বাংলাদেশ একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ দেশ। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে প্রথম সারিতে বাংলাদেশ। পৃথিবীর ৯৭ ভাগ পানি সাগর-মহাসাগরে এবং তিন ভাগ পানি নদী, হিমবাহ, ভূগর্ভস্থ হ্রদ, মৃত্তিকা, বায়ুমণ্ডল ও জীবমণ্ডলে ধারণ করে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, পলিথিন, বর্জ্য ও বরফ গলার কারণে আটলান্টিক মহাসাগরসহ সাগর-মহাসাগর ভরাট হচ্ছে। বঙ্গোপসাগর থেকে বাংলাদেশের ভূপৃষ্ঠের উচ্চতা মাত্র পাঁচ মিটার। ২০৫০ সালের মধ্যে বঙ্গোপসাগর আরো দুই-তিন মিটার ভরাট হলে সাগরের পানিতে দেশের এক-তৃতীয়াংশ এলাকা তলিয়ে যেতে পারে এবং ৫ কোটিরও বেশি মানুষ বাস্ত্তহারা হতে পারে এমন ধারণা বিজ্ঞানীদের। চলতি বছরের জুন মাসে শতাব্দীর ভয়াবহ রাক্ষুসী বন্যা বড় ধরনের একটি দুর্যোগের লক্ষণ। ১২২ বছরের ইতিহাসে সিলেটবাসী কখনো এ ধরনের বন্যা দেখেনি। দেশে অনেক বড় বড় বন্যায় মোট আয়তনের ৮০ ভাগ এলাকা প্লাবিত হলেও এ বন্যা খুব কম সময়ে সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যায়। বর্তমানে পুরো দেশও বন্যাকবলিত।
কলম্বিয়ার ললর সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপ্রবণ এলাকা হলেও ভারতের মেঘালয়ের মৌসিনরামকে মেঘের বাড়ি বলা হয়। গিনেজ বুক ও ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে এই শহরের বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত হয় ১২ হাজার মিলিমিটার। ১৯৮৫ সালে সেখানে গড় বৃষ্টিপাত হয়েছিল ২৬ হাজার মিলিমিটার। ভারতের মেঘালয়ের ৪ হাজার ৮৫৯ ফুট উচ্চতায় চেরাপুঞ্জিও বিশ্বের অন্যতম বৃষ্টিপ্রবণ এলাকা। সেখানকার আবহাওয়াবিদদের মতে, ১৬ থেকে ১৮ জুন ২০২২ এই তিন দিনে চেরাপুঞ্জি ও আসামে মোট ২৫ হাজার মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়। তখন সিলেটেও সপ্তাহব্যাপী প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়েছিল। আরব সাগর ও বঙ্গোপসাগর থেকে আসা প্রচুর জলীয় বাষ্প হিমালয় পাহাড়ে ধাক্কা খেয়ে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়েছে। সেই বৃষ্টির পানি মেঘালয়ের প্রান্তই পাহাড়ের বাঁধ ভেঙে বাংলাদেশের গোয়াইনঘাটের প্রান্তই ঝরনা দিয়ে দ্রুত পানি সিলেটে নেমে আসে।
বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় পুণ্যভূমি সিলেট বিভাগের মানুষের দুঃখ হচ্ছে—পিয়াইন, ধলাই, সুরমা, কুশিয়ারা, কালনি, মনু, খোয়াই নদনদী ও এদের সংযোগকারী শাখা নদী-উপনদী, খাল-বিল-ঝিল ও নালাগুলো। সিলেটের উত্তর প্রান্তে খাসিয়া, জৈন্তার শৈল শ্রেণির পাদদেশে পিয়াইন নদী অবস্হিত। কোম্পানীগঞ্জ-গোয়াইনঘাট-জৈন্তাপুর-সিলেট সদর—এ চার উপজেলার ৭০০ বর্গমাইল অঞ্চলের প্রায় ১০ লাখ মানুষের মরণদশার জন্য দায়ী রাক্ষুসী ও বেপরোয়া এই পিয়াইন নদ। ভারতের মেঘালয় পাহাড়ে উত্পন্ন হয়ে পিয়াইন আহমদঘাটের কাছ দিয়ে ঢুকে গোয়াইনঘাট-কোম্পানীগঞ্জের ওপর দিয়ে ছাতকে গিয়ে সুরমা নদীতে মিলিত হয়েছে। একসময় পিয়াইন নদের গভীরতা ছিল ২৫-৩০ মিটার। উজানের ঢলে আসা পানি তার পেটেই সংকুলান করে ভাটির দিকে নিয়ে যেত। ব্রিটিশ আমলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এই নদ দিয়ে চেরাপুঞ্জি থেকে ছাতকে চুনাপাথর পরিবহন করত। খরস্রোতা পিয়াইন এখন বাঁকে বাঁকে ভরাট এবং দৈর্ঘ্য কমে গেছে। নদীটির গতিপথ পরিবর্তন হয়ে রতনের খাল, পবিত্রের ঢালা, নামনা খাল ও তেলিখাল নামে প্রবাহিত হচ্ছে। রতনের খালের বালু গোয়াইন ও চেঙ্গের খালকে ভরাট করে মরুভূমির আকার ধারণ করেছে। রতনের খাল এখন গোয়াইনঘাটের মরণফাঁদ। ১৯৮৮ সালের বন্যা পর্যটনকেন্দ্র জাফলংয়ের ঘরবাড়ি, চা-বাগান, কমলাবাগান, বিজিপির বল্লা সীমান্ত ফাঁড়ি নদীগর্ভে বিলীন করে দেয়। এখন ডাউকি জাফলং-প্রতাবপুর পর্যন্ত ভরাট হয়ে গেছে। আবহমানকাল থেকে ধলাই, সোনাই, চেলা, ডাউকি ও সারি দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়ে পিয়াইন ও চেঙ্গেরখাল দিয়ে সুরমা নদীতে পতিত হয়। কালনি, বিবিয়ানা, মারকুলি হয়ে এই পানি মেঘনায় চলে যায়। চেরাপুঞ্জির পানি মোসমাইল জলপ্রপাত দিয়ে পিয়াইন নদে প্রবেশ করে। ভারতের বরাক নদ দিয়ে নেমে আসা পানি জকিগঞ্জের আমলসিদের বাঁধ ভেঙে সুরমা ও কুশিয়ারা নদীতে গিয়ে সিলেট অঞ্চলে ৪০টি ডাইক দিয়ে পানি ঢুকে যায়।
বন্যার প্রথম ধাক্কায় কোম্পানীগঞ্জ, জকিগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, সিলেট সদর, বিশ্বনাথের খাজাঞ্চি ও লামাকাজী ইউনিয়ন, ছাতক-দোয়ারাবাজারসহ সিলেট ও সুনামগঞ্জে সব কটি উপজেলার ঘরবাড়ি ডুবিয়ে তছনছ করে দেয়। কোনো কিছু বোঝার আগেই বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, প্রতিষ্ঠান, হাঁস-মোরগ, গরু-মহিষ এবং লাখ লাখ টাকার মাছের খামার ভাসিয়ে নিয়ে যায়। মুক্তিযুদ্ধের পর ক্ষতবিক্ষত চিত্রের চেয়ে বন্যার এই চিত্র আরো ভয়াবহ। সিলেট-ছাতক রেললাইন বিভিন্ন স্হানে দুমড়েমুচড়ে সড়ক নদীর মতো খনন করে ধ্বংস করে দিয়েছে। সিলেট-সুনামগঞ্জের ২৫ লাখেরও বেশি মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে ছিল। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্যা আশ্রয়কেন্দ্রের আদলে দোতলা ভবন নির্মাণ করা হয়েছিল, সেই সব প্রতিষ্ঠানেই অধিকাংশ মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। সরকারিভাবে প্রায় ৯৯ হাজার ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা বললেও পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে কাঁচা ঘর ধসে পড়ছে। সুনামগঞ্জের হাওরে ঢেউয়ের তোড়ে পাকা ঘরবাড়িও নষ্ট হচ্ছে। মানুষ এখন শহরের দিকে ছুটে আসছে। হাওরে ফসল ও কাজ নেই, ঘরেও খাবার নেই। কাঁচা-পাকা রাস্তা একেবারে চূর্ণবিচূর্ণ। মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত। এই বন্যায় সরকারের পাশাপাশি ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ মানবিক সহায়তা করে ইতিহাসে নজির স্হাপন করেছে। হবিগঞ্জের ব্যারিস্টার সুমন, চট্টগ্রামের ফারাজ করিম চৌধুরী বানভাসী মানুষের জন্য লাখ লাখ টাকার ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেছেন। কিন্তু কিছু অমানুষ বন্যার সুযোগে দ্রব্যমূল্য ও যানবাহনের ভাড়া দশ গুণ বাড়িয়ে দিয়ে মানুষকে চরম হয়রানি করেছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে এম মোমেন বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে যারা দাঁড়িয়েছেন, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেছেন, মানুষের মানবতা এখনো এই দুনিয়া থেকে হারায়নি। তিনি এত এনজিও থাকা সত্ত্বেও বানভাসীর পাশে না থাকায় তাদের বিষয়ে খোঁজ-খবর নেওয়ার জন্য প্রশাসনকে নির্দেশও দিয়েছেন।
সরকার সুরমা-কুশিয়ারা নদী খননে ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের ঘোষণা দিয়েছে। দীর্ঘ কয়েক যুগ আগে পিয়াইন নদ খননের জন্য একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হলে আজ অবধি সেটি আলোর মুখ দেখেনি। ১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক পরিষদে মরহুম মকবুল হোসেন এমপি পিয়াইন নদ খননের প্রস্তাব করেন। ১৯৫৬ সালে তিনি মারা যাওয়ায় প্রকল্পটি ফাইলে তলিয়ে যায়। কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান এম তৈয়বুর রহমান পিয়াইন নদ খননে আন্দোলন-সংগ্রাম করে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হওয়ার আগেই মারা যান। কোম্পানীগঞ্জের সিনিয়র সাংবাদিক সাব্বির আহমদ জানালেন, উজানের ঢলে আসা বালু-পাথর, পিয়াইন, ধলাই, সারিসহ এই অঞ্চলের সব নদনদীর উত্স ও তলদেশ ভরাট হওয়ায় উজানের ঢলের পানি বাড়িঘরের চালের ওপর দিয়ে বয়ে যায়। তিনি পিয়াইনসহ সব নদনদী খনন না হলে এ অঞ্চলের ১৫ লাখ মানুষের জীবন বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা করেন। তিনি পাথরকোয়ারি খুলে দেওয়ারও দাবি জানান।
কালনি, খোয়াই, মনুসহ সিলেটের নদনদী, উপনদী, সরকারি খাল-বিল, জলাশয়, ভরাট হওয়ার কারণে ঢলের পানি ধারণ করতে পারছে না। এসব নদনদীর তীরে পাকা ঘরবাড়ি তৈরি করে দখল করে দৈর্ঘ্য কমিয়ে নদনদীর স্বাভাবিক গতিতে বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে। মাত্র কয়েক শ লোক সিলেট, ছাতক, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জসহ বিভিন্ন স্হানে নদীর তীর দখল করে থাকায় এবং রাতের আঁধারে বিভিন্ন হাসপাতাল, ক্লিনিক, বাসাবাড়ি, দোকানের হাজার হাজার টন বর্জ্য নদীতে ফেলে দেওয়ায় এসব নদীর তলদেশ একেবারে ভরাট হওয়ায় শহরগুলো চার-পাঁচ ফুট পানির নিচে তলিয়ে যায়। এমন ক্ষতির জন্য দখলবাজরা সম্পুর্ণরূপে দায়ী। বন্যা সমস্যা দীর্ঘস্হায়ী সমাধানে সিলেটসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলো খননের আগে দখলবাজদের উচ্ছেদ করে নদীর সীমানা চিহ্নিত করার মাধ্যমে নদী ও নদীর সঙ্গে সংযোগগকারী শাখা নদী, উপনদী, খাল, বিল খনন করা একান্ত জরুরি। নদীর মাটি তীরের কয়েক মিটার দৈর্ঘ্য ও উঁচু করে বটগাছ, তাল, নিম, জারুইলসহ শিকড়ওয়ালা দেশি প্রজাতির গাছ লাগাতে হবে। যাতে করে আর কোনো দখলবাজ দখল না করতে পারে, সেজন্য সীমানা বেষ্টনী তৈরি করতে হবে।
৫৮টি আন্তর্জাতিক নদনদীসহ সাত শতাধিক নদনদী আমাদের দেশের রেকর্ডে থাকলেও বাস্তবে নেই। ৫৫টি নদনদীর উত্পত্তি ভারতে। স্মরণাতীত কাল থেকে এসব নদনদী দিয়ে পানি আসছে। তাই ভারতের সঙ্গে তিস্তাসহ সব নদনদীর পানির সুষ্ঠু ব্যবস্হাপনার বিষয়ে চুক্তি এবং আবহাওয়ার তথ্য আদান-প্রদানের সমঝোতা একান্ত জরুরি।
মিশর নীল নদের দান, চীন হোয়াংহো নদীর দান। তেমনি বাংলাদেশ অসংখ্য নদনদীর দান। নদী বাংলাদেশের মানুষের বড়ই সম্পদ, মুক্তিযুদ্ধে সহায়তা করেছে নদী, সভ্যতা গড়ে ওঠেছে নদীর তীরে। সাহিত্য-সংস্কৃতি-কবিতায় নদী। মাছে-ভাতে বাঙালির বিশ্বে পরিচয় দিয়েছে নদী। রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ ধানসিঁঁড়ি নদীর অপার সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়ে লিখেছিলেন, ‘আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে এই বাংলায়’। আমাদেরও মূলের দিকে ফিরে যেতে হবে, নদী বাঁচলে দেশ বাঁচবে, সময়ের প্রয়োজনে নদী এখন দেশের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। নদী রক্ষার্থে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ আবশ্যক।
লেখক: কলামিস্ট ও সমাজ বিশ্লেষক