ইন্দোনেশিয়ার বালিতে শুরু হয়েছে জি-২০ভুক্ত দেশের মন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর গভর্নরদের তৃতীয় সম্মেলন। এই মিটিংয়ে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা এমন একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অবস্থার মুখোমুখি হচ্ছেন, যা তাত্পর্যপূর্ণভাবে গভীর অন্ধকারে ডুবতে যাচ্ছে। এপ্রিলে যখন জি-২০-এর শেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, তখন এই বছর (২০২২) এবং পরবর্তী বছরে (২০২৩) বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি কমে ৩ দশমিক ৬ শতাংশে দাঁড়াবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছিল আইএমএফ। ঝুঁকি বিবেচনায় সে সময় আমরা সতর্ক করে বলেছিলাম, প্রবৃদ্ধির নিম্নমুখী হার আরো খারাপ হতে পারে। পরবর্তী সময়ে আমরা দেখেছি—বেশ কিছু ঝুঁকি সামনে এসেছে, বহুবিধ সমস্যা ঘিরে ধরেছে এবং অতঃপর বিশ্বে আজ একাধিক সংকট তীব্রভাবে প্রকট হচ্ছে।
ইউক্রেন যুদ্ধে মানবিক ট্র্যাজেডি খারাপ থেকে ‘অতি খারাপ’ হয়েছে। চলমান এই যুদ্ধে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ধসে গেছে। বিশেষ করে, পণ্যমূল্যের ধাক্কা উত্পাদনব্যবস্থাকে স্থবির করে দিচ্ছে, জীবনযাত্রার ব্যয় সংকটকে বাড়িয়ে তুলছে। এর প্রভাব পড়ছে কোটি কোটি মানুষের ওপর। বিশেষত দরিদ্র মানুষ, যারা প্রতিনিয়ত নিজের কিংবা পরিবারকে খাওয়ানোর সামর্থ্য হারাচ্ছে। এই অবস্থা দিনকে দিন কেবল খারাপের দিকেই যাচ্ছে।
মূল্যস্ফীতি অপ্রত্যাশিতভাবে বেড়ে গেছে। খাদ্য ও জ্বালানির দাম চড়া হয়েছে। এর ফলে প্রধান কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো আর্থিক কড়াকড়ি আরোপে বাধ্য হচ্ছে। এটি প্রয়োজনীয় বটে কিন্তু এর কারণে পুনরুদ্ধার বা উত্তরণ কঠিন হয়ে পড়বে। চলমান মহামারি কিংবা নতুন নতুন বাধাবিপত্তি বিশ্বব্যাপী সাপ্লাই চেইনকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে—বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা পড়ছে বাধার মুখে। সাম্প্রতিক প্রতিটি সূচকই দুর্বল প্রবৃদ্ধিকে নির্দেশ করছে। এই মাসের শেষার্ধে ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক আপডেট ২০২২’ এমনকি ২০২৩-এ বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি আরো নিম্নগামী হবে বলে মনে করছি আমরা।
প্রকৃত অর্থেই, অবস্থা ক্রমাগত আরো অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে। ইউরোপে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ বিঘ্নিত হলে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চরম মন্দায় নিমজ্জিত হবে। যা বিশ্বব্যাপী জ্বালানিসংকটকে প্রকট করবে। তখন পরিস্থিতি কেমন হবে—ভাবুন একবার! এটি এমন একটি বিষয়, যা ইতিমধ্যেই পরিস্থিতিকে কঠিন করে তুলেছে। এই অবস্থা ২০২২ সালকে কঠিন করে তুলছে এবং সম্ভবত ২০২৩-কে আরো বেশি কঠিন করে তুলতে চলেছে—মহামন্দার ঝুঁকি বেড়েছে। এমতাবস্থায়, আমাদের প্রয়োজন ঠান্ডা মাথায় নিষ্পত্তিমূলক সমাধানের কথা চিন্তা করা। এবং সেই অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করা। একই সঙ্গে প্রয়োজন শক্তিশালী আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, যার নেতৃত্বে থাকবে জি-২০। আইএমএফ তার নতুন জি-২০ প্রতিবেদনে এমনসব নীতির রূপরেখা তুলে ধরেছে যা থেকে তাত্পর্যপূর্ণ কিছু উপকার মিলবে। সমস্যার সাগরে অবগাহন করা দেশগুলো মুক্তিলাভের জন্য এটিকে অনুসরণ করতে পারে। তিনটি বিষয় এখানে উল্লেখ করতে চাই—
প্রথমত, উচ্চ মূল্যস্ফীতি কমাতে দেশগুলোকে তাদের সাধ্যের সবকিছু করতে হবে। কেন? কারণ ক্রমাগত উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি উত্তরণের পথকে পুরোপুরি ডুবিয়ে দিতে পারে। জীবনযাত্রার মানের আরো ক্ষতি করতে পারে। বিশেষ করে দুর্বলদের অবস্থাকে আরো শোচনীয় করে তুলতে পারে। মূল্যস্ফীতি ইতিমধ্যেই বহু দেশে কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এ অবস্থায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে মুদ্রানীতিকে কঠোরতর রাখা চালিয়ে যেতে হবে। এটি বিশেষভাবে জরুরি। কাঙ্ক্ষিত পদক্ষেপ ব্যতীত দেশগুলোকে একটি ধ্বংসাত্মক মজুরি-মূল্যের ভয়াবহতা মোকাবিলা করতে হতে পারে। কাজেই প্রবৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের আরো বেশি ক্ষতি কমাতে জোরদার আর্থিক কড়াকড়ির প্রয়োজন হবে।
দ্বিতীয়ত, রাজস্বনীতিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পলিসির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। মূল্যস্ফীতি কমাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রচেষ্টাকে বাধা দেওয়া যাবে না, বরং সাহাঘ্য করতে হবে। যেসব দেশ উচ্চমাত্রার ঋণের সম্মুখীন তাদের আর্থিক নীতি আরো কঠোর করতে হবে। এটি ক্রমবর্ধমান ব্যয়বহুল ঋণের বোঝা কমাতে সাহাঘ্য করবে এবং একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আর্থিক প্রচেষ্টার পরিপূরক হয়ে উঠবে। এছাড়া যেসব দেশে মহামারি থেকে উত্তরণের সহজ রাস্তা রয়েছে, সেখানে অস্বাভাবিক আর্থিক সহায়তা থেকে দূরে সরে আসতে হবে। এটি চাহিদা কমাতে সাহাঘ্য করবে, যা দামের ওপর চাপ কমাতে সহায়তা করবে।
কিন্তু এটিও মাথায় রাখতে হবে যে, এসব কথা অনুমানের অংশ মাত্র। কেননা কিছু লোকের অনেক বেশি সাহাঘ্যের প্রয়োজন। বিশেষ করে জ্বালানি বা খাদ্যদ্রব্যের মূল্যস্ফীতির কারণে নতুন করে ধাক্কার সম্মুখীন হবে। এসব দুর্বল পরিবারগুলোকে সহায়তা করার জন্য সুনির্ধারিত কর্মপম্হা এবং অস্থায়ী ব্যবস্থার বিশেষ প্রয়োজন। বিতর্কিত ভতুর্কি বা মূল্য নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে সরাসরি নগদ হস্তান্তর অধিক কার্যকর হতে পারে, যা ইতিমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে।
মাঝারি মেয়াদে, কাঠামোগত সংস্কারগুলোর দিকে জোর দেওয়া যেতে পারে, যা উত্পাদনব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শ্রমবাজারের নীতিগুলোর কথাই যদি ধরা হয়, দেখা যাবে তা মানুষকে কর্মশক্তিতে রূপান্তরিত হতে সাহাঘ্য করে, বিশেষ করে নারীদের।
নতুন ব্যবস্থাগুলোকে অবশ্যই বাজেট-নিরপেক্ষ হতে হবে। নতুন রাজস্ব সৃষ্টি বা অন্যত্র ব্যয় হ্রাসের মাধ্যমে অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে। নতুন ঋণ না নিয়ে কিংবা মুদ্রানীতির বিরুদ্ধে কাজ করা বাদ দিতে হবে। এ যুগের উচ্চ সুদ হারে রেকর্ড ঋণ পরিহার করাও অত্যন্ত জরুরি। ঋণ হ্রাস করা একটি জরুরি প্রয়োজন। বিশেষ করে উদীয়মান এবং উন্নয়নশীল অর্থনীতির ক্ষেত্রে—যা বৈদেশিক মুদ্রায় (এফএক্স) দায়বদ্ধতাসহ বৈশ্বিক আর্থিক পরিস্থিতি কঠোর করার জন্য আরো ঝুঁঁকিপূর্ণ। কেননা ঋণের খরচ বাড়ছে।
নানা রকম প্রচেষ্টার বাইরেও ঋণ খাতের উন্নয়নের জন্য জি-২০-এর কমন ফ্রেমওয়ার্কের উন্নতি এবং বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এর সঙ্গে জড়িত সকলের জরুরিভাবে নিষ্পত্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। বৃহৎ ঋণদাতাদের তথা সার্বভৌম এবং ব্যক্তিগত উভয়কেই পদক্ষেপ নিতে হবে। তাদের সম্মিলিতভাবে ভূমিকা পালন করতে হবে। একা কাজ করার সময় নয় এখন। সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। চাদ, ইথিওপিয়া এবং জাম্বিয়ার জন্য ঋণদাতা কমিটিগুলোর এই মাসের মিটিংগুলোর অগ্রগতি সাধন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তৃৃতীয়ত, বিশ্বব্যাপী দরকার একটি সহযোগিতার পরিবেশ, যা হবে আমাদের জন্য একটি নতুন প্রেরণার। এর নেতৃত্বে থাকবে জি-২০। সম্ভাব্য সংকট এড়িয়ে প্রবৃদ্ধি ও উত্পাদনশীলতা বাড়াতে সমন্বিত আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ জরুরিভাবে প্রয়োজন। কর এবং বাণিজ্য থেকে শুরু করে মহামারি প্রস্তুতি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক অগ্রগতির ওপর ভিত্তি করে কর্মপম্হা গড়ে তোলাই হবে মুখ্য বিষয়। মহামারি প্রতিরোধ এবং প্রস্তুতির জন্য জি-২০-এর নতুন ১১০ কোটি ডলারের তহবিল আমাদের পথ দেখিয়েছে—কীভাবে এটি সম্ভব হবে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সাম্প্রতিক সাফল্যগুলো এর বড় উদাহরণ।
সবচেয়ে জরুরি হলো, জীবনযাত্রার ব্যয়-সংকট দূর করার জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে। ইউএনডিপির হিসেব মতে, ব্যয়-সংকট বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র দেশগুলোতে ৭ কোটি ১০ লাখ মানুষকে চরম দারিদ্রে্যর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক অস্থিতিশীলতার ঝুঁকি বাড়ছে ক্রমাগতভাবে। তাছাড়া ক্ষুধা, অপুষ্টি এবং অভিবাসন এড়াতে বিশ্বের ধনী দেশগুলিকে এগিয়ে আসতে হবে। বিশেষ করে, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির মাধ্যমে নতুন দ্বিপাক্ষিক এবং বহুপাক্ষিক অর্থায়নসহ প্রয়োজনে তাদের জন্য জরুরি সহায়তা প্রদান করা উচিত।
একটি তাত্ক্ষণিক পদক্ষেপ হিসেবে, দেশগুলোকে খাদ্য রপ্তানিতে সম্প্রতি আরোপিত বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করতে হবে। কারণ এই ধরনের বিধিনিষেধ অভ্যন্তরীণ মূল্য স্থিতিশীল করতে ক্ষতিকারক এবং অকার্যকর হিসেবে কাজ করে থাকে। সাপ্লাই চেইনকে শক্তিশালী করতে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা করার জন্য ঝুঁঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে খাদ্য উত্পাদনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সহায়তা কররতে হবে। এর স্বার্থে আরো ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। এখানেও আইএমএফ সাহাঘ্য করছে। আমরা একটি নতুন বহুপাক্ষিক খাদ্যনিরাপত্তা উদ্যোগসহ আমাদের আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছি। এ লক্ষ্যে ঝুঁঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য ৪ হাজার ৫০০ কোটি ডলার অর্থায়ন করা হবে। যার লক্ষ্য জলবায়ু পরিবর্তন এবং ভবিষ্যতে মহামারির মতো দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা। এবং আমরা আরো কিছু করতে প্রস্তুত।
এই মুহূর্তে অনেক দেশ, বিশেষ করে আফ্রিকান দেশগুলোতে চলমান কঠিন পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই মহাদেশের অর্থমন্ত্রী এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরদের সঙ্গে আমার বৈঠক হয়েছে। অনেকেই জানিয়েছে, কীভাবে বৈশ্বিক প্রভাবের ধাক্কা তাদের অর্থনীতিকে খাদের কিনারায় ঠেলে দিচ্ছে। খাদ্যদ্রব্যের উচ্চমূল্যের প্রভাব তীব্রতর হচ্ছে। মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব, ঋণ এবং পরিশোধের ভারসাম্যের চাপ—সবই প্রকট হয়ে উঠছে। অধিকাংশ দেশই আর্থিক বাজার থেকে পুরোপুরি ছিটকে গেছে। এই পটভূমিতে তারা তাদের জনগণকে সাহাঘ্য করার জন্য উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। এটি এমন একটি আবেদন যাতে আমাদের অবশ্যই মনোযোগ দিতে হবে।
বর্তমান নানা সমস্যা থেকে মুক্তি লাভের জন্য, সমস্যার সাগর থেকে কিনারায় আসার জন্য জি-২০ সম্মেলনে আমরা সম্মিলিতভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দ থেকে অনুপ্রাণিত হতে পারি, যা আমাদের চেতনাকে ধরে রাখতে সাহাঘ্য করবে। শব্দটি হচ্ছে ‘মেন্যামা ব্রায়া’। যার অর্থ হলো—‘আমরা প্রত্যেকেই পরস্পরের ভাই অথবা বোন।’
লেখক: আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক
দ্য গার্ডিয়ান থেকে ভাষান্তর: সুমৃৎ খান সুজন