বাংলাদেশে মুসলমানদের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল আজহা অনুষ্ঠিত হইবে আগামীকাল ১০ জিলহজ রবিবার। মুসলমানদের ঘরে ঘরে এখন ঈদ বা খুশির জোয়ার বহিতেছে। যে যেভাবে পারিতেছেন নাড়ির টানে ছুটিয়া চলিতেছেন গ্রামগঞ্জে। শহর-বন্দর-নগরে কোরবানির হাটগুলি ক্রমেই জমিয়া উঠিতেছে। ইহার আগে কয়েকটি ঈদ আমাদের কাটাইতে হইয়াছে কোভিড-১৯-এর মহাপ্রকোপের মধ্যে। দেশে দেশে তখন ছিল কোভিড বা করোনায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর খবর। মসজিদে স্বাভাবিকভাবে ইবাদত পালন বন্ধ হইয়া গিয়াছিল। পবিত্র নগরী মক্কায়ও বন্ধ ছিল হজব্রত পালন। এখন অস্বাভাবিক অবস্থা কিছুটা কাটিয়া গিয়াছে। তবে করোনার প্রকোপ কমিয়া গেলেও এখনো ইহা হইতে পুরাপুরি মুক্ত নহে বিশ্ব। ইহারই মধ্যে বিশ্ব জুড়িয়া রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অভিঘাত দেখা দেওয়ায় জনজীবনে দুর্বিষহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হইয়াছে। বাংলাদেশের কোনো কোনো অঞ্চল এখনো ভাসিতেছে বানের পানিতে। এই প্রেক্ষাপটেই আগামীকাল পবিত্র ঈদুল আজহায় আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দুই রাকায়াত নামাজ আদায় করিব। নামাজ শেষে করিব পশু কোরবানি।
করোনা পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ায় এইবার মানুষের মধ্যে কোরবানির ঈদ লইয়া অনেকটাই উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ করা যাইতেছে। আসলে দুঃখ বা সুখ কোনোটাই চিরস্থায়ী নহে। আল্লাহ বলেন, ইন্না মায়াল উসরি ইয়ুসরা। অর্থাৎ দুঃখের পরই সুখ আসে। অনুরূপভাবে সুখের পর দুঃখ। এই জন্য জীবনের ধর্মই হইল একদিকে দুঃখ, জরা, মৃত্যু, অন্যদিকে বাঁচিয়া থাকিবার জন্য অফুরন্ত আনন্দ-উদ্দীপনা ও উৎসব উদযাপন। মানুষ কখনো কেবল শোক বা আনন্দ-উৎসব লইয়া বাঁচিতে থাকিতে পারে না। তবে আজ যে কোরবানির উদ্যাপনকে আনন্দ আর উৎসব বলিয়া আমরা জানিতেছি, তাহার শুরুটা হইয়াছিল চরম এক পরীক্ষার মধ্য দিয়া। পিতা ও পুত্র হজরত ইব্রাহিম ও ইসমাইলের (আ.) এক মহাপরীক্ষা নিয়াছিলেন স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামিন। হজরত ইব্রাহিম (আ.) আল্লাহর নির্দেশে একমাত্র পুত্রকে কোরবানি করিতে উদ্যত হন। আল্লাহ পাক হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর সহিহ নিয়ত কবুল করিয়া নেন এবং তাহার স্হলে একটি হালাল পশু কোরবানির নির্দেশ দেন। সেই ইতিহাস হইতেই মুসলমানদের জন্য কোরবানির সূচনা এবং হজব্রত পালনের প্রচলন। সামর্থ্যবান সব মুসলমানের জন্য কোরবানি দেওয়া তাই অত্যাবশ্যকীয়ভাবে পালনীয়।
কোরবানি আত্মত্যাগের এক অনুপম নিদর্শন। মানবিক শিক্ষা অর্জনেরও এক অতুলনীয় উদাহরণ। মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব, তাহা সত্ত্বেও এই সেরা জীবদের কাণ্ডজ্ঞানহীন কর্মের ফলে আজ দুনিয়া জুড়িয়া অস্থিরতা, উত্তেজনা, অশান্তি ও যুদ্ধ-বিগ্রহ চলিতেছে। সর্বক্ষেত্রে বিরাজ করিতেছে একটা ভারসাম্যহীনতা। কোরবানির অর্থ হইল ত্যাগ ও রিপুর শাসন। রিপুর তাড়নায় মানুষ যেন বিভ্রান্তি, অসত্য, অনৈতিক কর্মে প্রবৃত্ত না হয়, সুপথ যেন পরিত্যাগ না করে কখনো কোরবানির শিক্ষা মূলত ইহাই। শয়তানের কুপ্ররোচনা হইতে নিজেদের রক্ষা করিতে মানুষকে কোরবানির শিক্ষা ধারণ করিতে হইবে পরম বিশ্বাসে।
কোরবানির অন্তর্নিহিত তাৎপর্য হইল ত্যাগ স্বীকার। কিন্তু ত্যাগের পরিবর্তে ভোগের প্রবণতাই আমাদের মধ্যে অধিক লক্ষ করা যায়। এই ত্যাগের অর্থ সংযম ও ধৈর্য ধারণও। রিপুর দাসত্ব ত্যাগ করিয়া স্রষ্টার দাসত্ব মানিয়া চলা। সমাজের গরিব-দুঃখী, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াইয়া তাহাদের দুঃখ-কষ্টের সহমর্মী হওয়ার যে কথা কোরবানির শিক্ষার মধ্যে বলা হইয়াছে, তাহাও আমাদের অনুসরণ করা প্রয়োজন। আমাদের অন্তরের সকল ক্লেদ, কালিমা, হিংসা-দ্বেষ কোরবানির পশুর রক্তস্রোতের সঙ্গে দূর হইয়া যাক। আমাদের জীবন-মরণ, নামাজ ও কোরবানি—সকল কিছুই এক আল্লাহর জন্য নিবেদিত হউক। ত্যাগ ও একনিষ্ঠতার শিক্ষাই চারিদিকে ছড়াইয়া পড়ুক। সকলকে জানাই পবিত্র ঈদুল আজহার অনাবিল শুভেচ্ছা—ঈদ মোবারক।