বিদ্যুৎ-গ্যাসের সংকটে কারখানা চালু রাখাই দায়

ঘন ঘন লোডশেডিং। রয়েছে গ্যাসের সংকটও। এ দুই সমস্যায় শিল্পকারখানায় উৎপাদনের ধারাবাহিকতা নষ্ট হচ্ছে। ঈদের আগে এমন পরিস্থিতি কারখানার উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। একদিকে উৎপাদন কমে যাওয়া, অন্যদিকে খরচ বেড়ে যাওয়ায় লোকসানে পড়ছেন শিল্প মালিকরা। পারছেন না ব্যাংকের ঋণ ঠিকমতো পরিশোধ করতে। ফলে তারা হয়ে পড়ছেন ঋণখেলাপি। অনেক প্রতিষ্ঠানই রুগ্ন হয়ে পড়ছে। এসব কারণে শিল্পোদ্যোক্তারা চরম বিপদে পড়েছেন। 

দীর্ঘদিন ধরে শিল্প কারখানায় গ্যাসের চাপ কম থাকা এবং গত কয়েক দিন ধরে বিদ্যুতের ঘন ঘন লোডশেডিং উৎপাদনকে ব্যাহত করছে। ইন্ডাস্ট্রি মালিকরা বলছেন, অধিক বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে জেনারেটরের ওপর চাপ বাড়ছে। ওয়েস্টেজ বেশি তৈরি হচ্ছে। খরচ বাড়ছে প্রতিদিন। উৎপাদনের পরিমাণ কমে আসছে। তবে তার চেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে গ্যাসসংকট। এই গ্যাস পুরো ইন্ডাস্ট্রির গতি কমিয়ে দিয়েছে। ফলে নির্ধারিত সময়ে পর্যাপ্ত পরিমাণ পণ্য উৎপাদন করা যাচ্ছে না।

শিল্প মালিকরা বলছেন, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে শিল্প কারখানাগুলো তাদের উত্পাদনক্ষমতার পুরোটা ব্যবহার করতে পারছে না। কারখানাগুলো উৎপাদনের টার্গেট পূরণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে পণ্য সরবরাহ করতে পারছে না কারখানাগুলো। টার্গেট পূরণ করার জন্য বিকল্প পদ্ধতিতে কারখানা চালাতে যেয়ে খরচ বেড়ে যাচ্ছে কয়েকগুণ। বিশেষ করে রপ্তানিকারকরা সময়মতো পণ্য সরবরাহ ঠিক রাখতে অনেক ক্ষেত্রেই বিমানে করে পণ্য পাঠাতে বাধ্য হচ্ছেন। আর তাতে লোকসানে পড়তে হচ্ছে। এভাবে লোকসান দিয়ে কারখানা চালিয়ে মাস শেষে ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এছাড়াও বিল উত্তোলন এবং কর্মীদের বেতন প্রদানে হিমশিম খেতে হচ্ছে মালিকদের। ঋণখেলাপি হয়ে পড়ছেন অনেক উদ্যোক্তা।

অবশ্য রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে অনেকে ঋণ পরিশোধ করছেন না। ইচ্ছাকৃতভাবে (উইলফুল) তারা ঋণখেলাপি থেকে যাচ্ছেন। সাধারণত, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে যারা ঋণ নেন তারাই উইলফুল ঋণখেলাপি। এসব খেলাপিরা অনেকক্ষেত্রেই ভুয়া কাগজপত্র দেখিয়ে ঋণ নেন। একইভাবে ঋণ যাতে পরিশোধ করা না লাগে সেজন্য বিভিন্ন পদক্ষেপও নেন তারা। আর এসব ঋণখেলাপির কারণে প্রকৃত উদ্যোক্তারা বিপদে পড়ছেন। প্রকৃত উদ্যোক্তাদের সহায়তা করার জন্য সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন সময় যেসব উদ্যোগ নেয় সেগুলোর সুবিধা এসব প্রকৃত উদ্যোক্তারা পান না।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন বলেন, বর্তমান পরিস্হিতিতে গ্যাসনির্ভর বড় বিনিয়োগ বিশেষত টেক্সটাইল খাতের উত্পাদন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ফলে সঠিক সময়ে পণ্য উত্পাদনে ব্যর্থ হয়ে বিপুল আর্থিক ক্ষতি হতে পারে। এর সঙ্গে গত কয়েক দিনের লোডশেডিং সংকটকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। তিনি বলেন, বিদু্যতের সমস্যার কারণে জেনারেটরের ওপর চাপ পড়ছে। জেনারেটর আবার দীর্ঘ সময় চালিয়ে রাখা যায় না। সেক্ষেত্রে জেনারেটর বন্ধ রেখে উত্পাদন বন্ধ রাখতে হয়। সেদিক থেকে উত্পাদন কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে। এ বিষয়ে তিনি আরো বলেন, গ্যাসের চাপ কম থাকায় এমনিতেই দিনের বেলা কর্মঘণ্টার সময় শ্রমিকদের কাজে লাগানো যায় না। আবার যখন গ্যাসের চাপ থাকে তখন শ্রমিকদের কাজে লাগাতে হলে অতিরিক্ত অর্থ খরচ করতে হয়। আর উত্পাদন ঠিক রাখতে বিকল্প পদ্ধতি ব্যবহার করায় খরচ অনেক বেড়ে যাচ্ছে। খরচ বাড়~ক আর যাই হোক ব্যাংকের কিস্তি এবং সুদ সময়মতোই দিতে হচ্ছে। যাদের সক্ষমতা কিছুটা কম সেসব উদ্যোক্তারা খেলাপি হয়ে পড়ছেন।

প্রসঙ্গত, দেশে বর্তমানে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪১০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে ৫০ শতাংশের বেশি ব্যবহার হয় শিল্পকারখানায়। গ্যাসের চাহিদার একটি বড় অংশ পূরণ হয় এলএনজি আমদানির মাধ্যমে। সূত্র জানায়, সম্প্রতি বিশ্ববাজারে এলএনজির দাম বেড়ে যাওয়ায় আমদানি কমেছে। এর ফলে গ্যাসের চাহিদার তুলনায় যোগান আরো কমেছে। ফলে সংকট বেড়েছে। অন্যদিকে একই কারণে বিদু্যত্ উত্পাদন কমেছে। বেড়েছে লোডশেডিং।