জনগণের সংগ্রামই ইতিহাস নির্মাণ করে, সেই ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাহন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। জনগণের চিন্তা-চেতনা, আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্ন দিয়ে তৈরি যে রাজনৈতিক দল, তার ভাষা আপামর জনসাধারণেরই কণ্ঠের ভাষা। আমরা ভাগ্যবান, আমরা তেমনই একটি রাজনৈতিক সংগঠনের উত্তরাধিকার এবং আলোকিত তেমনই জননেতার আলোকবর্তিকায়। আমাদের দল আওয়ামী লীগ, আমাদের নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং আমাদের বাঙালি জাতীয়তাবোধ সব একাকার এই মাটির ঐতিহ্যে, সাংস্কৃতিতে, কৃষ্টিতে ও স্বাধীনতায়।
প্রতিষ্ঠাকাল থেকে আওয়ামী লীগ একটি সংগ্রামী রাজনৈতিক গণসংগঠন। আর তাই এই দল জন্মলগ্ন থেকেই জনগণনির্ভর জাতীয়তাবাদী, দেশপ্রেমিক, নির্ভীক, ত্যাগী, উদার অসাম্প্রদায়িক সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে ধাবমান। সাতচল্লিশের দেশ বিভাগের আগের অনেক বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ এবং উল্লেখ্য, কিন্তু আমি আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠনের কথাই আপনাদের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করব।
ঢাকার ১৫০ নম্বর মোগলটুলীতে মুসলিম লীগের একটি শাখা অফিস ছিল। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর এই শাখা অফিসকে কেন্দ্র করেই অফিসটি ঢাকায় হলেও সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানের নাজিমউদ্দিনবিরোধী তরুণেরা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতেন। মুসলিম লীগকে নতুন করে সংগঠিত করার জন্য ‘ওয়ার্কাস ক্যাম্প’ কর্মী সম্মেলনের আহ্বান করে। শামসুল হক ও শেখ মুজিবুর রহমান এবং মুসলিম লীগের সভাপতি আকরম খাঁ সদস্য সংগ্রহ বই দিতে অস্বীকার করলে দ্বন্দ্ব চরমে পৌঁছায়।
এমনি সময়ে হোসেন শহীদ সোহরওয়ার্দী ঢাকা হাইকোর্টে দবিরুল ইসলামের হেবিয়াস কার্পাস মামলাটি পরিচালনার জন্য ঢাকায় আসেন। তখন বিরোধী বিক্ষুব্ধদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করেন। ইতিমধ্যে তিনি মুসলিম লীগের বিপরীতে পশ্চিম পাকিস্তানে গণতন্ত্রের পক্ষে নতুন দল গঠন করার প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন। তিনি ঢাকার নেতা-কর্মীদের পরামর্শ দিয়েছিলেন মুসলিম লীগের সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করে নতুন রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তুলতে, যাতে করে পকিস্তানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা যায় এবং বলেছিলেন একমাত্র গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হলেই জনগণের ও রাষ্ট্রের উন্নয়ন সম্ভব। আওয়ামী মুসলিম লীগ নামটিও তার দেওয়া।
এই পরিস্থিতিতে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন সকাল ১০টায় কে এম দাশ লেনের বশির সাহেবের রোজ গার্ডেনের বাসভবনে মুসলিম লীগের কর্মী, নেতা এবং অন্যান্য রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সম্মেলন হয়। সম্মেলনে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী সভাপতি, শামসুল হক সাধারণ সম্পাদক এবং শেখ মুজিবুর রহমান একজনই যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন।
১৯৪৯ সালের ২৪ জুন আরমানিটোলা ময়দানে আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রথম জনসভা হয়।
বঙ্গবন্ধু মুক্তি পেয়েছিলেন ১৯৪৯ সালের ১৭ জুলাই। জেল থেকে বেরিয়ে জেলায় জেলায় প্রথম যে কমিটিগুলো তিনি করেছিলেন, বস্তুত সেই কমিটিগুলোই হয়েছিল আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রথম সাংগঠনিক স্তম্ভ।
এ দেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের জন্ম ও উত্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। দেশে তখন খাদ্যের সংকট, চালের দাম হু হু করে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ১১ অক্টোবর ১৯৪৯ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ জনসভা করে এবং জনসভা শেষে একটি ভুখা মিছিল বের হয়। মিছিলটি নবাবপুর রেল ক্রসিংয়ে পৌঁছালে পুলিশ লাঠিচার্জ করে এবং ভাসানী, শামসুল হকসহ অনেকে গ্রেফতার হন। ভাসানীর পরামর্শে বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার এড়িয়ে পাকিস্তানে যান সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে পাকিস্তানভিত্তিক রাজনৈতিক দল গঠনের আলোচনা করতে। কয়েক সপ্তাহ পকিস্তানে থেকে সোহরাওয়ার্দীসহ মামদতের নবাব, মানকি শরিফের পির সাহেবের সঙ্গে আলোচনা করে ডিসম্বরে ঢাকায় ফেরেন এবং ১ জানুয়ারি ১৯৫০ সালে গ্রেফতার হন। একটানা ২৬ মাস কারাভোগ করেন।
কিন্তু ২১ ফেব্রুয়ারির আন্দোলন ঙত্মধহরুব করার কারণে এবং এর সমর্থনে অনশন করার জন্য তাকে ফরিদপুর জেলে পঠিয়ে দেওয়া হলো। বঙ্গবন্ধু এবার মুক্তি পেলেন ১৯৫২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি, তা-ও ফরিদপুর জেল থেকে। ওখানে তার বিরুদ্ধে একটা মামলা ছিল। তাকে ঢাকা জেল থেকে ফরিদপুর জেলে পাঠানো হয়েছিল ১৯৫২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি।
১৯৫৩ সালে পূর্ববঙ্গের গভর্নর হয়ে আসেন চৌধুরী খালেকুজ্জামান। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ১৯৫৩ সালের ১৭ এপ্রিল ঢাকার পল্টনে এক সভায় বৃহত্তর গণ-আন্দোলনের কথা বললেন। ১৯৫৩ সালের ১৪ নভেম্বর ঢাকার মুকুল সিনেমা হলে আওয়ামী মুসলিম লীগের কাউন্সিল অধিবেশন হয়। এই অধিবেশনে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী সভাপতি এবং শেখ মুজিবুর রহমান সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
১৯৫৩ সালের সেপ্টেম্বরে হক সাহেব অ্যাটর্নি জেনারেল পদ থেকে পদত্যাগ করেন। মুসলিম লীগে যোগ দেন এবং কাউন্সিলে সভাপতি পদে পরাজিত হন। শেখ মুজিব তখন হক সাহেবকে আওয়ামী লীগে যোগদান করতে বলেন। উনি রাজি হন। চাঁদপুরে আওয়ামী লীগের জনসভায় বক্তৃতায় বলেন, ‘যারা চুরি করবেন তারা মুসলিম লীগে থাকেন, যারা ভালো কাজ করবেন তারা আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। আমি বুড়া মানুষ, আর বলব না, শেখ মুজিবের বক্তৃতা শোনেন।’
পরবর্তী সময়ে হামিদুল হক চৌধুরী, মোহন মিয়াদের প্ররোচনায় তিনি আওয়ামী লীগে যোগদান করেননি। যোগদান না করে কেএসপি গঠন করেন। অনেক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়।
যুক্তফ্রন্টে যে দলগুলো অন্তভুর্ক্ত হয়েছিল, সেগুলো হলো আওয়ামী মুসলিম লীগ, কৃষক শ্রমিক পার্টি (১৯৫৩ সালের অক্টোবরে গঠিত), গণতন্ত্রী পার্টি, নেজামে ইসলাম পার্টি, খিলাফতে রাব্বানী পার্টি ও কমিউনিস্ট পার্টি।
১৯৫৩ সালের ১৪-১৫ নভেম্বর ময়মনসিংহে আওয়ামী লীগ কনফারেন্সে ৪২ দফা নির্বাচনি ইশতেহার গ্রহণ করে। পরে সেটাকেই ছোট করে ২১ দফা যুক্তফ্রন্টের কর্মসূচি হিসাবে ঘোষণা করা হয়।
৩০৯টি আসনের মধ্যে প্রাপ্ত আসনের সংখ্যা ২৩৭টি। ১৯৫৪ সালের ২৫ মার্চ কর্ণফুলী পেপার মিলে বাঙালি-বিহারি দাঙ্গায় ১০ জন প্রাণ হারান। ১৯৫৪ সালের ২ এপ্রিল ঢাকা বার লাইব্রেরিতে যুক্তফ্রন্টের পার্লামেন্টারি দলের সভা বসে। পালামেন্টারি দলের নেতা মনোনীত হন শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক। চিফ মিনিস্টারের দায়িত্ব নিয়েছিলেন তিনি ঐ দিনই। সৈয়দ আজিজুল হক নান্না মিয়া ও আবু হোসেন সরকারে এবং পরদিন মন্ত্রিসভায় যোগ দেন এবং ১৯৫৪ সালের ৩ এপ্রিল আশরাফ উদ্দিন আহমেদকে নেওয়া হয় মন্ত্রী হিসেবে। শেরেবাংলা কলকাতা সফরে গিয়ে তার ভাষণে পাকিস্তানের সার্বভৌমত্বকে আঘাত করে কী একটা কথা বলেছেন বলে মারাত্মক অভিযোগ ওঠে।
শেরেবাংলা দেশে ফিরে ঐ অভিযোগের বিরুদ্ধে প্রতিবাদও দিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ রক্ষা করা যায়নি। শেরেবাংলা কলকাতা থেকে ফিরে ১৯৫৪ সালের ১৩ মে আতাউর রহমান খান, ইউসুফ আলী চৌধুরী, আবদুস সালাম খান, শেখ মুজিবুর রহমান, সৈয়দ মোয়াজ্জেম উদ্দিন হোসেন, আবুল মনসুর আহমেদ, হাশিমুদ্দিন আহমদ, কফিলউদ্দিন আহমদ চৌধুরী ও আবদুল লতিফ বিশ্বাসকে মন্ত্রী হিসেবে মনোনীত করেন। নতুন মন্ত্রীগণ গভর্নর হাউজে শপথ নেওয়ার সময়ই ডেমরায় আদমজী পাটকলে বিহারি-বাঙালি দাঙ্গা বেধে যায়।
১৫ দিনের মাথায়, অর্থাত্ ৩০ মে পাকিস্তান সরকার ৯২-এর ক ধারামতে প্রাদেশিক সরকার ভেঙে দিয়ে গভর্নরের শাসন কায়েম করে। ঐ দিনই সকালে বঙ্গবন্ধু, আতাউর রহমান সাহেবসহ শেরেবাংলার বাসভবনে গিয়ে কেবিনেট মিটিং ডেকে প্রত্যাখ্যান করার কথা বলেন; হক সাহেব কিছু না বলে ওপরে উঠে যান।
১৯৫৫ সালের ২১ সেপ্টেম্বর রূপমহল সিনেমা হলের সম্মেলনে আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে মুসলিম শব্দ বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগ অসাম্প্রাদায়িক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়। আজ বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া স্বাধীন বাংলাদেশ পরিচালনা করছেন তারই সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা। বঙ্গবন্ধুকন্যা দেশে এসে আন্দোলন ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সব ষড়যন্ত্র বানচাল করে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আজকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মূল্যবোধ পুনঃপ্রতিষ্ঠা, চার মূলনীতি সংবিধানে পুনঃঅন্তভুর্ক্ত করেছেন।
বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের এবং যুদ্বাপরাধী ও মানবতাবিরোধীদের বিচার অনুষ্ঠিত করে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে পাপমুক্ত করছেনে। আজ শেখ হাসিনার নির্ভীক, তেজস্বী ও দূরদর্শী নেতৃত্বের এবং সফল রাষ্ট্রনায়কোচিত সিদ্ধান্ত ও পরিচালনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মানুষকে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার বাস্তব প্রতিফলন দেখিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আধুনিক ডিজিটাল বাংলাদেশ নির্মাতা ও উন্নয়নের কান্ডারি। উন্নত, সমৃদ্ধ, মর্যাদাশীল বাংলাদেশ নির্মাণের রূপকার। শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হয়েছে এবং দেশ এখন উন্নয়নের মহাসড়কে।
শেখ হাসিনার সফল নেতৃত্বে পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প, কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণ প্রকল্প, ঢাকার মেট্রোরেল প্রকল্প, দোহাজারী-রামু-ঘুমধুম রেল প্রকল্প, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র, মাতারবাড়ী কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্র, পায়রা বিদ্যুৎ নির্মাণ প্রকল্প, পায়রা বন্দর, সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দরসহ মেঘা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে।
তার সফল রাষ্ট্র পরিচালনার মধ্য দিয়ে তিনি খাদ্যের নিরাপত্তা, দারিদ্র্যবিমোচন, শিশু ও মাতৃমৃতু্যর হার হ্রাস, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার, বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান, শিক্ষানীতি প্রণয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন, গণতন্ত্র, শান্তি, জঙ্গি দমন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার মাধ্যমে তিনি বহু মর্যাদাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করেছেন। ২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে স্বীকৃতির মাধ্যমে বাঙালি জাতিকে গৌরাবান্বিত করেছেন।
বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের মাধ্যমে বাংলাদেশকে বিশ্বে মর্যাদার নতুন মাত্রা দিয়েছেন। শেখ হাসিনা আজ বিশ্বে একজন নন্দিত সফল রাষ্ট্রনায়ক। তিনি সত্ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বিশ্বে তৃতীয় স্থানের অধিকারী হয়েছেন।
বর্তমানে অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে করোনা পরিস্থিতি এবং পাশাপাশি উপযুর্পরি বন্যার মোকাবিলা করে যাচ্ছেন।
আজ তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে। তার ঘোষিত ৪১ সালের আগেই উন্নত দেশে রূপান্তরিত হবে। আমি তার দীর্ঘায়ু কামনা করি।
লেখক: সংসদ সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, কেন্দ্রীয় ১৪ দলের সমন্বয়ক ও মুখপাত্র