনের পাশে দাঁড়িয়েছে, তাদের পক্ষে সভা-সমাবেশ করছে।
যেহেতু যুদ্ধ এখনো চলছে, তাই আমি এই প্রচেষ্টায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য সম্পর্কে স্পষ্ট হতে চাই। আমেরিকার লক্ষ্য সত্ ও সহজবোধ্য। তা হলো :আমরা একটি গণতান্ত্রিক, স্বাধীন, সার্বভৌম ও সমৃদ্ধ ইউক্রেন দেখতে চাই, যাতে আরো আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তারা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ও আত্মরক্ষা করতে পারেন।
ইউক্রেনের রাষ্ট্রপতি ভলোদিমির জেলেনস্কি যেমনটা বলেছেন, শেষ পর্যন্ত এই যুদ্ধ ‘শুধু কূটনীতির মাধ্যমে নিশ্চিতভাবে শেষ হবে।’ প্রতিটি আলোচনাই মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করে। আমরা ইউক্রেনে দ্রুততার সঙ্গে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে অস্ত্র ও গোলাবারুদ পাঠিয়েছি, যাতে তারা যুদ্ধক্ষেত্রে লড়াই চালিয়ে যেতে পারেন এবং একই সঙ্গে আলোচনার টেবিলে যথাসম্ভব শক্তিশালী অবস্থানে থাকতে পারেন। এ কারণেই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে আমরা ইউক্রেনীয়দের আরো উন্নত রকেট সিস্টেম ও যুদ্ধাস্ত্র সরবরাহ করব, যাতে যুদ্ধক্ষেত্রে তারা মূল লক্ষ্যগুলোয় আরো সুনির্দিষ্টভাবে আঘাত হানতে সক্ষম হন।
আমরা রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে আমাদের মিত্র ও অংশীদারদের সঙ্গে সহযোগিতা প্রদান অব্যাহত রাখব। এসব নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলা করা একটি বৃহৎ অর্থনীতির দেশের জন্য সবচেয়ে কঠিন। আমরা ইউক্রেনকে জ্যাভলিন অ্যান্টি-ট্যাংক মিসাইল, স্টিংগার অ্যান্টি-এয়ারক্রাফ্ট ক্ষেপণাস্ত্র, শক্তিশালী কামান এবং নিভুর্ল রকেট সিস্টেম, রাডার, মনুষ্যবিহীন আকাশযান, এমআই-১৭ হেলিকপ্টার, গোলাবারুদসহ উন্নত অস্ত্র সরবরাহ করতে থাকব। কংগ্রেসের অনুমোদন সাপেক্ষে আমরা আরো বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আর্থিক সহায়তা পাঠাব। রাশিয়ার আগ্রাসনে যে বৈশ্বিক খাদ্যসংকট ক্রমশ খারাপ হচ্ছে, তা মোকাবিলায় আমরা আমাদের মিত্র ও অংশীদারদের সঙ্গে একযোগে কাজ করব। আমরা রাশিয়ান জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর আমাদের ইউরোপীয় মিত্র ও অন্যদের নির্ভরতা কমাতে সাহাঘ্য করব এবং একটি পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ভবিষ্যতের দিকে আমাদের রূপান্তরকে ত্বরান্বিত করব।
এছাড়া আমরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও অন্য মিত্রদের তরফ থেকে ন্যাটোর পূর্বাঞ্চলের অংশকে সেনা ও সরঞ্জাম দিয়ে শক্তিশালী করার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখব। সম্প্রতি ন্যাটোতে যোগদানের জন্য ফিনল্যান্ড ও সুইডেনের আবেদনকে আমি স্বাগত জানিয়েছি। এটি এমন এক পদক্ষেপ, যা ন্যাটোতে দুটি গণতান্ত্রিক ও সামরিকভাবে সক্ষম অংশীদারের যোগদানের মাধ্যমে সামগ্রিকভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ট্রান্স-আটলান্টিক নিরাপত্তাকে আরো শক্তিশালী করবে।
আমরা ন্যাটো ও রাশিয়ার মধ্যে যুদ্ধ চাই না। আমি যতই মিস্টার পুতিনের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ ও তার কর্মকাণ্ডে ক্ষোভ প্রকাশ করি না কেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মস্কোতে তাকে ক্ষমতাচু্যত করার চেষ্টা করবে না। যতক্ষণ না মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা আমাদের মিত্ররা আক্রমণের শিকার হয়, আমরা ইউক্রেনে যুদ্ধের জন্য আমেরিকান সৈন্য পাঠিয়ে বা রাশিয়ান বাহিনীকে আক্রমণ করে এই সংঘর্ষে সরাসরি জড়িত হব না। আমরা ইউক্রেনকে তার সীমানার বাইরে হামলা চালাতে অনুৎসাহিত করছি বা এ ব্যাপারে তাদের সক্ষম করে তুলছি না। আমরা শুধু রাশিয়াকে কষ্ট দেওয়ার জন্য যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করতে চাই না।
এই সংকট জুড়ে আমার নীতি হচ্ছে— নাথিং আবাউট ইউক্রেন উইদাউট ইউক্রেন তথা ‘ইউক্রেন ছাড়া ইউক্রেন সম্পর্কে কিছুই নয়।’ কোনো ভূখণ্ডগত ছাড় প্রদানের ব্যাপারে সরকারি বা বেসরকারি কোনোভাবেই আমি ইউক্রেনের সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করব না। এটি করা ভুল হবে। এটা আমাদের বিঘোষিত নীতির পরিপন্থী।
রাশিয়ার সঙ্গে ইউক্রেনের আলোচনা স্থবির হয়ে পড়েনি। কারণ ইউক্রেন আবার কূটনীতিতে ফিরে এসেছে। আলোচনা কিছুটা স্থবির হয়ে পড়লে তা হয়েছে রাশিয়ার জন্য। কারণ রাশিয়া যতটা সম্ভব ইউক্রেনের বিভিন্ন অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিতে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে শক্তিশালী করার কাজ চালিয়ে যাবে এবং আলোচনার মাধ্যমে সংঘাতের অবসানের জন্য নেওয়া সর্বাত্মক প্রচেষ্টাকে সমর্থন করবে।
বিনা প্ররোচনায় আগ্রাসন, প্রসূতি হাসপাতাল ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলোতে বোমা হামলা এবং জোরপূর্বক লাখ লাখ লোককে বাস্তুচ্যুত করার ঘটনা ইউক্রেনের যুদ্ধকে নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এটি এখন একটি গভীর নৈতিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমি পোল্যান্ডে ইউক্রেনীয় উদ্বাস্তুদের সঙ্গে দেখা করেছি। এখানকার নারী ও শিশুরা তাদের ভবিষ্যৎ জীবন নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। যেসব প্রিয়জন ইউক্রেনে থেকে গেছে, তারা কেমন আছে এবং তাদের ভাগ্যে কী ঘটেছে, তা তাদের অজানা। যুদ্ধের ভয়াবহ ধ্বংসলীলা দেখে কোনো বিবেকবান ব্যক্তি বিচলিত বোধ না করে পারেন না!
প্রয়োজনের সময় ইউক্রেনের পাশে দাঁড়ানো শুধু সঠিক কাজ নয়, একটি শান্তি পূর্ণ ও স্থিতিশীল ইউরোপ নিশ্চিত করাও আমাদের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় স্বার্থ। সেই সঙ্গে এটা পরিষ্কার করা যে, জোর যার মুলুক তার হতে পারে না। যদি রাশিয়াকে তার আগ্রাসনের জন্য চরম মূল্য দিতে না হয়, তাহলে অন্য আগ্রাসীদের কাছে এই বার্তাই যাবে যে, তারাও অবলিলায় যে কোনো দেশ দখল করে নিতে পারে এবং পরাধীনতার শেকলে বেঁধে রাখতে পারে সেই জাতিকে। এটি অন্যান্য শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক দেশের অস্তিত্বকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে। এটি নিয়ম-শৃঙ্খলাকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সমাপ্তি ঘোষণা করতে পারে এবং বিশ্ব জুড়ে বিপর্যয়কর পরিণতিসহ অন্যত্র আগ্রাসনের দরজা খুলে দিতে পারে।
আমি জানি, বিশ্বের অনেক মানুষ পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ে উদ্বিগ্ন। রাশিয়া ইউক্রেনে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করার ইচ্ছা পোষণ করে— এমন কোনো ইঙ্গিত আমরা বর্তমানে দেখতে পাচ্ছি না। যদিও মাঝে মাঝে অলংকারবহুল ভাষায় পারমাণবিক শক্তি নিয়ে রাশিয়া আস্ফালন করে, তবু এটা বিপজ্জনক এবং অত্যন্ত দায়িত্বজ্ঞানহীন কর্মকাণ্ডের বহিঃপ্রকাশ। আমি পরিষ্কার করে বলতে চাই, এই যুদ্ধে যে কোনো মাত্রায় পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার আমাদের পাশাপাশি বাকি বিশ্বের কাছে সম্পূর্ণরূপে অগ্রহণযোগ্য হবে এবং এর পরিণতি হবে মারাত্মক।
আমেরিকানরা ইউক্রেনের জনগণের সঙ্গে আছে ও থাকবে। কারণ আমরা বুঝি, স্বাধীনতার জন্য মূল্য দিতে হয়। স্বাধীনতার শত্রুরা যখনই নিরপরাধ লোকদের ওপর জুলুম-নির্যাতন চালানোর চেষ্টা করে, তখন আমরা এটাই করেছি এবং এখন আমরা সেটাই করছি। ভ্লাদিমির পুতিন এই মাত্রার ঐক্য বা আমাদের প্রতিক্রিয়ার শক্তি প্রত্যাশা করেননি। তিনি ভুল করেছেন। তিনি যদি আশা করেন যে আমরা আগামী মাসগুলোতে নড়বড়ে হয়ে পড়ব বা ভেঙে পড়ব, তবে তিনি একইভাবে ভুল করবেন।
লেখক: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৪৬তম এবং বর্তমান রাষ্ট্রপতি
দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস ও উইওয়ান অনলাইন থেকে অনুবাদ: ফাইজুল ইসলাম