শি-র নতুন করে হংকং সাজানোর পরিকল্পনা কতটা বাস্তবতার মুখ দেখবে?

১ জুলাই পালিত হলো হংকংয়ের চীনা শাসনে ফিরে আসার ২৫তম বার্ষিকী। দিনটি উদ্যাপন উপলক্ষ্যে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্হা গ্রহণ করা হয়। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের আগমনকে স্বাগত জানিয়ে হংকং সাজে রঙিন সাজে। রাস্তার দুই পাশে উড়তে দেখা যায় চীনা পতাকা। উত্সব উদ্যাপনে লাল ব্যানার উড়তে দেখা যায় হংকংয়ের উচ্চ গতির রেল টার্মিনালের অভ্যন্তরে। ঝাঁকালো ভিড়ে শামিল হয় স্কুলের বাচ্চারাও। রাস্তা-বন্দর-টার্মিনাল সবখানে বেজে ওঠে স্লোগান।

করোনা মহামারি শুরু হওয়ার পর থেকে চীনের মূল ভূখণ্ডের বাইরে শি জিনপিংয়ের এটি ছিল প্রথম সফর। এমন একটি মুহূর্তে হংকংয়ের এই চিত্র চীন ও হংকং উভয়ের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এবং বিশেষ করে শির নিজের জন্যও।

‘এক দেশ, দুই নীতি’ নামে পরিচিত এক সময়কার ব্রিটিশ উপনিবেশ হংকং বেইজিংয়ের নির্দিষ্ট করে দেওয়া ৫০ বছরের ‘উচ্চ মাত্রার স্বায়ত্তশাসনের’ মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই প্রক্রিয়ার পচিশতম বার্ষিকীতে পা রাখল দেশটি। এদিন শপথ নেন নবনিযুক্ত নেতা—কট্টরপম্হি প্রাক্তন পুলিশ অফিসার জন লিক। সবদিক দিক দিয়ে দিনটি অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ। কেননা, শি তার ক্ষমতার প্রথম দশক শেষ করা থেকে মাত্র কয়েক মাস দূরে রয়েছেন। আবারও তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির দায়িত্বে আসবেন বলে ব্যাপকভাবে আশা করা হচ্ছে।

শির দুই দিনের হংকং সফর মূলত তার রাজনৈতিক বিজয়ের একটি সময়োপযোগী ঘোষণা। ২০১৯ সালের সরকার বিরোধী বিক্ষোভের পর হংকংকে একটি সুস্পষ্ট জাতীয় নিরাপত্তা আইনের সঙ্গে গেঁথে দিয়েছেন তিনি। সমালোচকদের দাবি, এ দুই বছরে আইনটি শহরের বিরোধী আন্দোলনকে চূর্ণ করতে, এর নির্বাচনি ব্যবস্হাকে সংশোধন করতে, এর স্পষ্টভাষী মিডিয়াকে নীরব করতে এবং তার এক সময়কার প্রাণবন্ত নাগরিক সমাজকে পঙ্গু করতে ব্যবহার করা হয়েছে। তবে, হংকং সরকার বারবার সমালোচকদের দাবিকে অস্বীকার করেছে। সরকার বলছে, আইনটি হংকংয়ের বিশৃঙ্খলার অবসান ঘটিয়েছে এবং শহরে স্হিতিশীলতা ফিরিয়ে এনেছে।

স্হিতিশীলতার চাদরে আচ্ছন্ন কর্তৃত্ববাদী নেতার জন্য হংকং এখন আগের চেয়ে বহু গুণ শান্ত। হংকংকে শি তার নিজের বাড়ির মতো অনুভব করতে পারেন। পূর্ববর্তী সফরে শহরে তিনি যেসব চিত্র দেখেছেন এবার তা নিয়ে তাকে চিন্তা করতে হচ্ছে না। কেননা তাকে কোনো ভিন্নমতের প্রকাশ্য অভিব্যক্তি নিয়ে ভাববার দরকার পড়ছে না। স্হানীয় সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় সমালোচনামূলক শিরোনাম কিংবা বিলবোর্ডে প্রতিবাদী স্লোগান বা রাস্তায় গণসমাবেশের চিত্র দেখতে হচ্ছে না। এসবের পরিবর্তে তিনি ভারী নিরাপত্তার চাদরে ঘেরা ‘দেশপ্রেমিক’ কর্মকর্তা কিংবা অনুগত শিল্পপতি-ব্যবসায়ী মহলকেই লক্ষ্য করবেন। যদিও শহরের ক্রমবর্ধমান কোভিড-১৯ সংক্রমণের কারণে তাকে ‘ক্লোজড লুপ’ সিস্টেমের আওতায় জনসাধারণ থেকে আলাদা থাকতে হবে।

বেইজিং সমর্থকরা বলছেন, শির হাত ধরে হংকংয়ে একটি ‘স্হিতিশীলতা, সমৃদ্ধি এবং সুযোগের নতুন যুগ’ সূচিত হয়েছে। বার্ষিকী উপলক্ষ্যে হংকং শহর কর্তৃপক্ষ এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘এটি গোটা জাতি এবং হংকংয়ের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।’ তাদের মতে, ‘এটি শুধু গত আড়াই দশকে হংকংয়ের চিত্তাকর্ষক কৃতিত্বকেই ধারণ করে না, বরং একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য আমাদের একান্ত প্রত্যাশা এবং আত্মবিশ্বাসকেও তুলে ধরে।’

তবে সমালোচকদের আশঙ্কা, হংকংকে ঘিরে ক্রমবর্ধমানভাবে চীনের ভাবমূর্তির পরিবর্তন ঘটছে। কারো কারো মতে, ‘এক দেশ, দুই নীতি’র পরীক্ষামূলক ব্যবস্হা ইতিমধ্যেই গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে, যদিও নির্ধারিত সময়সীমার এখনো ২৫ বছর বাকি। এটা সবার জানা যে, প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা দেং জিয়াওপিংয়ের প্রস্তাবিত ‘এক দেশ, দুই নীতি’ হলো এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্হা যা মূলত চীনকে তাইওয়ানের সঙ্গে একীভূত করতে সাহাঘ্য করার উদ্দেশ্যে পুঁজিবাদী অর্থনীতির একটি স্ব-শাসিত গণতন্ত্র। তবে এটি প্রথমে হংকংয়ে প্রয়োগ করা হয়েছিল এই আশায় যে, এটি থেকে আশানুরূপ ফল পাওয়া গেলে তা তাইওয়ানের ওপর প্রয়োগ করা হবে। অর্থাত্ এই নীতি অনুসরণ করার জন্য হংকং একটি পছন্দসই দৃষ্টান্ত স্হাপন করবে। যদিও বাস্তবে আশানুরূপ ফল পাওয়া যায়নি, বরং ঘটেছে উলটোটা।

হংকংকে চীনের কাছে হস্তান্তরের জন্য ১৯৮৪ সালে চীন-ব্রিটিশ যৌথ ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষরের সময় দেং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে, ‘চীন সর্বদা তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে’। দেং থ্যাচারকে বলেছিলেন, ‘আমরা ৫০ বছরের সময়সীমা বেঁধে দিচ্ছি আকস্মিকভাবে বা কারো প্ররোচনায় নয়, বরং চীনের বাস্তবতা এবং উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তার বিবেচনায়।’

এবারের সফরে পশ্চিম কাউলুন স্টেশনে শি ‘এক দেশ, দুই ব্যবস্হা’কে ‘উত্কৃষ্ট ব্যবস্হা’ বলে অভিহিত করে বলেছেন, ‘তথ্য-উপাত্ত প্রমাণ করেছে যে ‘এক দেশ, দুই নীতি’র শক্তিশালী জীবনীশক্তি রয়েছে। এটি হংকংয়ের দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধি এবং স্হিতিশীলতা নিশ্চিত করার ক্ষমতা রাখে এবং হংকংয়ের জনগণের কল্যাণ বয়ে আনতে পারে।’ শির মতে, ‘গত কয়েক বছর ধরে, হংকং একের পর এক কঠিন পরীক্ষা সহ্য করেছে এবং একের পর এক ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে উঠেছে। ঝড়ের মোকাবিলা করার পর হংকং প্রবল প্রাণশক্তি নিয়ে সংকট থেকে বেরিয়ে এসেছে।’

তবে হংকংয়ের শেষ ব্রিটিশ গভর্নর ক্রিস প্যাটেনসহ বহু সমালোচক শির দাবিকে মানছেন না। তারা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেইজিং প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘন করেছে। তারা অভিযোগ তুলছেন, হংকংয়ের ওপর বেইজিং দখল শক্তপোক্ত করেছে। তাদের ভাষায়, ‘১৯৯৭ সালের পর ১০ বছরের মতো পরিস্হিতি ঠিকঠাকই চলছিল। কিন্তু তারপর থেকে হংকং নিচের দিকে চলে গেছে। এর আংশিক কারণ শি জিনপিং এবং তার সহকর্মীরা।’ এক সংবাদ সম্মেলনে প্যাটেন বলেন, হংকংয়ের অবস্হা আসলে কী কোন পর্যায়ে দাঁড়ায় তা নিয়ে তারা আতঙ্কিত।

ক্ষমতায় আসার পর থেকে শি সাংবিধানিক গণতন্ত্র, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং সর্বজনীন মানবাধিকারের মতো ‘পশ্চিমা মূল্যবোধের’ বিরুদ্ধে একটি আদর্শিক যুদ্ধ চালিয়ে আসছেন। এই ধারণাগুলো দীর্ঘদিন ধরে হংকংয়ে লালিত হয়ে আসছে এবং এখন এটি জনগণের মনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। তাদের ধারণা, হংকংয়ের পূর্ণ গণতন্ত্রের অন্বেষণ তর্থাত্ শেষ পর্যন্ত সর্বজনীন ভোটাধিকারের মাধ্যমে তার নেতা নির্বাচন করাকে (যা হংকংয়ের মিনি-সংবিধান ও মৌলিক আইনে লেখা আছে) বেইজিং সন্দেহের চোখে দেখে।

২০১৪ সালে হাজার হাজার তরুণ বিক্ষোভকারী ‘সত্যিকারের সর্বজনীন ভোটাধিকার’-এর দাবিতে শহরের কেন্দ্রের মূল রাস্তা দখল করে। ‘আমব্রেলা মুভমেন্ট’ নামে পরিচিত শান্িতপূর্ণ বিক্ষোভ চলে ৭৯ দিন। শেষ পর্যন্ত হংকংবাসীর কোনো দাবি পূরণ হয়নি। মূলত তারপর থেকেই বেইজিং হংকংয়ের ওপর অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে চেয়েছে। ২০১৭ সালে চীনের নেতা হিসাবে হংকংয়ে প্রথম সফরের সময় শি সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে, কেন্দ্রীয় সরকারের ‘ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ’ করার যে কোনো প্রচেষ্টা ‘সম্পূর্ণরূপে অননুমোদিত’। হংকংয়ের ২০তম হস্তান্তর বার্ষিকীতে একটি বক্তৃতায় শি বলেছিলেন, ‘চীনের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তাকে বিপন্ন করার যে কোনো প্রচেষ্টা...অথবা চীনের মূল ভূখণ্ডের বিরুদ্ধে অনুপ্রবেশ ও নাশকতামূলক কার্যকলাপ চালানোর কাজ লাল রেখা অতিক্রম করার শামিল।’

কিন্তু বেইজিংয়ের এইরূপ দৃঢ়তা শুধু শহরে অসন্েতাষকেই তীব্র করেছে। বিশেষ করে তা তরুণ প্রজন্মের মধ্যে। তাদের কেউ কেউ হংকংয়ের আইনসভায় যোগ দিয়ে পরিস্হিতি পরিবর্তনের জন্য চাপ দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান চাপে তারা ব্যর্থ হয়। গণতন্ত্রপম্হি অনেক আইনপ্রণেতাকে শপথ গ্রহণের বিতর্কের জন্য অযোগ্য ঘোষণা করা হয়, অন্য প্রার্থীদের অফিসে দাঁড়াতে বাধা দেওয়া হয়। পরিস্হিতি উষ্ণ হতে থাকে। এমনকি করোনার মধ্যেও তা থেমে ছিল না। কর্মী এবং রাজনীতিবিদসহ শহরের প্রায় সকল গণতন্ত্রপম্হি ব্যক্তিত্বদের হয় জেলে পাঠানো হয়েছে বা নির্বাসনে বাধ্য করা হয়েছে। শহরের সবচেয়ে স্পষ্টভাষী সংবাদপত্র ‘অ্যাপল ডেইলি’ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ১৯৮৯ সালের তিয়ানানমেন স্কয়ারের গণহত্যার স্মৃতি তথা মূর্তি থেকে শুরু করে বার্ষিক স্মরণসভা পর্যন্ত পাবলিক স্পেস থেকে মুছে ফেলা হচ্ছে। হাজার হাজার নাগরিক যুক্তরাজ্য, কানাডা এবং অস্ট্রেলিয়ার মতো গণতান্ত্রিক দেশে চলে যাচ্ছেন।

এমন সব পরিবেশ-পরিস্হিতির মধ্যেই শি হংকংকে নতুন রূপ দিতে মনোনিবেশ করেছেন। শির হংকংকে নিয়ে এ ধরনের ‘রূপান্তর চিন্তার’ পিছনে রয়েছে একটি উদ্দেশ্য—চীনের নিজস্ব চিত্রানুযায়ী হংকংকে নতুন রূপ দেওয়া এবং মাতৃভূমির সঙ্গে আরো গভীরভাবে সংযুক্ত করা। যাহোক, মহামারির কারণে হংকং এবং চীনের মূল ভূখণ্ডের মধ্যে কঠোর বিধিনিষেধ-নিয়ন্ত্রণ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। বিশ্বের প্রতিটি দেশের মতো চীন এবং হংকংও করোনাসহ নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এসবের মধ্যে শির হংকংকে নতুন করে সাজানোর পরিকল্পনা কতটুকু বাস্তবতার মুখ দেখে—সেটাই বড় প্রশ্ন।

ভাষান্তর:সুমৃত্ খান সুজন