বাংলাদেশ যখন মধ্যম আয়ের দেশের সোপানে পা রেখেছে, তখন পৃথিবীব্যাপী কড়া নাড়ছে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ‘নমো যন্ত্র, নমো--যন্ত্র’ কবিতাংশে যন্ত্রের আগ্রাসনের কথা উল্লেখ করেছিলেন সেই কবে। আর এখন একবিংশ শতাব্দীতে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব তার বিজয়কেতন ওড়াচ্ছে। বাষ্পীয় ইঞ্জিনকে ভিত্তি করে যে প্রথম শিল্পবিপ্লব ঘটেছিল, তার প্রধান সুফল ভোগ করেছিল মূলত ইউরোপিয় বলয়ে। তারা তাদের কলোনি থেকে সংগৃহীত সম্পদের মাধ্যমে এই বিপ্লবের সুফল নিজেদের পক্ষে নিতে পেরেছিল। বিদ্যুতর আবিষ্কার, জ্বালানি তেলের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং উৎপাদনব্যবস্থায় কনভেয়ার বেল্টের ব্যবহার দ্বিতীয় শিল্পবিপ্লবকে ত্বরান্বিত করেছিল।
ইলেকট্রনিকস ও যোগাযোগ প্রযুক্তি তৃতীয় শিল্পবিপ্লবকে বেগবান করে। এরই পরিক্রমায় সূচিত হয়েছে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব। এই পর্বে বস্ত্তগত, ডিজিটাল ও জৈবিক সীমা একাকার হয়ে গেছে। জীবকোষের অতি আণুবীক্ষণিক পর্যায় থেকে মহাকাশ পর্যন্ত চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের বলয় অভূতপূর্বভাবে প্রসারিত হয়েছে। ন্যানোটেকনোলজি, ইন্টারনেট অব থিংস, আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্স, বায়োমিমিআই রোবটিকস, থ্রিডি প্রিন্টিং ইত্যাদি হয়ে উঠেছে এই শিল্পের বাহন। বিপ্লবের গতি সব সময়ই বেশি থাকে, কিন্তু তা সর্বত্র সমান থাকে না। তাই এর সুফল সবাই ভোগ করতে পারে না। এমআইটির অধ্যাপক এরিকের ভাষায় প্রযুক্তি সবার জন্যই উন্মুক্ত থাকে, কিন্তু সবাই তা থেকে সমানভাবে উপকৃত হয় না। অসাম্যই এর প্রধান কারণ। যেমন দুনিয়ার ১৭ শতাংশ লোক এখনো দ্বিতীয় শিল্পবিপ্লবের সুফল পায়নি। কারণ এখনো ১৩০ কোটি লোক বিদ্যুতের সংযোগবঞ্চিত। আবার, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বসবাসকারী ৪০০ কোটি মানুষের ইন্টারনেট সংযোগ নেই, তাই তারা পায়নি তৃতীয় শিল্পবিপ্লবের সুফল। অথচ এরই মধ্যে ঝান্ডা ওড়াচ্ছে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব।
যে সমাজ যত দ্রুত প্রযুক্তিকে গ্রহণ করেছে, সেই সমাজ তত সামনে থেকে উন্নতিতে নেতৃত্ব দিয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলো ইতিমধ্যে এই বিপ্লবের জন্য নিজেদের প্রস্ত্তত করছে। তারা তাদের কারিকুলামে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে, গবেষণায় বরাদ্দ বাড়িয়েছে। পিছিয়ে নেই এশিয়ান দেশগুলোও। ফোর্বসের কিছু নিবন্ধ ইতিমধ্যে আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্সে চীনকে পৃথিবীর প্রথম সুপারপাওয়ার হিসেবে ঘোষণা করেছে।
এখন বাংলাদেশ এক্ষেত্রে কোন অবস্থায় আছে? যে কোনো বিপ্লবের সুযোগ ও শঙ্কা থাকে, তবে বাংলাদেশের সুযোগের সম্ভাবনাই বেশি। কারণ মোট জনসংখ্যার ৩০ শতাংশই তরুণ, যারা আগামী ৩০ বছর যাবত্ উৎপাদনশীল জনগোষ্ঠী হিসেবে সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকবে। ২০২১ সালে ইনফরমেশন টেকনোলজির মিনিস্ট্রিয়াল কনফারেন্সে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুযোগ্য পুত্র ডিজিটাল বাংলাদেশের অন্যতম স্বপ্নদ্রষ্টা আইসিটি বিশেষজ্ঞ সজীব ওয়াজেদ জয় বলেন, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবে বাংলাদেশ নেতৃত্ব দিতে চায় এবং সে অনুযায়ী বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। তার এই আশাবাদের ব্যাখ্যা পাওয়া যায় মাননীয় আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের বক্তব্যে।
সম্প্রতি তিনি আগরতলায় এক সামিটে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব অভিমুখে বাংলাদেশের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন। বাংলাদেশ সরকার ১৩ হাজার শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব স্থাপন করেছে, ৩০০ ফিউচার স্কুল, ৪৩টি হাইটেক পার্কসহ ৬৪টি শেখ কামাল আইটি ট্রেনিং সেন্টার স্থাপিত হয়েছে। এর মাধ্যমে ২০৪১ সাল নাগাদ ১০ লাখ মানুষের প্রশিক্ষণ এবং ৫ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এমনটাই ধারণা করা হচ্ছে।
২০২৫ সালের মধ্যে প্রতিটি গ্রাম ফাইবার অপটিক ক্যাবলের মাধ্যমে সংযুক্ত থাকবে। বাংলাদেশ ২০২০ সালে আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্স পলিসি গ্রহণ করেছে, ২০২১ সালে ব্লেন্ডেড লার্নিং পলিসি গৃহীত হয়েছে। এসব পদক্ষেপ থেকে বোঝা যায়, বর্তমান সরকার বিষয়টিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে। তবে ভাবতে হবে বিপ্লবের নেতিবাচক দিকগুলো নিয়েও। ক্রিপ্টোকারেন্সি, ট্রান্স বর্ডার সাইবার ক্রাইম, হ্যাকিং, ব্যক্তিগত তথ্যের উন্মুক্তি—এসব বিষয় বাংলাদেশ কীভাবে মোকাবিলা করবে, সেটা নিয়ে এখনই পরিকল্পনা করা প্রয়োজন। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সঙ্গে বাংলাদেশের আন্তঃসম্পর্ক নিয়ে বৃহত্ পরিসরে গবেষণা প্রয়োজন। এজন্য প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিষয়ভিত্তিক ইনকিউবেশন সেন্টার হওয়া দরকার, যেটা থেকে প্রাপ্ত ফলাফল নিয়ে সমন্বিত পরিকল্পনা তৈরি হবে।
সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড ব্যবহার করলে বাংলাদেশের পক্ষে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সর্বোচ্চ সুফল পাওয়া সম্ভব।
লেখক: এমফিল গবেষক, আইইআর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়