ঢাবিতে অবহেলায় বাড়ছে সেশনজট

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইম্যান অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের স্নাতকোত্তর প্রথম সেমিস্টারের পরীক্ষা শেষ হয় ৫ এপ্রিল। পরীক্ষা শেষ হওয়ার ছয় সপ্তাহের মধ্যে ফল প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু সেই ছয় সপ্তাহ পার হয়ে ১৩ সপ্তাহে গিয়ে ঠেকলেও ফল প্রকাশ করেনি বিভাগটি। সর্বশেষ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অফিস থেকে চিঠি ইস্যু করার আরো দুই সপ্তাহ পর গত ১৮ তারিখ প্রকাশ করা হয় ফলাফল। বিভাগটির মতো ঢিমেতালে চলছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সবগুলো বিভাগ। পরীক্ষার তারিখ না জানানো, ফল প্রকাশে বিলম্ব হওয়া, কোর্স শেষ করতে না পারার কারণে সহজেই শেষ হচ্ছে না বিশ্ববিদ্যালয়ের সেশনজটের। বিশ্ববিদ্যালয় ঊর্ধ্বতন কতৃ‌র্পক্ষ বারবার তাগিদ দিলেও বিভাগগুলোর অবহেলার কারণে লেগেই আছে সেশনজট।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অফিস সূত্রে জানা যায়, বিভাগগুলোর পরীক্ষা গ্রহণ, ফলাফল প্রকাশ, কোর্স শেষ করতে বিলম্ব করছে বিভাগগুলো। পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অফিস থেকে বারবার চাপ প্রয়োগ করেও পাওয়া যাচ্ছে না পরীক্ষার তারিখ ও ফল শিট। এর জন্য বারবার তাগিদ দেওয়া হচ্ছে বিভাগগুলোর চেয়ারম্যান ও পরীক্ষা কমিটিকে, ইস্যু করা হচ্ছে চিঠিও। কিছু বিভাগ চিঠির জবাব দেয়, আবার কিছু বিভাগ কোনো জবাবই দেয় না।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. এএসএম মাকসুদ কামাল বলেন, করোনার কারণে শিক্ষার্থীদের জীবন থেকে যে সময়টা নষ্ট হয়েছে তা ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য লস রিকভারি প্ল্যান গ্রহণ করেছিলাম। স্বল্প সময়ে কোর্স শেষ করতে গিয়ে শিক্ষকদের ওপরও চাপ তৈরি হয়েছে, তারাও হিমশিম খাচ্ছে। সে সংকটও আমরা মোকাবিলার চেষ্টা করছি। আশা করছি খুব দ্রুত আমরা স্বাভাবিক অবস্হায় ফিরে যেতে পারবো।

পরীক্ষার তারিখ পাওয়া যায় না :বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অফিস থেকে বারবার চিঠি দিয়েও বিভাগগুলোর কাছ থেকে পরীক্ষার তারিখ পাওয়া যাচ্ছে না। ২০২১ সালের চতুর্থ বর্ষ অষ্টম সেমিস্টারের পরীক্ষার তারিখ চেয়ে চিঠি পাঠানো হয় পরীক্ষা কমিটিগুলোর কাছে। সে চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে কলা অনুষদের ১৭টি বিভাগের মধ্যে সাতটি বিভাগ পরীক্ষার তারিখ জানায়। বিভাগগুলো হলো বাংলা, ইতিহাস, আরবি, উদু‌র্, পালি অ্যান্ড বুদ্ধিস্ট স্টাডিজ, ইসলামিক স্টাডিজ, বিশ্ব ধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগ। এর বাইরে বাকি বিভাগগুলো পরীক্ষার তারিখ জানাতে পারেনি। অন্যদিকে চারুকলা, আইন ও বিজ্ঞান অনুষদভুক্ত কোনো বিভাগই পরীক্ষার তারিখ দিতে পারেনি। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের লস রিকভারি প্ল্যান নিয়ে যেভাবে আগানোর কথা ছিল, তা সম্ভব হচ্ছে না।

এক বছরের সেশনজট

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগে ভিন্ন ভিন্ন মেয়াদি সেশনজট রয়েছে। এর মধ্যে সর্বনিম্ন আট মাস থেকে দেড় বছরের সেশনজটে ভুগছেন শিক্ষার্থীরা। করোনা ভাইরাসের অস্হিতিশীল পরিস্হিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম স্হগিত থাকার কারণে এ সেশানজট তৈরি হয়।

সেশনজট দূর করতে বিশ্ববিদ্যালয় কতৃ‌র্পক্ষ লস রিকভারি প্ল্যান গ্রহণ করে। তবে প্ল্যানের আওতায় তিন থেকে চার মাসের সেশনজট দূর করা সম্ভব হয়েছে।

লস রিকভারি প্ল্যান চাপ তৈরি করেছে

এদিকে সেশনজট কমানোর জন্য গৃহীত লস রিকভারি প্ল্যান চাপ তৈরি করছে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর। ছয় মাসের সেমিস্টার চার মাসে সম্পন্ন করতে গিয়ে দ্রুত সময়ের মধ্যে কোর্স শেষ করা, পরীক্ষা গ্রহণ, ফলাফল প্রকাশের মতো কাজগুলো করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে শিক্ষকদের। অন্যদিকে দ্রুত কোর্স শেষ করতে গিয়ে চাপ সৃষ্টি হচ্ছে শিক্ষার্থীদের উপর।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আকবর হোসেন বলেন, ছয় মাসের সেমিস্টার চার মাসে আনা হয়েছে। কিন্তু বিভাগের পক্ষ থেকে কোর্স আউটলাইনের কোনো অংশই কমানো হয়নি। শিক্ষকরা কিছুটা রাখঢাক করে পড়াচ্ছেন। কিন্তু এত অল্প সময়ের মধ্যে এত বড় কোর্স, সেমিস্টার শেষ করাটা আমাদের মানসিক সমস্যার কারণ হয়ে উঠছে। একদিকে চাকরির পড়াশোনা, অন্যদিকে বিভাগের পড়াশোনা। কোন কুল ছেড়ে কোন কুল রাখব, বুঝে উঠতে পারছি না। এখন মনে হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে যেতে পারলেই বাঁচি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. এ এস এম মাকসুদ কামাল বলেন, এই প্ল্যানের জন্য শিক্ষার্থীদের ওপর যে কিছুটা চাপ সৃষ্টি হচ্ছে, তা আমরা জানতে পেরেছি। শিক্ষকদেরও খাতা দেখা, ফলাফল দেওয়া থেকে শুরু করে নানা অসুবিধা হচ্ছে। এ বিষয়ে আমরা দ্রুত মূল্যায়ন করে পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত নেব। তবে কিছু কিছু বিভাগ শিক্ষার্থীদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আগের রূপে ফিরে গেছে। এগুলো সম্পর্কে আমরা অবহিত আছি। শিক্ষার্থীদের স্বার্থ সংরক্ষণ করাই আমাদের কাজ।