বিশ্বপ্রবাহ ডেস্ক
২০১৬ সালের কথা। মধ্যপ্রদেশের ছোট শহর দাত্য। সেখানকার একটি কলেজ থেকে গণিতে স্নাতক সম্পন্ন করেন সোনিয়া গুপ্ত। এরপর মাসের পর মাস কেটে গেছে তার পক্ষে একটি সরকারি চাকরি জোটানো সম্ভব হয়নি। তিনি এ বছর জানুয়ারিতে নিজ শহর ছেড়ে ৪৫ মাইল দূরে গোয়ালিয়র জেলায় গিয়ে থাকতে শুরু করেছেন। এটি তুলনামূলকভাবে একটি বড় শহর। সরকারি চাকরিতে ঢুকতে প্রাথমিকভাবে যেসব পরীক্ষা দিতে হয় এ শহরে সেগুলোর অনেক কোচিং সেন্টার রয়েছে। এরকম একটি কোচিং সেন্টারে তিনি ভর্তি হয়ে নিয়মিত ক্লাস করছেন। দিনরাতের একটা বড় অংশই কেটে যাচ্ছে কোচিংয়ের পেছনে। জমানো অর্থও পরীক্ষার প্রস্তুতির কাজে ব্যয় হচ্ছে।
গোয়ালিয়র শহরে কোচিং ব্যবসার ব্যাপক পসার ঘটেছে। ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত উন্নয়ন পর্যন্ত নানা বিষয়ে কোচিং সেন্টারগুলোতে পড়ানো হয়। পুরো ভারত জুড়ে প্রাইভেট কোচিংয়ের বিস্তার ঘটেছে তাকে একটি শিল্পখাত হিসেবেই গণ্য করা যায়। যে খাতের বার্ষিক টার্ন ওভারের পরিমাণ ৪৫ বিলিয়ন ডলার। থাকা খাওয়া, যাতায়াত ও লেখাপড়ার খরচ বাবদ পরিবার থেকে সোনিয়াকে প্রতি মাসে ২শ’ ডলার পাঠান হয়ে থাকে। খরচের পরিমাণও প্রতি মাসে অবশ্য একই রকম নয়।
ভারতে শিল্পের প্রবৃদ্ধি যে হারে ঘটেছে, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি সে হারে হয়নি। ফলে বাড়ছে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা। চাকরি যেন এক সোনার হরিণ। লেখাপড়া শেষ করে চাকরি জোটানো একজন তরুণ তরুণীর পক্ষে যুদ্ধ জয় করে আসার মতোই। ১৩০ কোটি জন অধ্যুষিত দেশটির অর্ধেক জনগোষ্ঠীর বয়স ২৭ বছরের নিচে। বিশ্বব্যাংক আভাষ দিয়েছে চলতি বছর ভারতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৭.৩ শতাংশ বজায় থাকবে। একই সঙ্গে থাকবে বেকারত্বের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা। বেকার সমস্যাকে সহনীয় পর্যায় আনতে বছরে অন্তত ৮০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান প্রয়োজন। জানুয়ারিতে ফাঁস হওয়া একটি সরকারি প্রতিবেদনে দেখা গেছে গত বছর (২০১৮) বেকারত্বের হার ছিল ৬.১ শতাংশ যা বিগত ৪৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। গত বছর এক কোটি ১০ লাখ মানুষ কর্মহীন হয়েছেন। রিপোর্টটি জনসমক্ষে প্রকাশ না করার প্রতিবাদে দুইজন শীর্ষ পরিসংখ্যান কমিশনার পদত্যাগ করেছেন।
শিক্ষিত তরুণ এবং শহরে বসবাসকারীদের মধ্যে বেকারত্বের হার তুলনামূলকভাবে বেশি। শহরে বসবাসকারী তরুণ জনগোষ্ঠী যাদের বয়স ২০ থেকে ২৪ বছরের মধ্যে তারা মোট জনসংখ্যার ১৩.৫ শতাংশ। এদের মধ্যে ৬০ শতাংশ কর্মহীন। সরকারি চাকরি তরুণদের প্রধান অগ্রাধিকার। কিন্তু এটি সবার ভাগ্যে জোটে না। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, মুম্বাই পুলিশ বিভাগ একবার কনস্টেবল নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছিল। সেখানে পদের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ১৩৭, ন্যূনতম যোগ্যতা চাওয়া হয়েছিল মেট্রিক পাস। ওই পদের জন্য ২ লাখের ওপর আবেদনপত্র জমা পড়েছিল। আবেদনকারীদের মধ্যে অনেক উচ্চ শিক্ষিতও ছিলেন।
ব্যাঙ্গালুরুর আজিম প্রেমজি ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির সহযোগী অধ্যাপক অমিত বাসোল মনে করেন, অনেক ভারতীয়ই এখন উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করে আরো ভালো কর্মসংস্থানের জন্য বিভিন্ন প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। এ কারণে তার স্বেচ্ছায় দীর্ঘ সময় পর্যন্ত কর্মহীন থাকছে। এটি বেকারত্বের হার ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার অন্যতম কারণ। কর্মসংস্থান নিয়ে গবেষণাকারী ভারতীয় প্রতিষ্ঠান অ্যাস্পায়ারিং মাইন্ডসের সমীক্ষায় বলা হয়েছে, ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থা বেকারত্ব বাড়াচ্ছে। প্রতিবছর স্নাতক শেষ করে বের হয়ে আসা শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশই প্রয়োজনীয় দক্ষতার অভাবে প্রতিযোগিতামূলক কাজের বাজারে (পরিষ্কার করে বললে নলেজ ইকোনমিতে) প্রবেশ করতে পারে না। অ্যাস্পায়ারিং মাইন্ডসের সমীক্ষা অনুযায়ী ভারতের বিজনেস স্কুল থেকে পাস করা স্নাতকদের মাত্র ৭ শতাংশ চাকরি পাওয়ার যোগ্য। এশিয়া উন্নয়ন ব্যাংকের ২০১৬ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের মাত্র ১০-২০ শতাংশ চাকরিদাতা মনে করেন কারিগরি ও টেকনিক্যাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে পাস করে বেরোনোদের চাকরি দেওয়া যেতে পারে।
ফিরে আসা যাক সোনিয়া গুপ্তের কথায়। তিনি বলেন, কোনো রাজনৈতিক দলই তরুণদের সমস্যার কথা গুরুত্বের সঙ্গে চিন্তা করে না। বেকারত্ব একটি বিশাল ইস্যু। মোদি প্রতি বছর ১ কোটি কর্মসংস্থানের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তা এবার রক্ষা করতে পারবেন কিনা সেটা দেখার অপেক্ষায় আছে তরুণরা।