দেশে চোখে ছানি পড়া রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। তবে এ বিষয়ে মানুষের মাঝে সচেতনতা নেই বলে মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। তারা বলেছেন, ছানি একটি নিরাময়যোগ্য অন্ধত্ব। দেশে পাঁচ লাখের বেশি ছানি রোগী রয়েছে এবং দেশ থেকে ছানি অন্ধত্ব প্রতিরোধে ব্যাপক সচেতনতার ওপর গুরুত্ব দিকে হবে।
বুধবার (২৯ জুন) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) ডা. মিল্টন হলে 'ছানি সচেতনতার জুন মাস' উপলক্ষে বাংলাদেশ সোসাইটি অব ক্যাটারাক্ট অ্যান্ড রিফ্লাকটিভ সার্জনস (বিএসসিআরএস) আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিশেষজ্ঞরা এসব তথ্য জানান।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সাবেক সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। তিনি বলেন, মানুষের মধ্যে ছানি পড়া নিয়ে সচেতনতার ঘাটতি রয়েছে। দিনদিন তাদের চোখের জটিলতা বাড়লেও হাসপাতালে রোগীরা কম আসে। বেশ কিছু এনজিও তাদের নিয়ে কাজ করছে। এমনকি এনজিওগুলো নিজ খরচে বাসা থেকে রোগীদের নিয়ে আসছে, এমনকি সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে চিকিৎসা করে দিচ্ছে। কিন্তু সরকারি হাসপাতালগুলোতে কিন্তু চিকিৎসা, পরীক্ষা, ওষুধসহ সব ফ্রি, কিন্তু রোগীরা আসছে না।
আসাদুজ্জামান নূর বলেন, আমাদের কায়িক শ্রম কমে গেছে। আগে মানুষ প্রচুর পরিশ্রম করতো। রোগবালাই বেশি হচ্ছে। অনেকেই জানেন না তারা বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত। অনেকের ডায়বেটিস ১৮ থাকলেও তারা মিষ্টি খাচ্ছে, কোমলপানীয় খাচ্ছে। কারণ, সে জানেও না যে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত।
সাবেক এই মন্ত্রী বলেন, সুস্থ থাকতে হলে নিয়মিত স্বাস্থ্য-পরীক্ষা জরুরি। তাহলেই যার যেই রোগ সেটি ধরা পড়ে। চিকিৎসার মাধ্যমে আবার সুস্থও হয়ে যায়। কিন্তু তারা চিকিৎসকের কাছে এমন একটা সময়ে আসে, যখন অনেকক্ষেত্রেই কিছু করার থাকে না।
তিনি আরও বলেন, আমরা যেভাবে টেলিভিশন, মোবাইল, কম্পিউটার দেখি, এতে করে আমাদের চোখের খুবই ক্ষতি হয়। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে এই ব্যাপারটি বেশি লক্ষ্য করা যায়। তারা বইয়ের চেয়ে মোবাইল ফোন দেখতে পছন্দ করে। এভাবে চলতে থাকলে তো শুধু চোখে না, শারীরিকভাবেও তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তিনি বলেন, আমাদের শিক্ষিত লোকের মধ্যেও সচেতনতার অভাব আছে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিএসএমএমইউ’র ভিসি, চক্ষু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ বলেন, চোখের ছানি নিয়ে রোগীদের মধ্যে সচেতনতার অভাব রয়েছে। অনেক রোগীর ছানি সার্জারির প্রয়োজন হলেও রোগীরা তা করতে চাচ্ছেন না। তাদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। অপারেশন ভীতি দূর করতে হবে।
তিনি বলেন, চিকিৎসাসহ স্বাস্থ্য জনবল ও দক্ষ জনবল খুবই কম। এ সংকট কমাতে হবে। চিকিৎসক কোর্সে ছাত্র বাড়াতে হবে। শুধু চক্ষু চিকিৎসক নয়, তাদের সার্জারিও জানতে হবে। ২০৩২ সালের মধ্যে ৩২০০ জন চক্ষু চিকিৎসকের প্রয়োজন পড়বে। এখন আছে মাত্র এক হাজার ৪০০ জন।
চিকিৎসকরা জানান, দেশ ও বিশ্বব্যাপী অন্ধত্বের একটি প্রধান কারণ ছানি। তাই ছানি সম্পর্কে জানা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। তারা বলেন, ক্যামেরাতে যেমন লেন্স লাগে, তেমনি চোখের ভিতরেও একটি স্বচ্ছ লেন্স থাকে। যদি কোনো কারণে এই স্বচ্ছ লেন্সটি অস্বচ্ছ হয়ে যায়, তখন তাকে ছানি বলে। চিকিৎসকের ভাষায় একে বলে ক্যাটার্যাক্ট।
অনেকগুলো কারণে চোখে ছানি পড়তে পারে। যেমন- বার্ধক্যজনিত, জন্মগত কোন ত্রুটি থাকলে, চোখে আঘাত পেলে, চোখে কোন প্রদাহ হলে, ডায়বেটিস এবং দীর্ঘ সময় স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ সেবন করলে ছানি পড়তে পারে। তবে সবচেয়ে বেশি ছানি হয় বার্ধক্যজনিত কারণে। ছানি রোগের অনেকগুলো লক্ষণ থাকে। এরমধ্যে অন্যতম লক্ষণ হচ্ছে- কোন বস্তুকে ঝাপসা দেখা, দূরে ধীরে ধীরে কম দেখা, কোন কোন ক্ষেত্রে উজ্জ্বল আলোতে কম দেখা এবং নিকটে তুলনামূলকভাবে ভালো দেখা। চিকিৎসকরা জানান, ছানি রোগের চিকিৎসা ওষুধ কিংবা চশমা দিয়ে হয় না। ছানির একমাত্র চিকিৎসা অপারেশন।
বিএসসিআরএস বাংলাদেশের ছানি ও রিফ্রাকটিভ সার্জনদের প্রতিনিধিত্বকারী একটি শীর্ষস্থায়ীয় সংগঠন। সংগঠনটির প্রাথমিক কাজ হলো ছানি সম্পর্কে জনসেচতনতা তৈরি করা এবং বাংলাদেশে ছানি ও রিফ্রাকটিভ অপারেশনের বিষয়ে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক অগ্রগতির প্রচার ও প্রচারণায় সহযোগিতা করা।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিএসসিআরএস সভাপতি অধ্যাপক ডা. জাফর খালেদ, মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিএসসিআরএসের মহাসচিব অধ্যাপক ডা. মো. মোস্তাক আহমেদ। ক্যাটারাক্ট সার্জন অধ্যাপক ডা. এম ইসলামের সঞ্চালনায় রোগী ও সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন ক্যাটারাক্ট বিশেষজ্ঞ ডা. মাহবুবুর রহমান চৌধুরী, ডা. আব্দুর রকিব তুষার ও ডা. মো. শওকত কবির।