ভূমিহীনতা বাংলাদেশের একটি ঐতিহাসিক ও দীর্ঘস্থায়ী ভূ-সামাজিক সমস্যা। কৃষিপ্রধান এ দেশে ভূমিহীন মানুষের জীবনালেখ্য অতি করুণ ও মর্মস্পর্শী। ভূমিহীন জনগোষ্ঠীর স্বল্পসংখ্যক লোক বর্গাচাষি হিসেবে এবং কিছু লোক আজকাল অকৃষি পেশায়, যেমন—রিকশা, ভ্যান, অটোরিকশা, সিএনজি ইত্যাদি যানবাহন চালিয়ে, কেউ কেউ কুটিরশিল্প, গার্মেন্টস বা অন্যান্য শিল্পকারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করে জীবন নির্বাহ করে। তবে দিনমজুর বা রোজ কামলা হিসেবেই তাদের বেশির ভাগকে জীবিকা নির্বাহ করতে হয়। তবে এভাবে আর কতদিন! কোনো দিন খেয়ে, কোনো দিন না খেয়ে, কত জনকে যে বলতে গেলে, বিনা চিকিৎসায়, ধুঁকে ধুঁকে তাদের মৃত্যু পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়, এর হিসাব কেউ রাখে না। যৎসামান্য লোকের বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা সরকারিভাবে মিললেও তা যেন সাগরসম সমস্যার বিন্দুবৎ সমাধান।
ভূমিহীন সমস্যার মূলে যেমন রয়েছে দেশের ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত ও প্রাকৃতিক বিপৎসংকুলতা তেমনি রয়েছে আর্থসামাজিক শোষণ ও বিষমতা, যুগপরম্পরায় ভূস্বামীদের অনুকূলে পক্ষপাতদুষ্ট কালাকানুন, গরিব চাষিদের প্রতি সরকারি আনুকূল্যের অভাব, কৃষি উপকরণ ও কৃষিপণ্যের বাজারব্যবস্থা এবং সর্বোপরি ভূমিহীন ও স্বল্প ভূমিমালিক চাষিদের ঘিরে বিদ্যমান দারিদ্রের বিষচক্র। প্রাচীন বাংলায় আদিম জনগোষ্ঠী প্রথম দিকে গাঙ্গেয় উপত্যকায় এবং অন্যান্য নদনদী-তীরবর্তী গভীর অরণ্যে বসবাস করত। পরবর্তীকালে অনেকেই কৃষিকাজে আকৃষ্ট হয় এবং স্থায়ীভাবে কৃষিতে নিয়োজিত হয়। বাকিরা জঙ্গলে বন্য জীবন, পশু শিকার এবং জলাভূমিতে মৎস্য শিকার প্রভৃতি পেশায় নিয়োজিত হয়। আনুমানিক খ্িরষ্টপূর্ব ১৫০০ অব্দে আর্য জনগোষ্ঠী উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত পথে ভারতে প্রবেশ করে। বহিরাগত আর্যদের সঙ্গে স্থানীয় দ্রাবিড় জনগোষ্ঠীর ব্যাপক সংঘর্ষ ঘটে। আর্যদের সঙ্গে যুদ্ধে না পেরে দ্রাবিড় জনগোষ্ঠী পূর্ব দিকে পালাতে পালাতে সর্বশেষে বাংলায় স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করে। বাংলায়ও তারা তাদের পূর্বতন কৃষি পেশায় নিয়োজিত হয়।
পরবর্তীকালে আর্যরা বাংলায় আধিপত্য স্থাপন করে রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে। বাংলার অনার্য জনগোষ্ঠী আর্যশাসিত বাংলায় বর্ণভেদ প্রথায় সমাজে অন্তর্ভুক্ত হয়। আর্য সমাজব্যবস্থায় কৃষক বৈশ্যের মর্যাদা পায়, কৃষিশ্রমিক শূদ্রের মর্যাদা পায়। কৃষি সম্প্রসারণের জন্য নির্বনীকরণ শুরু হলে জঙ্গলবাসী আদিম জনগোষ্ঠীর সঙ্গে আর্যদের সংঘাত সৃষ্টি হয়। এ অসম যুদ্ধে আদিবাসীরা পরাজিত হয়। জঙ্গল থেকে আগত এ জনগোষ্ঠী অস্পৃশ্য বা অসৎ শূদ্র হিসেবে আর্য সমাজে গৃহীত হয় এবং সমাজে নিম্ন পেশার অকৃষি কাজে তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেওয়া হয়। মুচি, চামার, মেথর, জেলে, ডোম, ধোপা ইত্যাদি শ্রেণির এভাবেই উদ্ভব বলে অনেকের ধারণা। কৃষিজীবী না হওয়ায় তারা প্রায় সবাই ভূমিহীন ছিল। সমাজের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনের জন্য পরবর্তীকালে বাংলায় বিবিধ কুটিরশিল্প স্থাপিত হয়। তাছাড়া সমাজের সেবামূলক কাজের প্রয়োজনেও বেশ কিছু পেশার সৃষ্টি হয়। এভাবে কাঁসার (লৌহকার), কুম্ভকার (মৃৎপাত্র র্নিমাতা), তাম্বুসী (পানসুপারি ব্যবসায়ী), তন্তুবায় (বস্ত্র বয়নকারী), মালি (পুষ্প ও মালা ব্যবসায়ী), শীল (নাপিত), বারুই (পান ব্যবসায়ী), সূত্রধর (কাঠমিস্ত্রি) প্রভৃতি পেশাজীবী শ্রেণির উদ্ভব ঘটে।
মুসলিম শাসনামলে ‘পাইকাস্ত’ শ্রেণির একদল কৃষক ছিল যারা অন্যের জমি চাষ করত। এরা ভবঘুরে ভূমিহীন কৃষিশ্রমিক ছিল। মোগল আমলের দলিলেও এদের তথ্য পাওয়া যায়। মোগল আমলেও এ দেশে মহাজনি দাদন ব্যবসা ছিল। মহাজনি সুদের দায়ে কৃষক সর্বস্বান্ত হয়েছে, এমন নজিরও পাওয়া যায়। ব্রিটিশ আমলে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রথায় জমির খাজনা বৃদ্ধি পায়, জমিদার ও তাদের নায়েব, গোমস্তা ও লাঠিয়ালদের জোরজবরদস্তিমূলক খাজনা ও অবৈধ আবওয়াব আদায়ের মাত্রাতিরিক্ত চাপে পড়ে চাষি-রায়ত মহাজনের কাছে জমিজমা বন্ধক রেখে চড়া সুদে অর্থ লগ্নি করে খাজনা পরিশোধ করে। চক্রবৃদ্ধি হারে সুদের দেনা মেটাতে গিয়ে বিপুলসংখ্যক চাষিরায়ত জমিজমা বিক্রি করতে বাধ্য হয় এবং ভূমিহীনে পরিণত হয়। ১৯৩১ খৃষ্টাব্দে বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যা ছিল ৫ কোটি। তন্মধ্যে কৃষকের সংখ্যা ছিল ৯০ লাখ ৭৯ হাজার ১৮৯ জন। কৃষকের মধ্যে ৬২ লাখ ৪ হাজার ৩৮৫ জনের নিজস্ব জমি ছিল। বাকি ২৮ লাখ ৭৪ হাজার ৮০৪ জন (৩১ দশমিক ৬৬ শতাংশ) ছিল ভূমিহীন কৃষিশ্রমিক। ১৯৮১ খ্িরষ্টাব্দের সেন্সাস রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলায় মোট কৃষিশ্রমিক বা খেতমজুরের সংখ্যা ছিল ৬৩ লাখ ৩৭ হাজার ২০০ জন। এই বিশাল কৃষক সমাজ ছিল ভূমিহীন।
ব্রিটিশ আমলে বাংলায় দু-দুটি মহাদুর্ভিক্ষ সংঘটিত হয়। ১৭৭০ খৃষ্টাব্দের মহাদুর্ভিক্ষে বাংলার দুর্ভিক্ষপীড়িত এলাকার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ লোক মৃত্যুবরণ করে। পেটের দায়ে বহু ভূমি মালিক জমিজমা বিক্রি করে ভূমিহীনে পরিণত হন। ১৯৪৩ খ্িরষ্টাব্দের মহাদুর্ভিক্ষে প্রায় ৩০ লাখ লোক মৃত্যুবরণ করে। এ সময়ও প্রাণে বেঁচে থাকার তাগিদে সম্পন্ন কৃষক পর্যন্ত তাদের জমিজমা বিক্রি করে ভূমিহীনে পরিণত হন। পাকিস্তান আমলে ১৯৫০ খ্িরষ্টাব্দের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের আওতায় জমিদারি ও অন্য সব ধরনের মধ্যস্থ বাতিল করে রায়ত-প্রজাকে তাদের দখলাধীন জমির মালিকানা দেওয়া হয় কিন্তু বর্গাদার কৃষককে তাদের বর্গাধীন জমির মালিকানা থেকে বঞ্চিত করা হয়। এভাবে বাংলার বর্গাচাষি শ্রেণি স্থায়ী ভূমিহীন শ্রেণিতে পরিণত হয়।
ভূমিহীন কৃষকদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে জমিদারদের অরক্ষণীয় জমি সরকারি খাস দখলে আনয়ন করে এগুলোসহ সব খাসজমি ভূমিহীনদের মধ্যে বিতরণ করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। কিন্তু বাস্তবে আইন প্রয়োগে শৈথিল্য, জমিদারি অধিগ্রহণ নিয়ে মামলা-মোকদ্দমায় দীর্ঘসূত্রিতার সুযোগে জমিদারদের অরক্ষণীয় সম্পত্তি বেহাত, অরক্ষণীয় ও খাসজমি উদ্ধারে রাষ্ট্রযন্ত্রের সীমাহীন অনীহা ও অবহেলা এবং ভূমিহীনদের মধ্যে খাসজমি বিতরণে সরকারের সদিচ্ছা ও দক্ষতার অভাব ইত্যাদি নানা কারণে অতি স্বল্পসংখ্যক ভূমিহীন খাসজমি বরাদ্দ পায়। ২০০৮ সালের কৃষি শুমারি মতে, দেশের মোট ২ কোটি ৮৬ লাখ ৯৫ হাজার ৭৬৩টি পরিবারের মধ্যে ৩৬ লাখ ৮২ হাজার ৬৯৪টি (১২ দশমিক ৮৩ শতাংশ) পরিবারের একেবারেই ভূমি নেই, ৪৫ লাখ ৫১ হাজার ৯৯১টি (১৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ) পরিবারের ০.০১-০.০৪ একর পর্যন্ত, ১ কোটি ৭ লাখ ১৬ হাজার ৪৮৬টি (৩৭ দশমিক ৩৪ শতাংশ) পরিবারের ০.০৫-০.৪৯ একর পর্যন্ত ভূমির মালিকানা রয়েছে।
ভূমিহীনতার অন্য এক কারণ নদীভাঙন। নদীতীরবর্তী বাড়িঘর, জমিজমা নদীভাঙনে সবই হারিয়ে মানুষ ভূমিহীনে পরিণত হয়। নদীভাঙন পীড়িত এসব লোকজনের পুনর্বাসনের জন্য কার্যকরী কোনো সরকারি ব্যবস্থা বা উদ্যোগ নেই বললেই চলে। এমনকি নদীভাঙন রোধে সরকারি ব্যবস্হাও অপ্রতুল, অস্বচ্ছ ও অকার্যকর।
এসব পরিবারের লোকজনের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাই তাদের মানবেতর জীবন যাপন হতে রক্ষা করতে পারে। তাছাড়া নিষ্কণ্টক খাসজমি বরাদ্দ দিয়ে তাদের পুনর্বাসন করাও একটা উপায়। সরকার খাসজমি ভূমিহীনদের মধ্যে বিতরণের জন্য বিগত শতাব্দীর আশির দশক থেকে নিয়মিতভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। উল্লেখযোগ্য পরিমাণ খাস কৃষিজমি ভূমিহীনদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। তবে অনেক ভূমিহীন জমি বরাদ্দ পেলেও জমির দখলে যেতে পারেনি বলে অনেকে দাবি করেন। অনেক পরিবারকে আশ্রয়ণ ও আদর্শ গ্রাম প্রকল্পের আওতায় পুনর্বাসিত করা হয়েছে। সরকারের এটি একটি মহতী উদ্যোগ। কিন্তু এদের এতে আবাসনের ব্যবস্থা হলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে কাছাকাছি কর্মসংস্থান ও জীবিকা অর্জনের উপায় না থাকায় আবাসন ত্যাগ করে কিছু বাসিন্দার অন্যত্র চলে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এসব সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে ভূমিহীন জনগোষ্ঠীকে দখলসহ খাসজমি বরাদ্দ প্রদান, আবাসন, কর্মসংস্থান, কুটিরশিল্প স্থাপন, ভূমিহীনদের দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি, মৎস্য ও পশুপালন সংক্রান্ত আর্থিক সহায়তা প্রদান, কার্যকর সমবায়ভিত্তিক কর্মসূচিসহ এদের প্রকৃত অর্থে পুনর্বাসনের জন্য সার্বিক সমন্বিত কর্মসূচি গ্রহণ ও সুষ্ঠু তদারকির মাধ্যমে তা বাস্তবায়ন করা আবশ্যক।
হ লেখক :সরকারের সাবেক অতিরিক্ত সচিব