শফিকুর রহমান রয়েল
সুনির্দিষ্ট তারিখ নেই; দিবসটিও প্রতীকী। যুক্তরাষ্ট্রের নারীরা প্রতিবছর এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহের কোনো একটি দিনকে উত্সর্গ করে মজুরিসংক্রান্ত লিঙ্গ বৈষম্য দূর করার বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে। অদূর ভবিষ্যতে সম্ভব নয় জেনেও প্রতীকীভাবে এদিন উপস্থাপন করা হয়। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের পুরুষরা যে পরিমাণ আয় করেছে, ঠিক সেই পরিমাণ আয় করার জন্য নারীদের আরো কত বেশি পরিশ্রম করতে হবে? নারীরা ওই দিনটিকে পালন করে ইকুয়্যাল পে-ডে হিসেবে। ফুল টাইম চাকরিতে নিযুক্ত মার্কিন নারীরা তাদের পুরুষ সতীর্থদের তুলনায় গড়ে প্রায় ২০ শতাংশ কম আয় করে। অর্থাত্ পুরুষদের ১০০ ডলারের বিপরীতে তাদের ভাগ্যে জুটে ৮০ ডলার। আফ্রিকান আমেরিকান ও হিস্পানিক নারীদের মধ্যে এই লিঙ্গগত মজুরি বৈষম্য সবচেয়ে বেশি। শেতাঙ্গ নন-হিস্পানিক পুরুষদের বিপরীতে তাদের আয় যথাক্রমে ৬১ ও ৫৩ শতাংশ। সার্বিকভাবে যদিও এই ব্যবধান কমে আসছে; কিন্তু তার গতি খুবই ধীর প্রকৃতির। বর্তমান হার অব্যাহত থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের নারীরা চলতি শতাব্দীতে মজুরির সম-অধিকারের স্বাদতো নিতেই পারবে না; উপরন্তু কখনোই নিতে পারবে কি না তা নিয়েও যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। যদি কখনো পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরিও হয় তবে পাচ্ছি, পাচ্ছি করতে করতেই বাস্তবায়নের সালটা দাঁড়াবে ২১০৬। এজন্য অনেকে একে ‘অসম্ভবকে সম্ভব করার চেষ্টা’ বলে অভিহিত করছে।
সমান শ্রম, ঘাম, মেধা ও বুদ্ধি খাটালেও মজুরির ব্যাপারে লিঙ্গগত বৈষম্য শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই বিদ্যমান নয়, এর উপস্থিতি বিশ্বজুড়ে। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের তথ্যানুসারে, বিশ্বে নরের বিবেচনায় নারীর আয় গড়ে ৬৩ শতাংশ। গবেষণা প্রতিষ্ঠান ম্যাককিনসে গ্লোবাল ইনস্টিটিউটের করা এক জরিপ থেকে উঠে এসেছে, মজুরি বৈষম্যসহ শ্রমশক্তিতে নারী ও পুরুষের মধ্যে কমতে থাকা ব্যবধানের কারণে ২০২৫ সাল নাগাদ বৈশ্বিক বার্ষিক জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে যুক্ত হতে পারে ২৮ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার, যার সুফল ভোগ করতে পারে উন্নত এবং উন্নয়নশীল সব দেশই। উদাহারণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতে যদি পুরুষদের মতো নারীরাও সমান কর্মঘণ্টা কাজ করে সমবেতন পায়, সমান হারে শ্রমশক্তিতে অংশ নেয় এবং সকল খাতের সর্বস্তরে নিযুক্ত হয়— তাহলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ঘটাতে পারে যথাক্রমে ৪.৩, ৪.২ ও ২.৯ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। কোম্পানিগুলোও এর সুফল ভোগ করতে পারে। ব্যাপকভাবে গচ্চা দেওয়া করপোরেট নেতৃত্বের অবস্থানে নারীর অধিকতর প্রতিনিধিত্ব প্রতিষ্ঠানের নৈপুণ্যের উন্নতি ঘটাতে পারে। মজুরি দেয়া বা নেয়ার লিঙ্গগত বৈষম্য একেবারেই নির্মূল করতে চাইলে সবার আগে এর কারণগুলো বোঝাটা খুবই জরুরি।
কেন এই বিদ্যমান মজুরি ব্যবধান?: কর্মস্থলে হ্রাসমান লিঙ্গ বৈষম্য যে প্রবৃদ্ধির সহায়ক, তার প্রমাণ আছে অসংখ্য। স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, কী কী ব্যাখ্যা করে এই বৈষম্যকে? পুরোদস্তুর বৈষম্য মানে পুরুষের সমান কাজ করা সত্ত্বেও শুধু তার লিঙ্গের ভিত্তিতে একজন নারীকে কম পারিশ্রমিক দেওয়া। যারা এ কাজটি করে তারা নিশ্চয়ই এর পেছনে কোনো না কোনো যুক্তি দেখান। বিশ্বের ৪০ শতাংশ দেশে নারী ও পুরুষ অর্থাত্ লিঙ্গভেদে মজুরির তারতম্য নিষিদ্ধ; কিন্তু তা কেবল কাগজে-কলমেই। বাস্তব চিত্র পুরোপুরি ভিন্ন। লিঙ্গ বৈচিত্র্য সত্যিই লাভজনক কি না, তা খতিয়ে দেখার জন্য এখন পর্যন্ত বহু গবেষণা সম্পন্ন হয়েছে এবং সেগুলো থেকে উঠে এসেছে বিভিন্ন রকম তথ্য। পিটারসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ইকোনোমিকস-এর হয়ে মার্কাস নোল্যান্ড (অত্র ইনস্টিটিউটের কার্যকরী সহ-সভাপতি ও ইস্ট-ওয়েস্ট সেন্টারের অনাবাসিক জ্যেষ্ঠ ফেলো), টাইলার মরান (ইনস্টিটিউটের গবেষণা বিশ্লেষক) এবং বারবারা কোসওয়ার (ল্যাটিন আমেরিকা স্টাডিজ এর সহযোগী অধ্যাপক ও ইনস্টিটিউটের সাবেক রিসার্চ ফেলা) ২০১৬ সালে ৯১টি দেশের ২১,৯৮০টি ফার্মের ওপর পরিচালিত এক বৈশ্বিক জরিপের ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখিয়ে দিয়েছেন যে, কর্পোরেট নেতৃত্বের অবস্থানে নারীর উপস্থিতি ফার্মের নৈপুণ্য বাড়িয়ে দিতে পারে।