স্টেভিয়া মানুষের দেহের অগ্ন্যাশয় থেকে ইনসুলিন নিঃসারণে সহায়তা করে এবং ব্লাডসুগার নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে স্টেভিয়া হাইপারটেনশন রোগীদেরকেও উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধ করে। শুধু তা-ই নয়, শরীরের সুস্থতা এবং সচেতনতাবোধ সৃষ্টিসহ উদ্দীপক, ক্লান্তিনাশক হিসেবে স্টেভিয়ার ব্যবহার অদ্বিতীয় স্টেভিয়া একটি জাদুকরী ভেষজ উদ্ভিদ। ইদানীং ডায়াবেটিক রোগীদের কাছে এই গাছটি ভীষণ আগ্রহের সৃষ্টি করেছে। এই আগ্রহ সৃষ্টির মূলে রয়েছে এর মিষ্টতা। স্টেভিয়া গাছের এক কেজি পাতা বিক্রি হয় প্রায় হাজার টাকায়। এই গাছের পাতার মিষ্টি উপাদানে চিনির চেয়ে ২৫০-৩০০ গুণ বেশি।
স্টেভিয়া গাছের পাতার শুকনো সবুজ পাউডার, যা চিনির চেয়ে ২৫-৩০ গুণ বেশি মিষ্টি। স্টেভিও সাইড গ্লাইকো সাইডে ক্যালরি না থাকার কারণে ডায়াবেটিক রোগে এটি বেশি কার্যকর। স্টেভিয়া মূলত প্যারাগুয়ের পাহাড়ি অঞ্চলে শত শত বছর ধরে চাষাবাদ করা হতো। তবে সেখানে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে স্টেভিয়ার চাষ শুরু হয় ১৯৬৮ সালের দিকে। তারপর ব্রাজিল, চীন, কোরিয়া, কানাডা, আমেরিকা এবং ইংল্যান্ডে ফসল হিসেবে গাছটির চাষ প্রতিষ্ঠালাভ করে। বর্তমানে চীনে ব্যাপকভাবে স্টেভিয়ার চাষ হয়ে থাকলেও বাণিজ্যিক ব্যবহারের দিক দিয়ে জাপান অনেক এগিয়ে গেছে। জাপানে প্রায় ৪০ শতাংশ চিনির চাহিদা মেটানো হয়ে থাকে স্টেভিয়া দিয়ে। আমাদের জন্য অত্যন্ত সুখবর হলো—স্টেভিয়া পার্শ্ববর্তী দেশসহ বর্তমানে আমাদের দেশেও দিন দিন ব্যাপক পরিচিতি লাভ করছে।
মহান সৃষ্টিকর্তার অলৌকিক সৃষ্টি রহস্য অস্বাভাবিক মিষ্টি এবং ভেষজগুণসম্পন্ন এই স্টেভিয়া গাছটির উদ্ভিদতাত্ত্বিক সংক্ষিপ্ত পরিচিতি হলো—স্টেভিয়া কম্পোজিট ফ্যামিলির অন্তভুর্ক্ত বহু বর্ষজীবী গুল্মজাতীয় একটি ভেষজ উদ্ভিদ। স্টেভিয়া সর্বোচ্চ ৬০-৭০ সেন্টিমিটার উচ্চতাবিশিষ্ট হয়ে থাকে। সবুজ রঙের পাতাগুলো কাণ্ডের বিপরীতমুখী বিন্যাসে থাকে এবং পাতার কিনারা খাঁজকাটা ও বর্শাকৃতির। উদ্ভিদটি অনেকটাই স্টার ফুল গাছের মতো। এর ফুল ছোট এবং সাদা রঙের হয়। এই গাছের ফুল কীটপতঙ্গের দ্বারা পরাগায়িত হয়ে থাকে। বীজ এন্ডোস্পারম যুক্ত ক্ষুদ্রাকৃতির। স্টেভিয়া গাছ সাধারণত রোদ পছন্দ করে এবং ছোট দিনের উদ্ভিদ। তবে রোদ পছন্দের হলেও দিনের ১৩ ঘণ্টার বেশি অপছন্দনীয়। স্টেভিয়া গাছটির সবুজ পাতাই মূলত কার্যকরী মিষ্টি উপাদানের প্রধান উৎস। আমাদের দেশের জলবায়ু এবং মাটি স্টেভিয়া চাষের জন্য উপযোগী বলে জানিয়েছেন দেশে কৃষিবিজ্ঞানীরা। জৈব সারযুক্ত এবং সাধারণত ১৫-৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা স্টেভিয়া চাষের জন্য খুবই উপযোগী। এ কারণে আমাদের দেশের মাঠফসল হিসেবে সারা বছরই চাষ করা যায়। বাড়ির বারান্দায় রোদযুক্ত স্থানে কিংবা বাড়ির ছাদে পাঁচ-ছয় ইঞ্চি টবে অথবা পলিথিনে চারা রোপণের মাধ্যমে স্টেভিয়া চাষ ইতিমধ্যে আমাদের দেশে ব্যাপকতা লাভ করেছে। মাঠ ফসল হিসেবে স্টেভিয়ার চাষ এত লাভজনক যে, একজন চাষি প্রতি বছর বিঘাপ্রতি কয়েক লাখ টাকা অনায়াসে আয় করতে পারেন। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে গাছটি চাষ করে ইতিমধ্যে একরপ্রতি ২ দশমিক ২ থেকে ২ দশমিক ৫ লাখ রুপি মুনাফা অর্জন করছে।
আমাদের দেশেও সংশ্লিষ্ট কৃষিবিজ্ঞানীরা বাণিজ্যিক ভিত্তিতে গাছটির চাষাবাদ নিয়ে মাঠ পর্যায়ে গবেষণা কার্যক্রম চালালে কৃষক পর্যায়ে আরো ব্যাপকতা লাভ করতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত আমাদের দেশে ব্যাপক হারে স্টেভিয়া চাষের জন্য বীজ একটি বড় সমস্যা। বীজ সমস্যার কারণে আমাদের দেশে গাছটি আপাতত টিস্যু কালচারের মাধ্যমে ব্যাপকতা লাভ করছে। ইক্ষু গবেষণা কেন্দ্র ঈশ্বরদী এবং ব্র্যাক টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি, গাজীপুর এ ব্যাপারে আগ্রহী ভূমিকা পালন করে আসছে। দেশে এখন পলিথিনে অথবা টবে করে স্টেভিয়ার চারা বিক্রি হচ্ছে। এ ব্যাপারে দেশের কিছু কিছু মানুষ জানতে পেরে স্টেভিয়া চাষের উদ্যোগ নিচ্ছেন। তারা স্টেভিয়ার চারা সংগ্রহের জন্য তৎপর হচ্ছেন। তাছাড়া যাদের ডায়াবেটিস অথবা ব্লাডপ্রেশার আছে, তারা নিজ বসতবাড়িতে মাত্র দু-একটি টবে বহুবর্ষী এ গাছ যত্ন সহকারে চাষ করলে পরিবারে চিনির চাহিদা পূরণ করা কোনো ব্যাপারই নয়। প্রতি ১ কেজি খাবার মিষ্টিকরণের জন্য মাত্র ৭ দশমিক ৯ মিলিগ্রাম স্টেভিয়া যথেষ্ট। এক গ্লাস পানিতে একটি-দুইটি কাঁচাপাতার রস মিশিয়ে দিলেও অনেক মিষ্টি পাওয়া যায়। তাই শরবত, চা, কফি, সেমাই এবং অন্যান্য পানীয় দ্রব্যে ব্যবহার করা যেতে পারে। স্টেভিয়ার পাতা গুঁড়া করে পাউডার, ট্যাবলেট কিংবা তরল প্যাকেটে বাজারজাত করা যেতে পারে।
উল্লেখ্য, এক কেজি কাঁচা পাতা শুকিয়ে প্রায় ২০০-৩০০ গ্রাম পাউডার পাওয়া যেতে পারে। এসব তরল কিংবা পাউডার অথবা স্টেভিয়া থেকে উৎপাদিত চিনি পাউরুটি এবং বিস্কুট তৈরির কারখানাগুলোতে ডায়াবেটিকস, ব্লাডপ্রেশার রোগীদের জন্য বিশেষ রুটি এবং বিস্কুট তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ এবং লাভজনক ভূমিকা পালন করতে পারে। বাংলাদেশে ডায়াবেটিকস এবং ব্লাডপ্রেশারের রোগীর সংখ্যা দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। যে হারে এসব রোগী বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাতে দেশে স্টেভিয়ার চাষ খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
দেশে সরকারের বিশেষ উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগে স্টেভিয়া চাষের উদ্যোগ নেওয়া হয়, তাহলে দেশের কৃষি বিভাগে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে। এতে যেমন স্টেভিয়াচাষিরা লাভবান হবেন, তেমনি দেশের রাজস্ব আয়ও বৃদ্ধি পাবে। তাছাড়া যারা হোমিও, সাধনা, আয়ুর্বেদিক এবং কবিরাজিসহ ভেষজ গাছগাছড়া নিয়ে গবেষণা করেন, তারাও স্টেভিয়া থেকে ব্যাপকভাবে লাভবান হতে পারেন। স্টেভিয়ার বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো—এর মিষ্টতায় কোনো ক্যালরি কিংবা কার্বোহাইড্রেট নেই, যা নাকি মানবদেহের অনেক কল্যাণ সাধন করে থাকে। স্টেভিয়া মানুষের দেহের অগ্ন্যাশয় থেকে ইনসুলিন নিঃসারণে সহায়তা করে এবং ব্লাডসুগার নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে স্টেভিয়া হাইপারটেনশন রোগীদেরকেও উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধ করে। শুধু তা-ই নয়, শরীরের সুস্থতা এবং সচেতনতাবোধ সৃষ্টিসহ উদ্দীপক, ক্লান্তিনাশক হিসেবে স্টেভিয়ার ব্যবহার অদ্বিতীয়।
তাছাড়া দাঁতে ব্যাকটেরিয়াজনিত ও ক্ষয়রোধে যেমন অ্যান্টিবায়োটিক হিসেবে কাজ করে, তেমনি পাকস্থলীতে হজমে সহায়তা করে। যকৃত, অগ্ন্যাশয় ও প্লীহায় পুষ্টি সরবরাহ করে এবং ত্বকের রোগ নিরাময় করে। স্টেভিয়ার মতো এমন একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভিদের চাষাবাদ বৃদ্ধি করা জরুরি হয়ে পড়েছে। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ব্যাপকভাবে স্টেভিয়ার চাষ করার লক্ষ্যে বিশেষ উদ্যোগ নিতে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। স্টেভিয়া চাষের ব্যাপারে আগ্রহী চাষিদের সার্বিক সহযোগিতা করতে হবে। তবেই এ দেশে স্টেভিয়ার চাষ সফল হবে।
লেখক : প্রাবন্ধিক