প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, মুসলিম দেশগুলোতে আত্মঘাতী সংঘাত হচ্ছে। আমরা একে অপরকে খুন করছি। রণক্ষেত্র হচ্ছে সমস্ত মুসলিম দেশগুলো। এতে যারা অস্ত্র তৈরি ও বিক্রি করছে তারাই লাভবান হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, বর্তমান মুসলিম বিশ্বের বেশ কিছু দেশ শান্তি, নিরাপত্তা, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, বাইরের হস্তক্ষেপ, সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদ ও মানবিক বিপর্যয়সহ নানা সমস্যার সম্মুখীন। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ এবং একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণের জন্য আমি সৌদি আরবে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে ওআইসির প্রতি আহ্বান জানিয়েছি।
গতকাল রবিবার বিকালে গণভবনে এক জনাকীর্ণ সাংবাদিক সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। সম্প্রতি জাপান, সৌদি আরব ও ফিনল্যান্ডে ১১ দিন সফরের অর্জন ও সফলতা তুলে ধরতে এই সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। লিখিত বক্তব্যের পর প্রধানমন্ত্রী সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। প্রশ্নোত্তর পর্বে দেশের সর্বশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতি, রোহিঙ্গা ইস্যু, কূটনৈতিক সম্পর্ক, জঙ্গি-সন্ত্রাসী তত্পরতাসহ নানা ইস্যুতে সাংবাদিকদের অসংখ্য প্রশ্নের উত্তর দেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, কে ভালো মুসলিম, কে সঠিক, কে ভালো কাজ করছে, কে করছে না- সেটা বিচার করার দায়িত্ব আল্লাহ আমাদের দেননি। শেষ বিচার তো তিনিই করবেন। তিনি বলেন, একজন লোক নিরীহ মানুষ মেরে কেউ বেহেস্তে চলে যাবে এমন নিয়ম তো আল্লাহ করেননি। মানুষ খুন করার অধিকার কাউকে দেওয়া হয়নি।
জার্মানির একটি বার্তা সংস্থার সাথে সম্প্রতি এক সাক্ষাত্কারে বাংলাদেশের ইংরেজি পত্রিকার একজন সম্পাদক ‘দেশে লেখার স্বাধীনতা নেই’ বলে যে বক্তব্য দিয়েছেন এ প্রসঙ্গে একজন সাংবাদিক প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, একবার এক টেলিভিশনের কোনো একটা টকশোতে ওই সম্পাদক বলেছিলেন, কোনো একটা মিথ্যা নিউজ দেওয়া হয়েছিল বলে তাকে ধরেছিল কেউ। তখন উনি বলেছিলেন, আমি কি করবো, আমাকে ডিজিএফআই যেটা সাপ্লাই দিয়েছিল, আমি সেটাই ছাপিয়ে দিয়েছি, লিখে দিয়েছি। তার মানে দাঁড়াচ্ছেটা কি? আপনি যদি ওই কথার সঙ্গে এই কথাটার লিঙ্ক করেন, তাহলে ডিজিএফআই এখন তাকে কোনো লেখা দিচ্ছে না। কাজেই উনি লিখতে পারছেন না। আমি তো এটাই বুঝব। তিনি বলেন, আমার বিবেক যদি ঠিক থাকে যে, আমি সঠিক আছি, সেটাই হচ্ছে আমার কাছে বড়। কে কি লিখলো সেটা নিয়ে আমার মাথা ব্যথার কিছু নেই। প্রধানমন্ত্রী বলেন, যে সম্পাদক বলেছেন যে তিনি লিখতে পারেন না, যদি তার উপর সত্যি কোনো চাপ থাকতো তাহলে এই কথাটাই বলার সাহস তিনি পেতেন কি না? আমার প্রশ্ন সেখানেই। তিনি বলেন, আমি সবসময় মনে করি, আমার বিবেক যদি ঠিক থাকে যে আমি সঠিক আছি, সঠিক বলছি, সঠিক করছি, সেটাই হচ্ছে আমার কাছে বড়। আমি আমার দেশকে ভালবাসি, দেশের মানুষকে ভালবাসি। আমি যা কাজ করি তা দেশের জনগণের কল্যাণের জন্য করি, এই বিশ্বাসটা যদি আমার থাকে, তাহলে কে কোনটা ভাল বলল, মন্দ বলল, কি করল এটা নিয়ে তো আমার মাথা ব্যথার কিছু নেই। প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন রাখেন- বাংলাদেশ কি এগিয়ে যাচ্ছে না? উন্নয়নের সুফলটা কি সবাই পাচ্ছে না? বাংলাদেশের মর্যাদাটা কি বিশ্বে একটু উন্নত হচ্ছে না? এই যে সারাবিশ্ব আজকে আমাদের প্রশংসা করে, এটা কি সকলের ভাল লাগে না? ভাল লাগবে না তাদের, যারা স্বাধীন বাংলাদেশ চায়নি। যাদের ওই স্বাধীনতা বিরোধীদের পদলেহন করার অভ্যাস ছিল।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির ধারাটা অব্যাহত রাখতে হবে। দেশের জনগণকে সম্পৃক্ত করেই সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ মোকাবেলা করতে চাই। তাই জনগণকে আরও সচেতন হতে হবে, সজাগ থাকতে হবে। জনগণের সম্মিলিত শক্তিতেই উন্নয়ন ও অগ্রগতির ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে হবে। লন্ডনে থাকা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমানকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই নাম নিতেও ঘৃণা লাগে। তাকে ফিরিয়ে আনতে ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে আলোচনা চলছে। আজ হোক, কাল হোক- এক সময় তার শাস্তি কার্যকর হবেই।
মিয়ানমারের আপত্তি ও অসহযোগিতার কারণেই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সম্ভব হচ্ছে না জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সবাই চায় রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফেরত যাক। কিন্তু মিয়ানমারের সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। এ বিষয়ে তারাই আগ্রহী নয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি দেখি একটা দলের জন্য অনেকের দরদ একেবারে উথলে ওঠে। কিন্তু আপনারা এটা ভুলে যান কীভাবে একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলার কথা। এতগুলো মানুষের জীবন তারা নিলো ক্ষমতায় থাকতে।
ভারতের সঙ্গে অমীমাংসিত ইস্যু প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের অপর এক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, নরেন্দ্র মোদি আবারো প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁকে অভিনন্দন জানাই। আমরা আশা করি আমাদের সমস্যাগুলোর একে একে সমাধান হবে। আপনারা শুধু তিস্তার কথা বলেন। আপনারা ভুলে যাচ্ছেন, আমরা মেরিটাইম বাউন্ডারির মতো কঠিন একটা সমস্যার সমাধান করেছি। আমরা একটা উত্সবমুখর পরিবেশের ছিটমহল বিনিময় করতে সক্ষম হয়েছি। পৃথিবীর বহু দেশে যুদ্ধ বেধে যাচ্ছে এ ছিটমহল নিয়ে। আমরা অনেক কঠিন সমস্যার সমাধান করেছি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, কারো কাছে পানির জন্য মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হবে না। কারণ আমাদের এটা হচ্ছে ডেল্টা। হিমালয় থেকে যে নদীগুলো আসছে সেগুলো বাংলাদেশের ওপর দিয়ে যেতেই হবে। নদীর পানি আমরা কতটা ধরে রাখতে পারব সেই ব্যবস্থা যদি আমরা করি তাহলে পানি আমাদের চাইতে হবে না। আমরা নিজেরাই ধরে রাখার ব্যবস্থা করতে পারব। আমরা তাই করব।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এবার ঈদ জামাতের সময় জঙ্গি হামলার হুমকি ছিল। গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আন্তরিক চেষ্টায় কোনো অঘটন ছাড়াই সব সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে। দেশের দ্রুত অগ্রযাত্রা যেন কোনোভাবেই ব্যাহত না হয় সেজন্য সবার সহযোগিতা চাই। এ ব্যাপারে সাংবাদিকদের সহযোগিতা চেয়ে তিনি বলেন, কোথাও কোনো তথ্য পেলে আমরা ব্যবস্থা নেব।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ওআইসি সম্মেলনে আমার লিখিত বক্তব্যে অনেক কিছু ছিল না। আমি লিখিত বক্তব্যের বাইরেও অনেক কথা বলেছি। আমি বলেছি, ওআইসিভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে যদি কোনো দ্বন্দ্ব থাকে, কেন আমরা আলোচনা করে এসবের সমাধান করতে পারছি না? ওআইসির এ ব্যাপারে আরো উদ্যোগ নেওয়া দরকার। আমাদের সমস্যাগুলো যদি আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে পারি, তাহলে আত্মঘাতী সংঘাত আর রক্তপাত হয় না। তিনি বলেন, ওআইসিকে বলেছি, মুসলমান মুসলমানের রক্ত নিচ্ছে। এটা ওআইসিকে বন্ধ করতে হবে। আল্লাহ ছাড়া কারো কাছে আমার বাবাও মাথানত করেননি, আমিও করব না। যা সত্য তা-ই বলে যাব।’
রোহিঙ্গা সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গাদের কারণে সৃষ্ট সংকটের বিষয়টি ইসলামি দেশগুলোর (ওআইসি) সম্মেলনে তুলে ধরেছি। সম্মেলনে এশিয়ার পক্ষ থেকে আমি বক্তব্য দিয়েছি। এতে জঙ্গিবাদ ও রোহিঙ্গা সমস্যা ছাড়াও মুসলিম দেশগুলোর শিক্ষার্থীদের কারিগরি শিক্ষার বিষয়ে কথা হয়। আরেক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামী জুলাইয়ে চীন সফরে যেতে পারি। আশা করি তখন রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে আলোচনা হবে।
সাংবাদিকদের অপর এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশাল সোশ্যাল সেফটি নেট নিয়ে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। আসন্ন বাজেটেও এ বিষয়ে গুরুত্ব থাকবে। সন্তানসম্ভবা মা, দরিদ্র মা, কর্মজীবী মা প্রত্যেককে আলাদা ভাতা দেওয়া হচ্ছে। বিধবা বা স্বামী পরিত্যক্ত মাকে ভাতা দিচ্ছি। প্রতিবন্ধীদের ভাতা, শিশুদের টিফিন দেওয়াসহ তাঁর সরকারের হাতে নেওয়া নানা সামাজিক সুরক্ষা ও কল্যাণমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার উদাহরণ দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, দেশে শিশুমৃত্যুর হার, মাতৃমৃত্যুর হার কমিয়েছি, দারিদ্র্য কমিয়েছি। নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করেছি। কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছি।
লিখিত বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর সাম্প্রতিক জাপান, সৌদি আরব এবং ফিনল্যান্ডে ত্রিদেশীয় সফরকে অত্যন্ত সফল ও ফলপ্রসূ বলে অভিহিত করে বলেন, জাপান সফরে কিছু চুক্তি সই করেছি। কয়েকটি প্রকল্পে তারা বিনিয়োগ করছে। ২৫০ কোটি ডলারের উন্নয়ন সহায়তা চুক্তি সই হয়েছে। ঢাকার হলি আর্টিজানে নিহত জাপানিদের স্বজনদের সঙ্গে দেখা করে তাদের সমবেদনা জানানোর কথাও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। সৌদি আরবে ওআইসি সম্মেলনে যোগ দেওয়ার পর মক্কায় ওমরাহ পালন এবং মদিনায় মহানবি হযরত মুহম্মদ (সা) এর রওজা জিয়ারতের কথাও তুলে ধরেন তিনি। ফিনল্যান্ড সফর প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফিনল্যান্ডের রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। এটি শান্তিপূর্ণ দেশ। আইসিটিতে তারা খুবই এক্সপার্ট। এ খাতে বিনিয়োগের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
সাংবাদিক সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে মঞ্চে সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মোমেন উপস্থিত ছিলেন। সাংবাদিক সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন গণমাধ্যমের সম্পাদক, সিনিয়র সাংবাদিকবৃন্দ, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য সাবেক মন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী, অর্থমন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল, শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি, বিদ্যুত্ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু, নৌপরিবহন মন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরীসহ মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্য ছাড়াও দলের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ।