চৌহালী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কোন এমবিবিএস চিকিৎসক থেকেও নেই!

বেতন-ভাতা উত্তোলনে তাদের নিয়োমিত অংশগ্রহন। তবে কর্মস্থলে কাজের বেলায় ঠিক নেই। সপ্তাহে আসেন একবার। কেবল হাজিরা খাতায় সই করতে। আবার কোনো সপ্তাহে আসেনও না। তাতে রোগী বাঁচুক আর মরুক তাদের কিছু যায় আসে না। এভাবেই চলছে চৌহালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স।

সিরাজগঞ্জের অবহেলিত জনপদ চৌহালীতে চিকিৎসকদের এমন দায়িত্ববোধের কারণে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি রোগীদের কোন কাজে আসছে না। তারা কাংক্ষিত সেবা না পেয়ে দুর্ভোগ নিয়ে আশাহত হয়ে ফিরছে বাড়িতে। 

সোমবার দিনভর অফিস চলাকালে পাওয়া যায়নি কোন চিকিৎসক। এ কারণে চরাঞ্চলের সুবিধাবঞ্চিত অসহায় রোগীদের দুশ্চিন্তা কাটছে না।

১৯৮৬ সালে সরকারিভাবে নির্মাণ করা হয় ৩১ সজ্জার এই ‘আধুনিক হাসপাতাল’। অতীতে যেভাবে চিকিৎসা সেবা পেয়েছে এখানকার মানুষ সে রকম আর নেই। রোগীদের ওয়ার্ডগুলো ব্যবহৃত হচ্ছে কর্মচারীদের শোবার ঘর ও কিচেন রুম হিসেবে। বেডগুলো ঘুমানোর জন্য ব্যবহার করছেন পরিচ্ছন্নতা কর্মী, অফিস সহায়ক, চালক ও অন্য কর্মচারীরা।

জানা গেছে হাসপাতালটিতে বর্তমানে চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিত ৬ জন এমবিবিএস চিকিৎসক। এর মধ্যে নিয়মিত নন একজনও। এরা হলেন, আরএমও ডাঃ আনন্দ মোহন সরকার, ডাঃ আশরাফুল ইসলাম, ডাঃ সোনিয়া রহমান সাথী-কনসালটেন্ট (গাইনী), ডাঃ আনিকা ছাত্তার, ডাঃ সুমন ও ডাঃ শাহিনুল আলম। সোমবার বেলা ১১টার দিকে হাসপাতালে গিয়ে ৩ ঘন্টা অবস্থান নিয়ে দেখা যায়, কোন চিকিৎসকই কর্মস্থলে নেই। 

এলাকাবাসী জানায়, হাসপাতালের বেতন ভাতা ঠিকই নেন। তারা অবস্থান করেন বেসরকারী ক্লিনিক গুলোতে। আবার সপ্তাহে দু-একদিন এলেও কোনরকমে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে ২-৩ ঘন্টা রোগী দেখেই চলে যান। মূলত, তাদের তদারকিতে নিয়োজিত কর্মকর্তারা যথাযথ ভুমিকা না রাখায় এমন অবস্থা।

হাসপাতালের সপ্তাহিক কার্য তালিকায় সোমবারে উল্লেখ রয়েছে, সকালে সকল চিকিৎসকরা হাসপাতালে অবস্থানের কথা। এছাড়া সকাল থেকে রাতেও অবস্থান নেবেন ডাঃ আশরাফুল আলম। তবে তারা কেউ এদিন উপস্থিত হননি। কেন উপস্থিত হননি জানতে দন্ত চিকিৎসক ডাঃ আশরাফুল আলমের ব্যবহৃত ০১৬৮৪-০০৪০১৪ নম্বর মোবাইল ফোনে বার-বার ফোন করে তা বন্ধ পাওয়া যায়।

এদিকে হাসপাতালে আরএমও ডাঃ আনন্দ মোহন সরকার জানান, ঈদের সময় আমার ছুটি থাকলেও কর্মস্থলে ছিলাম। এজন্য এখন হাসপাতালে যাচ্ছি না।  

গাইনী চিকিৎসক ডাঃ সোনিয়া রহমান সাথীকে মোবাইলে কল করলে ফোন তিনি রিসিভ করেননি।

বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসক উপস্থিতি না থাকায় ৫টি মৌলিক চাহিদার অন্যতম চরাঞ্চলের অসহায় রোগীদের চিকিৎসা পেতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। তাদের বিশেষ চিকিৎসায় সুদুর টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালের ওপর নির্ভর করতে হয়।

সোমবার চিকিৎসা নিতে আসা জাজুরিয়ার খাদিজাতুল কোবরা (২৬), বৃদ্ধ আমীর হোসেন (৫২), পুর্ব খাসকাউলিয়ার আবু সাইদ (৫৫) এবং খাস পুকুরিয়ার আবুল কালাম (৫৮) বলেন, ‘আমরা সবাই বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য গিয়েছিলাম। কিন্তু কোন চিকিৎসক পাইনি। হাসপাতালে যদি সরকার চিকিৎসক না রাখতে পারে তাহলে আমাদের জন্য তা করা হয়েছে কেন?’

তারা আরও বলেন, ‘আমরা যখনই আসি, সব চিকিৎসককে পাই না। আবার বিষয়টি নিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে যে জানাবো তিনিও নিয়মিত উপস্থিত হন না। তাহলে কি আমরা চরবাসী চিকিৎসা পাবো না।’

আরও পড়ুন: ভূরুঙ্গামারীতে শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষ, ৫ পুলিশ বরখাস্ত

এ বিষয়ে চৌহালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ইউএইচএ ডাঃ আব্দুল কাদের বলেন, ‘দুই-একজন চিকিৎসক কিছু কারণে অনিমিত হওয়ায় আমি নিজেও অসন্তষ্ট। চৌহালীর মানুষ সরল আর অভাবী। এদের যদি আমরা সেবা দিতে না পারি তাহলে মহান এই পেশা কুলষিত হয়। চিকিৎসকরা যাতে আগামীতে কর্মস্থলে উপস্থিত থেকে নৈতিক দায়িত্ব পালন করে সে লক্ষে আমি সচেষ্ট থাকবো।’

ইত্তেফাক/নূহু