অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডারস সংক্ষেপে অটিজম নামে পরিচিত। একে স্নায়ুর বিকাশজনিত একটি সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সাধারণত শিশুর তিন বছরের মধ্যেই অটিজমের লক্ষণগুলো প্রকাশিত হয়, যা ব্যক্তির সামাজিক যোগাযোগ ও ভাষাগত দক্ষতার বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে।
এখন পর্যন্ত অনাবিষ্কৃত থাকা অটিজমের কারণ যা-ই হোক না কেন, এতে মেয়েদের তুলনায় ছেলেদের আক্রান্তের হার চার গুণ বেশি হয়ে থাকে। ইমাম মাহির আবরার খান নির্ণয় তেমনই ভাষাগত যোগাযোগ স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত এক অটিস্টিক শিশু। নির্ণয়ের জন্মগত জটিলতার কারণে মস্তিষ্কে অক্সিজেনের সমস্যা দেখা দিয়েছিল, যা সামলে ওঠার পর শুরু হয় নতুন যুদ্ধ। সাড়ে তিন বছর বয়সে তার অটিজম শনাক্ত হয়। নির্ণয়ের মা নিলুফার ইয়াসমিনের যুদ্ধটাও যেন তখন থেকে শুরু হয়। সাধারণ স্কুলের গণ্ডি তাই আর পেরোনো হয়নি নির্ণয়ের। তার শিখন প্রতিবন্ধকতার কারণে তাকে ২০১৬ সালে ভর্তি করানো হয় রমনা বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক বিদ্যালয়ে। ১৯৭৭ সালে সুইড বাংলাদেশের সহযোগিতায় নিউরো ডেভেলপমেন্টাল ডিজঅ্যাবিলিটি জগতে প্রতিষ্ঠিত সুপ্রাচীন এই বিদ্যালয়টি বর্তমানে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হচ্ছে।
নির্ণয়ের শুরুটা সহজ ছিল না। সমবয়সিদের থেকে পিছিয়ে পড়া নির্ণয়কে মা-বাবা কিছুদিন মাদ্রাসায়ও পড়িয়েছিলেন। কিন্তু দিন দিন তার আচরণগত সমস্যা বৃদ্ধি পেলে তার দিকে সহযোগিতার হাত প্রসারিত করেন স্কুলের বর্তমান প্রধান শিক্ষিকা মোসাম্মত্ তাহমিনা পারভীন। এবার যেন যুদ্ধের কৌশল কিছুটা পরিবর্তন করতে হয়। নির্ণয়ের ভালোলাগার বিষয়গুলোকে বেশি করে প্রাধান্য দেওয়া শুরু হয়। ছবি আঁকা, গান, নাচ এসব বিষয়ে আগ্রহ বেশি ছিল বলে তাকে এ বিষয়গুলোতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। পাশাপাশি নির্ণয় শৃঙ্খলা পছন্দ করে বলে তাকে স্কাউট ও টেবিল টেনিস খেলাতেও প্রশিক্ষণ দেওয়া হতে থাকে। যার ফলে নির্ণয় ২০২১ সালে প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক বড়দিন ও ইংরেজি নববর্ষ উদযাপনের জন্য আয়োজিত কার্ডের নকশা অঙ্কন প্রতিযোগিতায় অর্জন করেছে ১ লাখ টাকার পুরস্কার। নির্ণয়ের যাত্রা এখানেই থেমে থাকেনি। এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে অনুষ্ঠিত স্পেশাল অলিম্পিকসে সে বাংলাদেশের অ্যাথলেটদের নেতৃত্ব দিচ্ছে আর টেবিল টেনিস খেলায় হয়েছে পদকজয়ী।
নির্ণয়ের এসব ব্যক্তিগত অর্জন ও প্রাপ্তি শুধু তার একার নয়, নির্ণয়ের মতো সব স্নায়ুবিকাশজনিত শিশুর, যাদের অনেকের সুপ্ত প্রতিভা আছে কিন্তু প্রতিভাকে বিকশিত করার ক্ষেত্রটা এখনো প্রশমিত হয়নি। নির্ণয় এখনো তার স্কুলে স্পেশাল এডুকেশন শ্রেণিতে পড়ছে। পাশাপাশি সে সুইড বাংলাদেশ থেকে ভোকেশনাল ট্রেনিং নিয়ে একই প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা করছে। অটিজম কোনো প্রতিবন্ধিতা নয়, তবে সাধারণ জীবন যাপনে তৈরি করে প্রতিবন্ধকতা। অটিজমের জগতে একজন শিশু যে নিষ্পাপ হয়ে জন্মগ্রহণ করে, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সেই নিষ্পাপ চরিত্রটি একইভাবে বজায় থাকে। সত্যিই তারা দেবশিশু। নির্ণয়ের জীবনকে পত্রিকায় উপস্থাপন করার সাহস করছি, কারণ নির্ণয়কে তার পরিবার জনসম্মুখে এনেছে, সবার সঙ্গে মিশতে দিয়েছে। একজন অটিস্টিক শিশুর জীবন তাই হওয়া উচিত। সমাজ যত ওদের ভালোবাসবে, তত বেশি সমাজ বিশুদ্ধ হবে। আর সবকিছুর মতো বিশুদ্ধ সমাজেরও আজ ভীষণ প্রয়োজন। তাই শেষ করতে চাই এ কথা বলে—বিন্দু বিন্দু কণা, জোড়া দিলেই ফলবে সোনা। সুন্দর থাকুক সব অটিস্টিক শিশু। শুভ হোক তাদের ভাষিক যোগাযোগ স্বাস্হ্য।
লেখক :সহকারী অধ্যাপক (সমাজকর্ম), বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ও পিএইচডি গবেষক, যোগাযোগ বৈকল্য বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়