সনাতন পদ্ধতিতে পেঁয়াজ সংরক্ষণ

পাবনার সুজানগরে এবারে পেঁয়াজের বাম্পার ফলন হয়েছে। কিন্তু আধুনিক সংরক্ষনাগার না থাকায় বিপাকে পড়েছেন এ অঞ্চলের পেঁয়াজ চাষিরা। বর্তমানে তারা সনাতন পদ্ধতিতে পেঁয়াজ সংরক্ষণ করলেও যে পরিমান পেঁয়াজ নষ্ট হচ্ছে তাতে মুল খরচ পাওয়ায় শঙ্কা রয়েছে তাদের মধ্যে। ঘরের চাতাল আর বাঁশের চাটাই বানিয়ে পেঁয়াজ সংরক্ষণ করা হচ্ছে।   

উপজেলার দুর্গাপুর গ্রামের পেঁয়াজ চাষি কামরুজ্জামান ও তার ভাই চলতি মৌসুমে প্রায় ৮২ বিঘা জমিতে পেঁয়াজ চাষ করেছেন। ফলনও পেয়েছেন বেশ ভালো। তারা ঘরে তুলেছিলেন প্রায় ৫ হাজার মণ পেঁয়াজ। পেঁয়াজ কাটার পর ৫০০ থেকে ৬০০ মণ পেঁয়াজ বিক্রি করেন তারা। আরও প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ মণ পেঁয়াজ নষ্ট হয়ে যায়। এই ২ ভাই ঘরে সংরক্ষণ করেছেন প্রায় সাড়ে ৩ হাজার মণ পেঁয়াজ। আশা ছিল আগামি কার্তিক মাস পর্যন্ত চাহিদা অনুযায়ী পেঁয়াজ বিক্রি করবেন তারা। তবে, প্রতি মাসে তাদের প্রায় ১০ কেজির বেশি পেঁয়াজ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে শেষ পর্যন্ত উৎপাদন খরচও তুলতে পারবেন না বলে আশঙ্কা তাদের।  

ওই গ্রামের কৃষক চাঁদ আলীর একই অবস্থা। তিনি প্রায় ১ হাজার মণ পেঁয়াজ ঘরে তুলেছেন। মৌসুমের শুরুতে দাম ভালো না পাওয়ায় পুরো পেঁয়াজ সংরক্ষণ করে এখন আরও বিপাকে পড়েছে চাঁদ আলী। ইতোমধ্যে তার প্রায় ৩০০ মণ পেঁয়াজ নষ্ট হয়ে গেছে। অতিরিক্ত গরমে পেঁয়াজ দ্রুত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বলে জানান তিনি। চাঁদ আলী বলেন, 'আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা না থাকায় প্রাচীন সনাতনি পদ্ধতির বাঁশের মাচাই আমাদের একমাত্র ভরসা।'

সুজানগর উপজেলার কয়েকটি স্থান ঘুরে দেখা যায়, গ্রামের প্রতিটি চাষীর ঘরেই রয়েছে পেঁয়াজ সংরক্ষণের প্রাচীন পদ্ধতির বাঁশের মাচার ঘর। বাঁশের চাটাইতেও পেঁয়াজ রাখা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে পেঁয়াজ উলটপালট করে দিতে হয়। 

সুজানগর উপজেলার পেঁয়াজ চাষি লিটন মন্ডল বলেন, 'এখন বাণিজ্যিকভাবে পেঁয়াজের চাষ বৃদ্ধি পেয়েছে, কিন্তু উৎপাদন বাড়লেও বিপুল পরিমাণ পেঁয়াজ সংরক্ষণের মতো পর্যাপ্ত সংরক্ষণাগার গড়ে তোলার স্থান ও অর্থের সংস্থান কৃষকের নেই।' তিনি আরও বলেন, 'আমরা প্রত্যেকেই নিজের বাড়ির আঙ্গিনায় আলাদা ঘর তুলে পেঁয়াজ সংরক্ষণ করছি। বাজারে কাঙ্খিত দাম পাওয়ার আশায় পেঁয়াজ সংরক্ষণ করলেও এ বছর মৌসুমের শুরু থেকেই পেঁয়াজ আমদানি শুরু হওয়ায় কৃষক কাঙ্খিত দাম পায়নি। তাই ঘরেই নষ্ট হচ্ছে পেঁয়াজ।' পেঁয়াজ আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে এবং দেশে উৎপাদিত পেঁয়াজের পচন রোধ করে কৃষকের স্বার্থে আধুনিক সংরক্ষণাগার গড়ে তোলার দাবি জানান তিনি।

বাংলাদেশ মসলা গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শৈলেন্দ্রনাথ মজুমদার বলেন, 'পেঁয়াজ উৎপাদনের পর ১০ শতাংশ লোকসান একটি স্বাভাবিক ব্যাপার। তবে পেঁয়াজ সংরক্ষণে কার্যকর ব্যবস্থা এখনো গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি।' মসলা গবেষণা কেন্দ্র একটি বিশেষায়িত কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণের কাজ হাতে নিয়েছে। এটি নির্মাণ করা হলে পেঁয়াজ সংরক্ষণ ব্যবস্থা নিয়ে গবেষণা ত্বরান্বিত হবে বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, 'কৃষক টিনের চালের নিচে একটি সিলিং দিয়ে পেঁয়াজের ঘরে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। এছাড়া, ৬ থেকে ৯ ইঞ্চির বেশি পুরু না করে পেঁয়াজ সংরক্ষণ করলে পর্যাপ্ত বাতাস পাবে ও এতে পেঁয়াজের পচন আরও কমানো যাবে।' 

সুজানগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রাফিউল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, 'দেশের সর্ববৃহৎ পেঁয়াজ উৎপাদনকারী অঞ্চল সুজানগরে রয়েছে প্রায় ৭ হাজারের বেশি প্রাচীন পদ্ধতির পেঁয়াজ সংরক্ষণাগার।' ২৫ থেকে ৪০ হাত লম্বা প্রায় ১০ ফুট উঁচু ঘরের ৭ ফুট উপরে বাঁশের তৈরি বিশেষ মাচা পদ্ধতি করে বাতাস প্রবেশের রাস্তা রেখে পেঁয়াজ সংরক্ষণ করছেন কৃষক। প্রতিটি খাঁচার ২ ফুট পর্যন্ত পুরু করে মাচায় পেঁয়াজ সংরক্ষণ করছেন কৃষক। এই পদ্ধতিতে পেঁয়াজ সংরক্ষণ করা গেলেও কমপক্ষে ২৫ শতাংশ পেঁয়াজ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বলে কৃসকরা তাদের জানিয়েছেন।