কোভিড ও ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সরবরাহ চেইন ভেঙে পড়ার প্রভাবে বিশ্বব্যাপী খাদ্যসহ নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে তো বাড়ছেই। বাংলাদেশেও মূল্যস্ফীতির তাপ ও চাপ দুই-ই তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছে। এরই মধ্যে মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ব্যাপক বন্যায় বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবনচলায় সংকট আরো বেড়েছে। এত দ্রুত এই দুর্যোগ দেখা দিয়েছে যে, সমাজ ও প্রশাসন একদম প্রস্ত্তত ছিল না।
হঠাত্ করেই সিলেট ও সুনামগঞ্জে দ্রুত বন্যা নেমে এসেছে। এই দুই জেলার ৮০-৯০ শতাংশ বাড়িই বন্যাক্রান্ত। উত্তরে মেঘালয়ে অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে এই হঠাত্ বন্যা। এই অঞ্চলের বন্যা পরিস্হিতি ধীরে ধীরে উন্নতি লাভ করলেও শরীয়তপুর, ফরিদপুর ও রাজবাড়ী জেলাসহ মধ্যাঞ্চলে বন্যার প্রকোপ বাড়তে শুরু করেছে। আর উত্তরবঙ্গের তিস্তা অববাহিকায় বন্যার পানি বিপত্সীমার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। শেরপুর, জামালপুর ও কিশোরগঞ্জেও বন্যা পরিস্হিতির অবনতি ঘটছে। এখন দেশের ১২টি জেলায় বন্যা দেখা দিয়েছে। ১৮টি পয়েন্টে বন্যার পানি বিপত্সীমার ওপর দিয়ে বইছে।
এ সময় জমিতে আউশ ধান ছিল। কৃষিমন্ত্রী বলেছেন দেশে ৫৬ হাজার হেক্টর জমিতে আউশ ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাছাড়া শাকসবজি, তিল ও বাদামসহ অন্যান্য ফসলের ক্ষতি হয়েছে। আর গরু-বাছুরসহ প্রাণী সম্পদের ক্ষতিও কম হয়নি। মাছের পুকুর ভেসে গেছে। তবে কৃষির এই ক্ষতির চেয়েও সিলেট বিভাগে হঠাত্ বন্যায় ঘরে রাখা ধান চাল, অন্যান্য নিত্যপণ্য রক্ষা করাই মুশকিল হয়ে গেছে। এসব ফেলেই বিপন্ন মানুষ ঘরের চালে কিংবা আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন। দোকানপাট, কলকারখানার যন্ত্রপাতির বিস্তর ক্ষতি হয়ে গেছে। তবে সবচেয়ে জরুরি হয়ে পড়েছে এই বিপর্যয় থেকে মানুষকে আগে প্রাণে বাঁচানো। সরকার খুবই দ্রুত বেসামরিক প্রশাসনের পাশাপাশি সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর সদস্যদের বন্যার্তদের উদ্ধার এবং ত্রাণ সহযোগিতায় যুক্ত করেছেন। প্রশাসনিক এই সমন্বয়ের খুবই প্রয়োজন ছিল। এর পাশাপাশি বেসরকারি ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানসমূহও মানুষ বাঁচাতে নেমে পড়েছে। রাজনৈতিক সংগঠনগুলোও বসে নেই। ইতিমধ্যেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বন্যাদুর্গত এলাকা সফর করেছেন এবং প্রশাসনকে উপযুক্ত নির্দেশনা দিয়েছেন।
দুর্যোগ মোকাবিলায় আমাদের রয়েছে গভীর অভিজ্ঞতা এবং অনুকরণীয় ঐতিহ্য। ১৯৮৮, ১৯৯৮, ২০০৪ সালের বন্যা মোকাবিলা ছাড়াও আমরা সিডরের মতো দুর্যোগ সাফল্যের সঙ্গে মোকাবিলা করেছি। বিশেষ করে ১৯৯৮ সালের বন্যা মোকাবিলার সফল নেতৃত্ব বর্তমান প্রধানমন্ত্রীই দিয়েছিলেন। আমরা সে সময় লক্ষ করেছিলাম, কী নিষ্ঠার সঙ্গে সব বিপর্যস্ত মানুষের জন্য শুকনো খাবারসহ চালডালের প্যাকেট সরবরাহের ব্যবস্হা তিনি করেছিলেন। কৃষি পুনর্বাসনের অংশ হিসেবে বর্গাচাষিদেরসহ কৃষকদের সহজে ঋণ দেওয়ার জন্য হাটেবাজারে কৃষি ব্যাংকের বুথ খোলার ব্যবস্হা করেছিলেন। সেবার বিবিসিসহ অনেকেই আশঙ্কা করেছিল, বিপুল মানুষ ঐ দুর্যোগে মারা যাবে। কিন্তু বাস্তবে সরকারের বিচক্ষণ ত্রাণ ও পুনর্বাসননীতি দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য কেউই প্রাণ হারাননি। এ
নজিও ছাড়াও সমাজের নানা ক্লাব, অ্যাসোসিয়েশন, সরকারি কর্মচারী-কর্মকর্তা কল্যাণ সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র ও শিক্ষকদের নানা প্রতিষ্ঠান, শিল্প-সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠানের সদস্যরা একযোগে নেমে এসেছিলেন বন্যার্তদের বাঁচানোর জন্য। আমি নিজে দেখেছি ঢাকা শহরে ত্রাণশিবিরে পাড়ার মানুষজন চাল, আটার বস্তা পাঠিয়ে দিয়েছেন নিজেদের পরিচয় না দিয়েই। সামাজিক পুঁজির সেই বিস্ময়কর বিস্ফোরণের স্মৃতি আজও চোখে ভাসছে। ত্রাণ বিতরণ করতে গিয়ে স্বেচ্ছাসেবী তরুণদের প্রাণ দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে এই বাংলাদেশে। তাই পুরো জাতিকে এখন এই বন্যা পরিস্হিতি মোকাবিলায় দলমতনির্বিশেষে হাতে হাত রেখে নেমে পড়তে হবে।
বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের স্বেচ্ছাসেবকরা যেমন ভাসমান ত্রাণ সরবরাহ ব্যবস্হা গড়ে তুলেছেন তেমনি করে মানুষের ও প্রাণীদের পাশে খাবার নিয়ে যেতে হবে। সড়কে ও ত্রাণশিবিরের বিপর্যস্ত মানুষের পাশাপাশি যারা ঘরের ছাদে বা ঘরে আটকে আছেন তাদের জন্য খাবারের ব্যবস্হা করতে হবে। হঠাৎ এভাবে পানি আসবে তা মানুষের ভাবনাতে ছিল না। তাই সবকিছু ফেলেই তারা নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে নেমে পড়েছেন। এদের পুনর্বাসনে এবারে নতুন করে ভাবতে হবে। বন্যাকবলিত এলাকায় সরকারসহ অন্য অংশীজনরাও ব্যাপক মাত্রায় ত্রাণ তত্পরতা চালাচ্ছে। এটি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে প্রায়শই ত্রাণ তত্পরতার বাইরে থেকে যায় যেসব মানুষ (যেমন :তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী), তাদের কাছে ত্রাণ পৌঁছানোর দিকে সবার নজর রাখতে হবে।
বড় সংকটের সময় আরো কিছু খুঁটিনাটি বিষয় মাঝেমধ্যেই উপেক্ষিত থেকে যায়। যেমন: সব হারিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে আসা নারীদের জন্য স্যানিটারি প্যাডের ব্যবস্হা করা। একেবারে কমবয়সি শিশু, কিংবা অতি বৃদ্ধ—যারা সাধারণ খাবার গ্রহণ করতে পারেন না, তাদের জন্য বিশেষ খাবারের ব্যবস্হা। সাধারণ প্রয়োজনীয় ওষুধের পাশাপাশি ডায়াবেটিস ও রক্তচাপের মতো অসংক্রামক রোগে আক্রান্তদের জন্য আলাদা ওষুধ সরবরাহ। এ চাহিদাগুলো মেটানোর জন্য আলাদা উদ্যোগ নেওয়ার কথাও আমাদের মাথায় রাখতে হবে। বন্যাকবলিত এলাকায় নৌকার সংকটের কারণে অনেকে ত্রাণ নিয়ে পৌঁছাতে পারছেন না, কোথাও কোথাও উদ্ধার তত্পরতাও ধীরগতিতে চলছে। এমন অবস্হায় অন্য এলাকা (যেখানে এখন বন্যা নেই) নৌকা নিয়ে আসার ব্যবস্হা করা দরকার। স্হানীয় প্রশাসন বিশেষ উদ্যোগ নিয়ে দুর্যোগপূর্ণ এলাকায় নৌকা সংগ্রহ-প্রক্রিয়া সমন্বয় করতে পারে। কোভিডের শুরুতে হাওর এলাকায় বোরো ধান কাটার জন্য লকডাউনের মধ্যেও স্হানীয় প্রশাসন বাইরে থেকে শ্রমিক সংগ্রহের ব্যবস্হা করে প্রশংসা অর্জন করেছিল। এক্ষেত্রেও তারা নিশ্চয় পারবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিসহায়তায় কৃষক, খুদে ব্যবসায়ীদের পুরোনো ঋণের কিস্তি আদায় বন্ধ রেখে ব্যাংক, ক্ষুদ্র ঋণ সংস্হাসমূহকে অন্তত ছয় মাসের গ্রেস পিরিয়ডসহ সহজ শর্তের ঋণের ব্যবস্হা করতে হবে। আর সামাজিক সুরক্ষা তহবিলের বরাদ্দ বন্যাকবলিত জেলাগুলোর জন্য বাড়াতে হবে। এসব জেলায় পারিবারিক কার্ড বেশি করে দেওয়ার ব্যবস্হা করতে হবে। বন্যার্ত এলাকায় প্রবাসীরা তাদের আত্মীয়স্বজনের জন্য নিশ্চয় বেশি করে অর্থ পাঠাবেন। এর বাইরেও এসব এলাকায় সামাজিক ও প্রশাসনিক ত্রাণ উদ্যোগেও তারা অংশগ্রহণ করবেন বলে প্রত্যাশা করছি। বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান তাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিল থেকে নির্ভরযোগ্য সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মতত্পরতা যাতে বাড়ায় সে নির্দেশনাও দিতে পারে। একই সঙ্গে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলেও তারা তাদের সিএসআর অর্থের একটি অংশ দিতে পারেন।
সবচেয়ে বড়ো কথা হলো বিপদের দিনে আমাদের সবাইকে এসব বিপর্যস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। চরের মানুষ খুবই দুঃখী মানুষ। তিস্তা অববাহিকা ছাড়াও ফরিদপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগের চরাঞ্চলের বন্যার্ত মানুষের পাশে সরকারের পাশাপাশি এনজিও ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাচ্ছি। জাতীয় চর অ্যালায়েন্স তার অংশীজনদের এক্ষুনি এই দুর্যোগে তত্পর হওয়ার জন্য আহ্বান জানাতে পারে। এ ধরনের সংকটে মানুষের কল্যাণে এগিয়ে আসার অভিজ্ঞতা তাদের আছে। সাময়িক ত্রাণ তত্পরতার পরপরই তাদের জীবন ও জীবিকার জন্য অর্থনৈতিক পুনর্বাসনের উদ্যোগও নিতে হবে। বন্যা-পরবর্তী পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াকে কার্যকর করতে কিছু সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব এখানে তুলে ধরতে চাই
১) আসন্ন ২০২২-২৩ অর্থবছরের জন্য কৃষি ভতুর্কি চলতি অর্থবছরের চেয়ে ৩ হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে ১৬ হাজার কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। বন্যাকবলিত এলাকগুলোর কৃষির পুনরুদ্ধারের কথা বিবেচনা করে এই বরাদ্দ অন্তত ২০ হাজার কোটি টাকা করা যেতে পারে। বন্যায় আক্রান্ত হয়নি এমন এলাকার বীজতলা থেকে বীজ এনে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করা যেতে পারে।
২) শিক্ষা, স্বাস্হ্য ও সামাজিক সুরক্ষা খাতের জন্য আসছে বছরের জন্য যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, তা বাড়ানোর পরামর্শ আগে থেকেই ছিল। এ খাতগুলোতে বরাদ্দ যতটা সম্ভব বাড়িয়ে সেই বাড়তি সম্পদ অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে বন্যার শিকার এলাকাগুলোতে বিনিয়োগ করা গেলে ভালো হয়।
৩) প্রস্তাবিত বাজেটে ৫ হাজার কোটি টাকার থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে মহামারি-পরবর্তী স্বাস্হ্যগত দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য। এই অর্থের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বন্যার শিকার হওয়া এলাকাগুলোর পুনরুদ্ধারের জন্য বিনিয়োগ করার পরিকল্পনা করা উচিত।
৪) বন্যায় অনেক মানুষ গৃহহীন হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগে গৃহহীনদের জন্য ঘর নির্মাণ করে দেওয়ার যে প্রকল্পটি ইতিমধ্যেই সাফল্য দেখিয়েছে তার আদলে বন্যাকবলিত এলাকাগুলোতে গৃহনির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ করার কথা এখন থেকেই ভাবা যায়।
৫) দুর্যোগকালে যে ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠান, অসরকারি সংস্হা, এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো ব্যাপক ত্রাণ-তত্পরতা চালিয়ে ইতিবাচক/সহায়ক ভূমিকা রাখছে, দুর্যোগ-পরবর্তী পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াতেও তাদেরকে একই মাত্রায় যুক্ত থাকার আহ্বান জানানো যায়।
৬) ব্যাংক, ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তিখাতের প্রতিষ্ঠানগুলোকে চলমান কোভিড-সম্পর্কিত প্রণোদনা প্যাকেজের পরিমাণ আরো বাড়িয়ে বন্যাকবলিত এলাকায় তা বাস্তবায়নে যুক্ত করার সুযোগ রয়েছে।
এই সংকটকালে যেন অসাধু ব্যবসায়ীরা চাল ও নিত্যপণ্যের দাম ইচ্ছেমতো না বাড়ায় সেদিকে প্রশাসনকে করা নজর রাখতে হবে। খাদ্যনিরাপত্তার জন্য সরকারি খাদ্য মজুত সন্েতাষজনক বলেছেন খাদ্যমন্ত্রী। শূন্য শুল্কে খাদ্য আমদানির সুযোগ করে দেওয়ার নীতিটিও ভালো। তবে সাবধানের মার নেই। খাদ্যমজুত আরো বাড়াতে উদ্যোগী হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। সবশেষে বলব—আসুন, সবাই মিলে এই সংকট মোকাবিলা করি। বন্যার্তদের পাশে দাঁড়াই।
লেখক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর