কোনো সুনামই জনসনের পর পার্টিকে পরিচ্ছন্ন করবে না

বরিস জনসনের বিদায়ের মধ্য দিয়ে ব্রিটেনের রাজনীতিতে অস্হিরতা চলছে। প্রধানমন্ত্রী কিংবা নেতা নির্বাচনে অনেকের দৌড়ঝাঁপ নিয়ে চলছে জল্পনা-কল্পনা, আলোচনা-সমালোচনা। তবে এক্ষেত্রে বলতে হয়, পরবর্তী নেতারা তাদের কর্মকাণ্ডের দৃশ্যপট থেকে যতই দূরে সরে যাওয়ার চেষ্টা করুক না কেন, সংকটের জন্য তারাও জনসনের মতোই সমভাবে দায়ী।

বেশির ভাগ সফল বিপ্লবের ক্ষেত্রে আমরা দেখি যে, এমন একটি মুহূর্ত আসে, যখন দলের অভ্যন্তরীণ সার্কেলের মধ্য থেকেই কোনো একজন শক্তিশালী ব্যক্তিত্বের দ্বারা স্বৈরশাসক বিতাড়িত হয়। এই সিস্টেম মূলত আরব বসন্তের সময় থেকে পরিচিত হয়ে ওঠে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এমনটা ঘটতে দেখা যায়, একজন সামরিক কমান্ডার দাবি করেন যে, ‘প্রতিবাদী জনতার ওপর নির্মমতা প্রদর্শনকারী স্বৈরাচারী রাষ্ট্রপতির পক্ষে আর দাঁড়াতে চান না তারা’। মূলত এ সময় তারা জাতির পক্ষে ও স্বার্থে উচ্চকণ্ঠে কথা বলেন, যদিও এতে তাদের ক্যারিয়ারে ঝাঁকুনি লাগার আশঙ্কা থাকে। তা সত্ত্বেও দেশপ্রেম সম্পর্কে তারা এ সময় ধার্মিক ভাষণ দেন। আরব বসন্েতর তিক্ত পরিণতি আমাদের দেখিয়েছে, যে ব্যক্তি স্বৈরশাসককে ক্ষমতাচু্যত করেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে তিনিই ছিলেন সেই স্বৈরশাসকেরই লোক তথা স্বৈরশাসক তৈরিতে তার হাত ছিল। কাজেই এটা মানতে হবে, তারা কখনোই ত্রাণকর্তা হতে পারেন না। কেননা, তারাই হতে পারেন পরবর্তী স্বৈরশাসক।

টোরি পার্টি এখন এরূপ চরিত্রে পূর্ণ, যেখানে সবাই দাবি করছেন যে তারা জাতির স্বার্থে সঠিক কাজটিই করেছেন। আগামী কয়েক সপ্তাহ ধরে টোরি মন্ত্রীরা তাদের সুনাম, সুখ্যাতি পুনরুদ্ধার করতে এবং সরকারের বিপর্যয়কর ব্যর্থতার তাবত্ দায়ের পুরোটাই এককভাবে বরিস জনসনের মাথায় চাপানোর জন্য সবকিছুই করবেন এবং বলবেন। তাদের পদত্যাগপত্র এবং টুইটগুলো দেখে এটিই স্পষ্ট হচ্ছে, এটি তার অসততায় বিরক্তিকর, দেশপ্রেমের বাগ্মীতা অবলম্বনে অসম্মানজনক, ভরপুর অজুহাতে অপমানজনক এবং এর অভিন্ন বিন্যাসে স্বচ্ছ।

‘ন্যায়বোধ ও বিবেকের জায়গা থেকে আমি আর সেবা চালিয়ে যেতে পারি না’— লিখেছেন সাজিদ জাভিদ। যদিও বেশ কয়েকটি কেলেঙ্কারির অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ইতিমধ্যে ঋষি সুনাক ‘সঠিক’, ‘দক্ষ’ ও ‘মনোযোগী’ মানগুলোতে বিশ্বাস বহাল রেখে সরকার গঠন উচিত বলে বলেছেন। ভাবটা এমন, যেন তিনি আগে বুঝতে পারেননি যে জনসন এই জিনিসগুলোর ধারেকাছেও ছিলেন না! অসংখ্য কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত জনসনকে সমর্থন করার ‘নীতি’ কারো মুখে শোনা না যাচ্ছে না বটে, তবে বিশেষ মুহূর্তে জাহাজ থেকে ঝাঁপ দেওয়ার তোড়তোড় দেখে এটি স্পষ্ট হয়ে যায় যে, এটি ডুবে যাচ্ছে।

যেহেতু কনজারভেটিভ এমপিরা ভিড়ের সামনে নিজেদের টোরি নেতা হিসেবে জাহির করার জন্য ধাক্কাধাক্কি করছে, আমরা বিশ্বাস করি যে, হয় জনসন সম্পূর্ণরূপে অসহায় বা সক্ষম হয়ে ক্ষমতায় এসেছেন অথবা নেতারা উল্কাপিণ্ডের মতো আকাশ থেকে পড়ে গেছেন এবং তার পরও তারা অফিসে বসে আছেন যতক্ষণ না একটি বড় ভিড় জড়ো হয় তাদের বের করে দেওয়ার জন্য। সর্বোপরি আমরা বিশ্বাস করি যে, মিথ্যা, প্রতারণা এবং বেপরোয়াভাবে একটি মারাত্মক মহামারি পরিচালনা করার সময় যারা উৎসাহের সঙ্গে জনসনকে রক্ষা করেছিলেন, তারাই এখন আমাদের পরবর্তী নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য বিশ্বস্ত হয়ে উঠতে চেষ্টা চালাচ্ছেন।

আরো একটি খেলা মিডিয়ায় চলেছে, যেটা ২০১৯ সালে লেবার পার্টিকে বিকল্প হিসেবে হজম করতে কষ্ট হচ্ছিল। যে কারণে জনসনকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রধানমন্ত্রিত্ব দেওয়া হয় বা তিনি পেয়ে যান। সেই সঙ্গে ব্রেক্সিট ও করবিনের প্রতি তিরস্কার কাজ করেছে।

জনসনের উত্থান হয় মিডিয়ার অতি উৎসাহের কারণে। অভিবাসী, ইইউ ও অন্য খলনায়কদের সম্পর্কে ভয়-ভীতি ছড়িয়ে তিনি আলোচনায় আসেন। এতে তিনি লাভবান হন, লাভবান হয় তার দলও। শিশুদের বিনা মূল্যে স্কুলের মধ্যাহ্নভোজের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরা হয়। ২০১৯ সালের নির্বাচনি প্রচারণায় উত্তেজনাকর অনুভূতির সৃষ্টি হয়। এরপর ২০২০ সালে টাইমসে ম্যাথিউ প্যারিস লিখলেন, ‘জনসন আসলে কী করবেন তা নিয়ে নয়, তিনি কী বলেছেন সেটাই বিবেচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার চরিত্রের বৈশিষ্ট্য হলো, ‘বুদ্ধিপটু ও দু্যতিময় কথা, চমক, আবেগময়তা ও মজা।’ মাত্র তিন বছর আগে প্যারিস একই জনসন সম্পর্কে লিখেছিলেন, ‘অযোগ্যতা মজার নয় ... সত্যের প্রতি অসতর্ক অবহেলা মজার নয়।’ কিন্তু সেই নীতিনির্ধারক টোরি এমপিদের মতো, ডানপম্হী প্রেস জনসনের জন্য অজুহাত খুঁজতে থাকে। একজন ব্যক্তি যার প্রকৃতি আর অজানা নয়, এখন তিনি রাষ্ট্রের জন্য দায় হয়ে পড়েছেন।

আবার ঘড়ির কাঁটা পুনরায় সেট করা হলো। আমরা আশা করি, এবারও আমরা এগিয়ে যাব এবং বিশ্বাস করব, যারা জনসনকে পথ দেখিয়ে সাহাঘ্য করেছিলেন, তারা ব্রিটিশ জনগণের মতোই রাগান্বিত, হতাশ ও বিশ্বাসঘাতকতা অনুভব করছেন। আপনি জানেন কি? অনেকেই বিশ্বাস করবেন। যখন অজনপ্রিয় নেতাদের পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়, তখন দুটি জিনিস ঘটে। প্রথমত, ক্ষমতার শূন্যতায় এবং তাদের চলে যাওয়ায় কিং মেকারগণ বা যারা কাউকে ক্ষমতায় আনেত পারেন তারা ও ক্ষমতাবানদের ভবিষ্যদ্বাণীকারীরা মাঠে-ময়দানে নেমে পড়েন। পরে কে দেশকে নেতৃত্ব দেবেন তা নিয়ে তারা বাজি ধরতে শুরু করেন। দ্বিতীয়ত, পাগলা ঘোড়ার মতো মন্তব্য ছুড়তে থাকেন।

এবং এ কারণে যারা এখন জনসনকে প্রতিস্হাপন করতে দৌড়াচ্ছেন, তারা প্রার্থীদের তুলে ধরছেন ‘চটপটে’, ‘চিত্তাকর্ষক’, ‘ব্রিফিংয়ে ভালো’, ‘আকর্ষণীয় রাজনীতিবিদ’, ‘যে কাউকে তার বিষয়টি দেখতে হবে’, ‘সিরিয়াস অপারেটর’ ইত্যাদি হিসেবে। আমরা প্রার্থীদের প্রোফাইল দেখছি, কেইর স্টারমারের বিরুদ্ধে টরি নেতাদের জরিপের শেষ নেই এবং ‘কে ওপরে আর কে নিচে’-এর মতো মন্তব্য করা হচ্ছে। যেহেতু তাদের প্রশ্ন করা হয়েছে, তাই এই প্রার্থীদের ইতিমধ্যে ট্যাক্সেশন থেকে শুরু করে ট্রান্স ইসু্যতে সমস্ত বিষয়ে তাদের মতামত দেওয়ার জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে। তবে খুব কম লোককে জিজ্ঞাসা করা হবে ‘কেন’, মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে, তারা করোনা ভাইরাসের কারণে লকডাউন চলাকালে পার্টি দেওয়ার অভিযোগের (গ্রান্ট শ্যাপস) বিরুদ্ধে জনসনকে সমর্থন করেছিলেন (যেমন গ্রান্ট শ্যাপস), গত মাসের অনাস্হা ভোটে জনসনকে সমর্থন করেছিলেন (যেমন লিজ ট্রাস)। অথবা এ বছরের জানুয়ারি মাসে জনসনকে পদত্যাগ করার আহ্বান জানানো হয়েছিল, তখন জনসনের পক্ষাবলম্বন করেছিলেন (যেমন জাভিদ)।

অপরাধের দৃশ্য থেকে দূরে থাকা প্রত্যেকেই নিছক গতি থেকে উপকৃত হয়, যা একটি নতুন শুরুর সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষাকে চালিত করে। জনসনের কেলেঙ্কারি এবং দুই বছরের কোভিড অন্ধকারের পরে কে বিশ্বাস করতে চায় যে আমাদের রাজনীতির অসুস্হতা এবং আমাদের অর্থনীতির দুর্বলতা একক ব্যক্তি থেকে পরিত্রাণ পেয়ে এটিকে উদ্ধার করতে এসেছিল? জনসনের অপসারণের মাধ্যমে সঠিক কাজটি করা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। কেউ সেই ব্যক্তির কথা শুনতে চায় না যে এই তর্ক করে যে সমস্যাটি একক ব্যক্তির সঙ্গে জড়িত নয় বা জনসনের অপসারণে কোনো সম্মান নেই।

ব্রিটিশ রাজনীতিতে আমরা যে গভীর পরিবর্তনের জন্য আকাঙ্ক্ষা করি, তা একজন টোরি নেতাকে প্রতিস্হাপনের মাধ্যমে অর্জন করা যাবে না। ডানপম্হী মিডিয়া ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান যা-ই বলুক, যতক্ষণ না কাঠামোগত সংস্কারের প্রস্তাব করা হয় এবং এর সামান্যতম পরিবর্তন না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত ভালো কিছু অর্জন করা যাবে না। কমন্সে জাভিদের নিজের বক্তব্যকে এখানে উদ্ধৃত করা যায়। তিনি বলেছেন :‘কিছু মৌলিক ভুল সম্পর্কে বুঝতে পারার আগে আপনি অনেকবার সেই মেশিনটি চালু ও বন্ধ করতে পারেন।’

অতএব, সমস্ত সংকটের মতো এই মুহূর্তে যখন আমরা এই সুসংবাদে বিশ্বাস করার জন্য সবচেয়ে বেশি সংবেদনশীল, তখন আমাদের কাছে এই মিথ্যা বিক্রি করা হয় যে ঝামেলা শেষ হয়ে গেছে এবং অপরাধীরা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। কিন্তু আসলে ঝামেলা শেষ হয়নি। আমাদের একমাত্র আশা আমাদের পা শক্তভাবে মাটিতে রাখা এবং দৃঢ়ভাবে দাঁড়ানো। কোনো একক অজুহাত বা একক ক্ষমাযোগ্য কারণ নেই, সেই সব লোককে বিশ্বাস করার জন্য যারা জানেন যে জনসন আসলে কে ছিলেন এবং যেভাবেই হোক তার মাধ্যমে জাতির ওপর আঘাত হানা হয়েছে।

লেখক: সাংবাদিক, দ্য গার্ডিয়ান থেকে ভাষান্তর- সুমৃৎ খান সুজন