ত্রিশালের সেই সড়কে ২০ বছরে আট স্বজন হারিয়েছে শিশুটি

বাড়ির আঙিনায় নতুন তিনটি কবর। কবরগুলো বৃদ্ধা সুফিয়া বেগমের একমাত্র ছেলে জাহাঙ্গীর আলম (৪০), অন্তঃসত্ত্বা পুত্রবধূ রত্না বেগম (৩০) ও নাতনি সানজিদার (৬)। দুদিন ধরে কবরের পাশে বসেই বিলাপ করছেন তিনি। পাশেই বসে আছে বাবা, মা ও বোন হারানো অপর দুই সন্তান এবাদত মিয়া (৮) ও জান্নাত আক্তার (১০)। ঘটনায় স্তব্ধ এলাকাবাসী। কারোর মুখেই কোনো কথা নেই। গতকাল রবিবার ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার রায়মণি এলাকায় ট্রাকচাপায় স্ত্রী-সন্তানসহ নিহত জাহাঙ্গীরের বাড়িতে গিয়ে এমন চিত্রই দেখা গেছে।

গত শনিবার বিকেল আড়াইটার দিকে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ত্রিশালের কোর্টভবন এলাকায় রাস্তা পার হওয়ার সময় ট্রাকচাপায় প্রাণ হারান স্বামী ও মেয়েসহ অন্তঃসত্ত্বা রত্না বেগম। এ সময় তার পেট চিরে ভূমিষ্ঠ হয় ফুটফুটে এক সুস্থ নবজাতক। শিশুটি বর্তমানে সুস্থ আছে। জানা গেছে, গত ২০ বছরে একই সড়কে দুর্ঘটনায় নিহত জাহাঙ্গীর আলমসহ তার পরিবারের আট জনের প্রাণ গেছে।

নিহত জাহাঙ্গীরের বাবা মোস্তাফিজুর রহমান বাবলু বলেন, ‘ঐ সড়কে আমার দুই ছেলে, নাতনি, পুত্রবধূ, আমার এক ভাই ও তিন মামাসহ মোট আট জন মারা গেছে।’ জাহাঙ্গীর আলমের ফুপু হেলেনা বেগম আক্তার বলেন, ‘আমাদের পরিবারের আট সদস্যের মৃত্যু হলেও আজ পর্যন্ত কোনো বিচার পেলাম না। সঠিক বিচার পেলে হয়তো বারবার এমন ঘটনা ঘটত না। এবারের ঘটনায় আমরা দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি চাই।’  

নিহত জাহাঙ্গীরের বোন মমতাজ আক্তার বলেন, ‘আমার ভাবি ১০ মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। ঈদের আগেই সন্তান জন্মের কথা ছিল। তবে হয়নি। কোনো সমস্যা হয়েছে কি না জানার জন্য ত্রিশালে আলট্রাসনোগ্রাফি করাতে গিয়েছিলেন। কিন্তু ট্রাকচাপায় ভাতিজি আর ভাই-ভাবির মৃত্যু হয়। অবুঝ শিশুগুলোকে যে এতিম করেছে তার কঠিন বিচার চাই।’

জাহাঙ্গীরের বাবা মোস্তাফিজুর রহমান বাবলু বলেন, ‘আমার একমাত্র ছেলে ছিল জাহাঙ্গীর। ঐ নবজাতকসহ জাহাঙ্গীরের তিন ছেলেমেয়ে জীবিত রয়েছে। ছেলেটা কিছুটা বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী। আমি গরিব মানুষ, ছোট একটা চায়ের দোকান করে আমার সংসার চলে। ঐ তিন সন্তানকে কীভাবে লালন পালন করব বুঝতে পারছি না। সরকার যদি আমাকে সহায়তা না করে, তাহলে ওদের নিয়ে বেঁচে থাকাটা আমার জন্য কঠিন।’

হাইকোর্টে রিট : ট্রাকচাপায় নিহত গর্ভবতী মায়ের পেট ফেটে জন্ম নেওয়া শিশুর বিষয়ে তদন্ত চেয়ে রিট করা হয়েছে। একই সঙ্গে দুর্ঘটনায় শিশুটির মা-বাবা এবং বোন নিহত হওয়ার ঘটনায় তদন্ত চাওয়া হয়েছে। এছাড়া শিশুটির প্রাপ্তবয়স হওয়া পর্যন্ত তার লালনপালনের খরচ সরকারের কাছে চাওয়া হয়েছে। গতকাল সোমবার হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় এ রিট করেন ব্যারিস্টার মাহাসিব হোসেন। রিটে দুর্ঘটনার বিষয়ে তদন্ত ও সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে কী সহযোগিতা করা যায়, তা জানতে চাওয়া হয়েছে। এতে বিবাদী করা হয়েছে নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়, বিআরটিএ এবং যে ট্রাকের চাপায় এ ঘটনাটি ঘটেছে তার মালিককে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন রিটকারী আইনজীবী।

মামলা, আপস-প্রস্তাব ট্রাকমালিকের : ট্রাকচাপায় এক পরিবারের তিন জন নিহতের ঘটনায় মামলা হয়েছে। অন্যদিকে ভুক্তভোগীর পরিবারকে আপস-মীমাংসার প্রস্তাব দিয়েছেন ঘাতক ট্রাকটির মালিক। রবিবার দিবাগত রাতে নিহতের বাবা মোস্তাফিজুর রহমান বাবলু বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে ত্রিশাল থানায় মামলা করেন। ত্রিশাল থানার এসআই সেকান্দার আলী বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এ বিষয়ে ত্রিশাল থানার ওসি মাইন উদ্দিন জানান, ঘটনাস্থলেই তিন জন নিহতের ঘটনায় ঘাতক ট্রাকটি আটক করা হলেও ট্রাকের চালক পলাতক রয়েছে। তিনি আরো জানান, শিশুটি সুস্থ আছে। ট্রাকের চালককে ধরতে অভিযান চলছে।

মামলার বাদী বলেন, ‘ট্রাকে থাকা নম্বরে আমার ভাতিজা শিপন কল দেয়। পরে ট্রাকমালিক মামলা না করে আপসের প্রস্তাব দেন। কিন্তু দুদিন পার হলেও তিনি আসেননি। পরে আমি থানায় মামলা করি। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঐ ট্রাকমালিকের নাম মঞ্জুর রহমান। তিনি রাজশাহীর বাঘা থানার মৃত মোনতাজ আলীর ছেলে।’ মঞ্জুর রহমান বলেন, ‘আমাকে ফোন দিলে আমি আপস-মীমাংসার প্রস্তাব দিই। কিন্তু অসুস্থতার জন্য আমি যেতে পারিনি। মীমাংসা বলতে মানুষ তো আর ফিরিয়ে দেওয়া যাবে না। তিনটা সন্তান আছে, তাদের জন্য কিছু ব্যবস্থা করে দিতে চাই।’