নবজাতকটি আশঙ্কামুক্ত, দায়িত্ব নিলেন ডিসি

ময়মনসিংহের ত্রিশালে ট্রাকচাপায় স্বামী, অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী ও শিশু মেয়েসহ একই পরিবারের তিন জন নিহতের ঘটনায় শোকাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছেন তাদের স্বজন ও এলাকাবাসী। শনিবার রাতেই জানাজা শেষে উপজেলার রায়মণি গ্রামে নিজ বাড়িতে দাফন করা হয় তাদের। এদিকে ময়মনসিংহ শহরের চরপাড়া এলাকায় লাবিব প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে দুর্ঘটনার সময় ভূমিষ্ঠ হওয়া শিশুটি। তার হাত ভেঙে গেলেও এখন আশঙ্কামুক্ত বলে জানিয়েছেন চিকিৎসক।

গতকাল সরেজমিনে ত্রিশালের রায়মণি ফকির বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, ঘরের পেছনে একসঙ্গে তিনটি নতুন কবর। কবরে শায়িত আছেন দিনমজুর জাহাঙ্গীর আলম, তার স্ত্রী রত্না ও মেয়ে সানজিদা। একসঙ্গে তিন জনকে হারিয়ে তাদের কবরের পাশে বসে অনবরত কাঁদছেন জাহাঙ্গীরের মা সুফিয়া আক্তারসহ স্বজনরা। এ ঘটনায় পুরো রায়মণি গ্রামে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। কবর দেখতে ও ঐ পরিবারকে সান্ত¾না দিতে ফকির বাড়িতে ছুটে আসছেন শত শত মানুষ। নিহত জাহাঙ্গীরের বাবা মোস্তাফিজুর রহমান বাবলু ও মা সুফিয়া আক্তার দুই জনই শারীরিক প্রতিবন্ধী। তারা জানান, জায়গা না থাকায় বাড়ির উঠানেই বানিয়েছেন কবরস্থান। থাকার ঘরটিও ভাঙা, টিন আর মাটির তৈরি। দরিদ্র পরিবারে জাহাঙ্গীরই ছিলেন উপার্জনক্ষম একমাত্র ব্যক্তি। তাকেসহ তিন জনকে একসঙ্গে হারিয়ে আরো অসহায় হয়ে পড়েছে পরিবারটি।

এদিকে শোকাচ্ছন্ন বাড়িটিতে এখন আলোচনায় দুর্ঘটনার পর জন্ম নেওয়া নবজাতকটি। মৃত মায়ের গর্ভ চিরে জন্ম নেওয়া শিশুকন্যাকে এক নজর দেখতে ব্যাকুল সবাই। নবজাতকের বড় বোন জান্নাত আক্তার (১০) জানায়, ‘মোবাইলে আমার বোনের ছবি দেখেছি। আমরা তার জন্য অপেক্ষা করছি। সে বাড়িতে আসলে আমি তাকে খুব আদর করব। দাদা-দাদি ও আমি মিলে তাকে লালনপালন করব।’ কথা বলার সময় চোখ বেয়ে পানি পড়ছিল তার। নিহত জাহাঙ্গীরের বাবা মোস্তাফিজুর রহমান জানান, জাহাঙ্গীর আকিজ গ্রুপের কারখানায় শ্রমিকের কাজ করতেন। অভাব-অনটনে চলত তার সংসার। জাহাঙ্গীর মারা যাওয়ার পর তার নবজাতক সন্তান ছাড়াও আরো দুই সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন। তবে উদ্বিগ্ন হলেও দুর্ঘটনার সময় জন্ম নেওয়া শিশুটিকে তারা নিজেরাই লালনপালন করবেন।

গত শনিবার বিকাল আড়াইটার দিকে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ত্রিশালের কোর্টভবন এলাকায় রাস্তা পার হওয়ার সময় ট্রাকচাপায় প্রাণ হারান স্বামী ও মেয়েসহ অন্তঃসত্ত্বা রত্না বেগম। এ সময় তার পেট চিড়ে ভূমিষ্ঠ হয় ফুটফুটে এক সুসহ নবজাতক। পরে তাকে উদ্ধার করে পরীক্ষানিরীক্ষার জন্য ময়মনসিংহ সদরের সিবিএমসি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে এক্সরে রিপোর্টে জানা যায়, তার ডান হাতের দুটি হাড় ভেঙে গেছে। বর্তমানে শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. কামরুজ্জামানের তত্ত্বাবধানে লাবীব হাসপাতালে চিকিত্সাধীন রয়েছে। শিশুটি বিপদমুক্ত রয়েছে জানিয়ে এই চিকিৎসক বলেন, ‘শিশুটির সামগ্রিক অবস্থা আমরা পর্যবেক্ষণ করেছি। সে ভালো আছে এবং আশঙ্কামুক্ত। যেহেতু তার মা নেই, সেহেতু তাকে ফর্মুলা দুধ খাওয়ানো হচ্ছে। আশা করছি তার কোনো ধরনের সমস্যা হবে না।’ এদিকে শিশুটির ভরণপোষণের দায়িত্ব নিয়েছেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ এনামুল হক। শনিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে হাসপাতালে শিশুকে দেখতে যান তিনি। বিষয়টি নিশ্চিত করে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘আমি ঐ শিশুকে দেখতে হাসপাতালে গিয়েছিলাম। সেখানে গিয়ে শিশুটির চিকিৎসা খরচসহ ভবিষ্যতে যেন কোনো সমস্যা না হয় সেজন্য তার নামে একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট করে দেব বলেছি।’

ত্রিশাল থানার ওসি মাইন উদ্দিন জানান, ঘাতক ট্রাকটিকে আটক করা হলেও ট্রাকের চালক পলাতক রয়েছে। তাকে ধরতে অভিযান চলছে।