অর্থনীতির কিছু ব্যতিক্রমী স্বভাব আছে। একবার কোনো এক দেশের বাজারে ময়লা ও ছেঁড়া টাকার উপস্থিতি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেলে রাজা খুবই শঙ্কিত হয়ে পড়েন। রাজা তার সুনাম বজায় রাখার জন্য সাধারণ মানুষের হাতে পরিষ্কার ও ভালো টাকা তুলে দেওয়ার জন্য দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। রাজা মন্ত্রীদের, বিশেষ করে অর্থমন্ত্রীকে নির্দেশ দেন ভালো টাকা বাজারে ছাড়ার জন্য। রাজার নির্দেশে টাকশালে পর্যাপ্ত পরিমাণ নতুন টাকা মুদ্রণ করে তা বাজারে ছাড়া হয়। কিছুদিনের মধ্যেই খবর পাওয়া গেল, বাজারে আগের মতোই ছেঁড়া ও খারাপ টাকার উপস্থিতি লক্ষ করা যাচ্ছে। রাজা ও মন্ত্রী খু্বই চিন্তায় পড়ে গেলেন।
দেশের খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদদের এক সভায় আহ্বান করলেন বাজারে ছেঁড়া টাকার উপস্থিতি বৃদ্ধির কারণ খুঁজে বের করার নির্দেশ দেওয়ার জন্য। অর্থনীতিবিদগণ ব্যাপক গবেষণা করে দেখলেন, সাধারণ মানুষ মুদ্রিত নতুন টাকা ব্যাপকভাবে সঞ্চয় করছে। তারা ভালো ও নতুন টাকা নিজেদের কাছে আটকে রেখে খারাপ টাকা বাজারে ছেড়ে দিচ্ছে। ফলে বাজারে নতুন টাকার উপস্থিতি লক্ষ করা যাচ্ছে না, বরং পুরোনো টাকাই বাজার দখল করে রাখছে।
অর্থনীতিবিদগণ তখন একটি নতুন থিউরি প্রকাশ করেন। থিউরিটি হচ্ছে, ‘ব্যাড মানি ড্রাইভস অ্যাওয়ে গুড মানি ফ্রম দ্য মার্কেট।’ অর্থাৎ, মন্দ টাকা বাজার থেকে ভালো টাকাকে বিতাড়িত করে। সেই থিউরি এখনো অর্থনীতিতে প্রচলিত আছে। আসলে ভালো জিনিস দিয়ে সব সময় খারাপ কিছুর প্রতিস্থাপন করা যায় না। মানুষের কিছু স্বাভাবিক প্রবণতা আছে, যা প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গির সম্পূর্ণ বাইরে। অথচ বাস্তবে জিনিসগুলো ঘটে থাকে। অধিকাংশ মাছের স্বভাব হচ্ছে ভাটির দিকে ধাবিত হয়। কিন্তু কিছু কিছু মাছ আছে, যা ভাটির দিকে ধাবিত হওয়ার পাশাপাশি উজানেও ধায়। যেমন, বর্ষা শুরু হওয়ার পর নতুন পানি এলে কই মাছ উজান বেয়ে ওপরের দিকে ধাবিত হয়।
বিপৎসংকুল এই পথপরিক্রমায় অনেক সময় কই মাছ মারা যায়। তার পরও তাদের এই প্রবণতা চলছে অবিরাম গতিতে। কই মাছ মনে করে, সমস্ত সুখ উজানেই বিদ্যমান। তাই তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হলেও উজানে ধাবমান হয়। কই মাছের এই ব্যতিক্রমী স্বভাব মানুষের মধ্যেও বিদ্যমান। মানুষ অর্থ উপার্জন করে ভবিষ্যত্ বংশধরদের সুখের জন্য। অধিকাংশ সময়ই মানুষ নিজের উপার্জিত অর্থ-সম্পদ নিজে ব্যবহার বা ভোগ করতে পারে না। মানুষ নিজের উপার্জিত অর্থ-সম্পদ ভোগ করতে না পারলেও অর্থ-সম্পদ উপার্জনের নিরন্তর চেষ্টা তার মধ্যে বহমান থাকে। আর উপার্জিত অর্থ-সম্পদ নিয়ে পরবর্তী বংশধরদের মধ্যে সমস্যার সৃষ্টি হয়।
বাংলাদেশের প্রতিটি মুসলিম পরিবারেই কোনো না কোনোভাবে উত্তরাধিকারীদের মধ্যে সম্পদের ভোগ-বণ্টন নিয়ে সংঘাত সৃষ্টি হয়। অর্থের একটি চমৎকার স্বভাব হচ্ছে, তা সব সময়ই মুনাফার দিকে ধাবিত হয়। অর্থ কখনোই লোকসানের দিকে ধাবিত হয় না। এই মুনাফা দেশেও অর্জিত হতে পারে, আবার মুনাফার জন্য বিদেশেও যেতে হতে পারে। মুনাফা কখনোই দেশের সীমান্ত মেনে চলে না। যেখানে মুনাফা পাওয়ার সম্ভাবনা আছে, অর্থ-সম্পদ সেদিকেই ধাবিত হয়। বিশ্বব্যাপী মুদ্রা পাচার একটি জটিল সমস্যায় পরিণত হয়েছে।
এমন একটি দেশও খুঁজে পাওয়া যাবে না, যারা মানি লন্ডারিং এবং অর্থ পাচার সমস্যা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। বিশ্বব্যাপী মুদ্রা পাচার ও মানি লন্ডারিং ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। একটি দেশ থেকে কী পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হয় বা মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে বৈধ চ্যানেলে টাকা প্রবিষ্ঠ করানো হয়, তার সঠিক পরিসংখ্যান কেউই দিতে পারবে না। যদিও অনেকেই দাবি করেন, কোন দেশ থেকে কত টাকা পাচার হয় এবং মানি লন্ডারিং হয়। যারা মুদ্রা পাচার করেন এবং মানি লন্ডারিংয়ের মতো ঘৃণ্য কাজ করেন, তারা কখনোই তাদের উপার্জিত অর্থের উত্স ও পরিমাণ কারো কাছে প্রকাশ করেন না। এছাড়া কোনো বৈধ কতৃর্পক্ষ নেই, যারা পাচারকৃত অর্থ এবং মানি লন্ডারিংকৃত অর্থের পরিসংখ্যান সংরক্ষণ করে। কাজেই কেউ যদি বলেন, দেশ থেকে প্রতি বছর এত কোটি টাকা পাচার হয়, তাহলে তা সম্পূর্ণ মিথ্যাচার ছাড়া আর কিছু নয়।
জাতিসংঘের একটি তথ্যমতে, বিশ্বে প্রতি বছর ৮০ হাজার মার্কিন ডলার থেকে ২ লাখ কোটি মার্কিন ডলাররে সমপরিমাণ অর্থ মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে অর্থনীতির মূল স্রোতধারায় প্রবিষ্ট হয়। এই পরিমাণ অর্থ বিশ্ব জিডিপির ২ থেকে ৫ শতাংশ। এখানে একটি বিষয় লক্ষ করার মতো, তা হলো পরিসংখ্যানের গ্যাপটি বড়ই দৃষ্টিকটু। এই গ্যাপের পরিমাণ হচ্ছে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি মার্কিন ডলার। এটা কোনোভাবেই বিশ্বাসযোগ্য নয়। জাতিসংঘ যে পরিসংখ্যান দিয়েছে, তা অবশ্যই মনগড়া। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইনটিগ্রিটি (জিএফআই) তাদের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, বাংলাদেশ থেকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মাধ্যমে প্রতি বছর ৬৪ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়। তাদের এই হিসাবও মনগড়া, এতে কোনো সন্দেহ নেই। বাংলাদেশ থেকে কী পরিমাণ অর্থ প্রতি বছর বিদেশে পাচার হয়, তার সঠিক পরিসংখ্যান কেউই দিতে পারবে না।
তবে পাচারকৃত মুদ্রার পরিমাণ যে কম নয়, তা নিশ্চিত করে বলা যেতে পারে। বাংলাদেশের একজন অর্থনীতিবিদ বলেছেন, স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে। তার এই তথ্যের ভিত্তি কী, তা তিনি উল্লেখ করেননি। এই অর্থনীতিবিদ একবার প্রসঙ্গক্রমে বলেছিলেন, বাংলাদেশের বাজারে প্রতিদিন ৫ হাজার কোটি টাকার জাল নোট আসছে। তার এই বক্তব্যের বিষয়ে সেদিন অনেকেই দ্বিমত প্রকাশ করেছিলেন। হিসাব করে দেখা গিয়েছিল, প্রতিদিন ৫ হাজার কোটি টাকার জাল নোট বাজারে এলে বছরে যে পরিমাণ জাল নোট বাজারে আসে, তার একত্রিত পরিমাণ সেই বছরের মোট জিডিপির চেয়েও বেশি।
বিভিন্ন পত্রিকায় এই পরিসংখ্যানের সত্যতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট অর্থনীতিবিদ তার আগের বক্তব্য সংশোধন করে বলেছিলেন, প্রতিদিন ৫ হাজার কোটি টাকার জাল নোট বাজারে আসে না, প্রতিদিন ৫ হাজার বার জাল নোট হাত বদল হয়। তার এই বক্তব্যও প্রশ্নাতীত নয়।
শুধু যে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশ থেকেই মুদ্রা পাচার ও মানি লন্ডারিং হয়, তা নয়। উন্নত দেশ থেকেই মানি লন্ডারিং ও মুদ্রা পাচার হয়ে থাকে। কয়েক বছর আগে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছিল, উন্নত দেশগুলো থেকে কী পরিমাণ অর্থ উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতিতে প্রবেশ করছে। মূলত দুটি কারণে মুদ্রা পাচার ও মানি লন্ডারিং হয়। প্রথমত, অধিক মুনাফা অর্জনের সম্ভাবনা। দ্বিতীয়ত, অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর যে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হয়, তার মধ্যে প্রথম কারণটি সবচেয়ে তাত্পর্যপূর্ণ অবদান রাখছে।
বিশ্বের এমন অনেক দেশ আছে, যেখানে পুঁজি বিনিয়োগ করতে পারলেই পর্যাপ্ত মুনাফার আশা করা যায়। সামাজিক-রাজনৈতিক স্থিতিশীল অবস্থা বিদ্যমান আছে এমন সব দেশে পুঁজি বিনিয়োগ করলে তুলনামূলক বেশি মুনাফা অর্জনের সম্ভাবনা থাকে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আড়ালে বাংলাদেশ থেকে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হচ্ছে, তার উদ্দেশ্য হচ্ছে উন্নত দেশগুলোতে বিনিয়োগের মাধ্যমে অধিকতর মুনাফা অর্জন করা।
বাংলাদেশ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য আরো বেশি আকর্ষণীয় হতে পারত, যদি এখানে আরো বেশি পরিমাণে মুনাফা অর্জনের সম্ভাবনা থাকত। পুঁজির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেত। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প নিয়ে আমরা গর্ব করি। কিন্তুতৈরি পোশাকশিল্পের একজন শ্রমিককে যে হারে বেতন-ভাতা প্রদান করা হয়, তা দিয়ে তাদের সংসার চলে না। বাংলাদেশের বিভিন্ন ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে যে বেতন-ভাতা দেওয়া হয়, তাকে অর্থনীতির পরিভাষায় পূর্ণাঙ্গ কর্মসংস্থান বলা যায় না, বরং এই অবস্থাকে আন্ডার এমপ্লয়মেন্ট বলা যেতে পারে। আমরা যদি বাংলাদেশ থেকে মুদ্রা পাচার সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনতে চাই, তাহলে বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যকে আরো বেশি লাভজনক করতে হবে। ব্যবসার ক্ষেত্রে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে।
শুধু মুখের কথা বললে চলবে না, বাস্তবে বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত ও লাভজনক করতে হবে। ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ উন্নত ও অধিকতর লাভজনক করতে না পারলে কোনোভাবেই মুদ্রা পাচার ও মানি লন্ডারিং সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনা যাবে না। উদ্বৃত্ত পুঁজির ধর্মই হলো কই মাছের মতো ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় ধাবিত হওয়া। কাজেই আমরা যদি মুদ্রা পাচার সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনতে চাই, তাহলে প্রথমেই দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যকে উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর মতো মুনাফাবান্ধব করতে হবে।
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল ম্যানেজার, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড ও অর্থনীতিবিষয়ক লেখক