পদ্মা সেতু বদলে দেবে গোটা অর্থনীতিকে

বিশ্বব্যাংকের সহায়তা ছাড়াই বাংলাদেশ নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করে সমগ্র বিশ্বে বিস্ময় সৃষ্টি করেছে। নিজস্ব অর্থে পদ্মা সেতু নির্মাণের পদক্ষেপ বাংলাদেশের জন্য একটি বড় অর্জন সন্দেহ নেই। যা আগে অবাস্তব, অলীক কল্পনা বলে মনে হতো সেই স্বপ্নের পদ্মা সেতু এখন দৃশ্যমান। বাংলাদেশে সব ষড়যন্ত্রকে উপেক্ষা করে নিজস্ব সামর্থ্যে সক্ষমতায় এগিয়ে যেতে পারে—এটা প্রমাণিত হয়েছে পদ্মা সেতু নিজস্ব অর্থায়নে নির্মাণ উদ্যোগের মাধ্যমে। পদ্মা সেতু চালু হওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে গেছে। পদ্মা সেতু দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার সঙ্গে ঢাকার সংযোগের মাধ্যমে সম্ভাবনার আরেক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছে। এর মাধ্যমে কৃষিজাত পণ্য স্বল্প সময়ে বাজারজাতকরণের মাধ্যমে কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে নতুন প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি হবে। সম্প্রসারিত শিল্পায়নের ফলে স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থানের বিরাট সুযোগ তৈরি হবে। আবাসন ও পর্যটন খাতে তৈরি হবে নতুন কর্মসংস্থান এবং বাণিজ্যিক সম্ভাবনা। এভাবেই দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের জীবনমানের পরিবর্তনের পাশাপাশি সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতি গতিশীল করতে বড় ধরনের ভূমিকা রাখবে পদ্মা সেতু। তিন বিভাগের ২১ জেলার অন্তত ৪ কোটি মানুষ উপকার পাবেন।

৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের পদ্মা সেতু শুধুমাত্র বাংলাদেশের একটি বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্প নয়, রাজনৈতিক দৃঢ়তা, সাহস ও সক্ষমতার প্রতীক। স্বপ্নের পদ্মা সেতুর বাস্তবায়ন গোটা জাতির জন্য অনন্য গর্বের বিষয়। পদ্মা সেতু চালু হওয়ার মাধ্যমে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অবকাঠামোমূলক উন্নয়নের চমৎকার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এর মাধ্যমে অর্থনীতি ও ব্যবসাবাণিজ্যের প্রসার ঘটবে এবং সেখানকার মানুষের জীবনযাত্রার মানে আমূল পরিবর্তন আসবে। বাড়বে কর্মসংস্থানের সুযোগ। বরিশাল, খুলনা, যশোর অঞ্চলে যেসব শিল্পকারখানা রয়েছে এতদিন সেখানকার পণ্যবাহী ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান প্রভৃতি ঢাকা কিংবা চট্টগ্রাম নেওয়ার সময় বিভিন্ন ফেরিঘাটে অনেক সময় দিনের পর দিন আটকে থাকত। যে কারণে সেসব শিল্প প্রতিষ্ঠানের শিপমেন্ট বাতিল করতে হয়েছে। এতে করে তারা লোকসানের মুখে পড়েছেন। পদ্মা সেতুর মাধ্যমে সরাসরি বরিশালের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু হওয়ায় সেই ভোগান্তি, অনিশ্চয়তা, অপ্রত্যাশিত লোকসানের মুখোমুখি হওয়া লাঘব হবে। শিপমেন্ট বাতিলের মতো দুঃখজনক পরিস্থিতিতে পড়তে হবে না। পরিস্থিতি সম্পূর্ণ পালটে যাওয়ায় সেখানকার শিল্পোদ্যোক্তারা এর মধ্যেই তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণে কাজ শুরু করে দিয়েছেন।

সেতু চালু হওয়ার মাধ্যমে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হওয়ায় কৃষক তার খেতের সবজি, মাছ, ফুল, ফলমূল প্রতিদিন ঢাকাসহ আশপাশের মোকামে, আড়তে পাঠাতে পারবেন। ঢাকার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ চালু হওয়ায় মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য কমে যাবে। কৃষক তার উৎপাদিত কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য পাবেন। এতে ব্যক্তিকেন্দ্রিক বিনিয়োগ বাড়বে। একই সঙ্গে বড় শিল্পেও বিনিয়োগ সুযোগ তৈরি হবে। মাছ, হাঁস, মুরগি, ডিম, গরু, ছাগল, ভেড়ার খামারে অনেকেই বিনিয়োগে উত্সাহী হয়ে উঠেছেন এর মধ্যেই। দক্ষিণাঞ্চলের কৃষকরা এতদিন যোগাযোগ ব্যবস্থার সংকটের কারণে তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাননি। বাধ্য হয়ে নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করতে বাধ্য হতেন। এখন সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হওয়ায় উৎপাদিত কৃষিপণ্য দ্রুত অল্প সময়ের মধ্যে ঢাকায় পৌঁছানোর চমৎকার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে সেখানকার কৃষি ব্যবস্থায় আসবে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। ঢাকার সুপার মার্কেটের সঙ্গে সংযুক্তি ঘটলে কৃষক স্বাভাবিকভাবে অধিক মূল্য পাবেন। কৃষকের ভাগ্য উন্নয়নে পদ্মা সেতু দক্ষিণের মানুষের স্বপ্নের দুয়ার খুলে দেবে। পদ্মা সেতু দুই পাড়ের যোগাযোগকে সহজ করার পাশাপাশি কৃষিনির্ভর শিল্প ও পর্যটন খাতের বিকাশে বড় ভূমিকা রাখবে।

ট্র্যান্স-এশিয়ান রেলওয়ে ও হাইওয়েতে কানেক্টিভিটির ক্ষেত্রে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো, নেপাল, ভুটানের জন্য একটি উপ-আঞ্চলিক সংযোগের সুযোগ সৃষ্টি করেছে পদ্মা সেতু। ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ এই পুরো অঞ্চলে একেবারে কেন্দ্রে অবস্থান করছে। বাংলাদেশ অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি নীতির উন্নয়ন ও সহায়ক নীতিগুলো সামনে আনতে পারলে এ অঞ্চলের সামগ্রিক উন্নয়নে কেন্দ্রীয় ভূমিকা নিতে পারে।

পদ্মা সেতু ঢাকা এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে শুধু বদলে দেবে না, বদলে দেবে গোটা অর্থনীতিকে। এই অঞ্চলের ব্যবসাবাণিজ্যের সম্প্রসারণ হবে ঐ সেতুর কারণে। কর্মসংস্থান হবে, মানুষের আয় বাড়বে, দারিদ্র্য বিমোচন হবে। এই সেতুই হয়ে উঠতে পারে দেশের নতুন অর্থনৈতিক করিডর। এই সেতুর মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে একটি বড় পরিবর্তন আসন্ন হয়ে উঠেছে খুব দ্রুতই। এই সেতুর সুবাদে জিডিপি অবদান বাড়লে স্বাভাবিকভাবে তা দারিদ্র্য বিমোচনে সহায়তা করবে। এডিবির প্রতিবেদনে জিডিপির হার বাড়বে শূন্য দশমিক ৮৪ শতাংশ। পদ্মার ওপারে ২১ জেলায় ১৩৩টি উপজেলা রয়েছে। এসব উপজেলার মধ্যে ৫৩টি উচ্চ দারিদ্র্য ঝুঁকিতে রয়েছে। এর মধ্যে ২৯টি বরিশাল বিভাগে। এছাড়া ৪২টি উপজেলা মধ্যম দারিদ্র্য এবং ৩৮টি নিম্ন দারিদ্র্য ঝুঁকিতে আছে। পদ্মা সেতু চালুর পর ব্যবসাবাণিজ্য সম্প্রসারিত হলে ঐ এলাকার মানুষের আয় বেড়ে দারিদ্র্য বিমোচন হবে। দেশে আটটি রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) ও একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল চালু আছে। এর মধ্যে পদ্মার ওপারে শুধু মোংলা ইপিজেড। পদ্মা সেতুকে ঘিরে যশোর ও পটুয়াখালীতে আরো দুটি নতুন ইপিজেড করা হচ্ছে। এতে এ অঞ্চলে রপ্তানিমুখী খাতে নিয়োগ হবে, বাড়বে কর্মসংস্থান। মোংলা, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর ও পায়রা বন্দর এলাকায় চারটি নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল করার পরিকল্পনা রয়েছে। গোপালগঞ্জ ও ফরিদপুরের ভাঙ্গায় দুটি বিসিক শিল্পনগরী হচ্ছে। মাদারীপুরে তাঁতপল্লি নির্মাণের কাজও চলছে। মহাসড়কের আশপাশে বড় বড় শিল্পগোষ্ঠী এর মধ্যেই নতুন কারখানা স্থাপনের উদ্দেশ্যে শরীয়তপুর, মাদারীপুর, মাগুরা, গোপালগঞ্জ, বরিশাল, খুলনা, যশোরসহ বিভিন্ন জেলায় জমি কিনে রেখেছে। পর্যটন খাতেও বড় অবদান রাখবে পদ্মা সেতু। সুন্দরবন, কুয়াকাটাসহ অন্যান্য পর্যটন এলাকায় মানুষের আনাগোনা বেড়ে যাবে সুন্দর যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে। এর মধ্যেই একটি বড় শিল্পগোষ্ঠী খুলনায় পাঁচ তারকা মানের হোটেল নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে। পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় পুরো দক্ষিণাঞ্চলে যোগাযোগ ব্যবস্থা অনেকটাই সহজ হয়ে গেছে। ফেরি পারাপারের ঝামেলা না থাকায় দূরত্ব ঘুচেছে, সময় বাঁচছে। এখন ঢাকা থেকে কুয়াকাটার দূরত্ব কমে হয়েছে মাত্র পাঁচ ছয় ঘণ্টার। এতে শুধু কুয়াকাটা নয়, বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটন নতুন রূপে জেগে উঠতে শুরু করেছে। শুধুমাত্র কুয়াকাটা, সুন্দরবন নয়, শ্বাসমূলীয় বনাঞ্চল বরগুনার তালতলী উপজেলার টেংরাগিরি, শ্বাসমূলীয় বনাঞ্চল বরগুনা বন, সমুদ্রসৈকত বরিশালের দুর্গাসাগর দিঘি, সাতলার শাপলাবিল, ভাসমান পেয়ারা বাজার, ভোলার চরকুকরিমুকরি, মনপুরা হবে পর্যটকদের নতুন গন্তব্য।

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার, সোনালী ব্যাংক লিমিটেড