এখন সময়টা ই-কমার্সের। ই-কমার্সের মানে ইলেকট্রনিক কমার্স। দুই দশক আগেও বাংলাদেশে ই-কমার্সের তেমন ব্যাপকতা ছিল না আজকের মতো। তখনো মানুষ ভাবতে পারেনি বাজারে না গিয়ে ঘরে বসেই তার চাহিদামাফিক পছন্দের জিনিসটি খুব সহজেই কিনে নিতে পারবে। এখন প্রেক্ষাপট পালটে গেছে। ই-কমার্স এখন শহুরে শিক্ষিত সমাজে বেশ চালু হয়ে গেছে বলা যায়। এর মাধ্যমে সহজে ঝক্কিঝামেলা থেকে মুক্ত হয়ে চাহিদা অনুযায়ী কেনাকাটা করা যায় বলে দিনে দিনে আরো মানুষ ই-কমার্সের আওতায় চলে আসছে। গোটা অর্থনীতিতে ভিন্নমাত্রা যোগ করেছে ই-কমার্স—এ কথা বলায় যায় এখন অনায়াসেই।
প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই খাতে কর্মসংস্থান হয়েছে, নতুন নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে এই সেক্টরে উদ্যোক্তা হওয়ার প্রবণতা বেশি লক্ষ করা যায়। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে অনেক তরুণ তরুণী এককভাবে, কেউ দলগতভাবে এই সেক্টরে নিজেদের নাম লেখাচ্ছেন উদ্যোক্তা হিসেবে। ফলে প্রতি বছরই বাড়ছে উদ্যোক্তা, বাড়ছে কর্মসংস্থান। অনলাইনের প্রচার ও প্রসার যত বাড়ছে, ততই বাড়ছে ব্যবসার সুযোগ। অনলাইনে কেনাকাটা, ওয়েব ডিজাইন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট, ডিজিটাল মার্কেটিং, ফেসবুকে কেনাকাটা—সবই ই-কমার্সের আওতাভুক্ত।
ই-কমার্সে দিনে দিনে কেনাকাটা বাড়ার অন্যতম কারণ পণ্যের সহজলভ্যতা এবং পণ্য সম্পর্কে বিশদ তথ্য। যে পণ্যটি সম্পর্কে ক্রেতারা জানত না, এখন ই-কমার্সের সুবাদে ঐ পণ্য সম্পর্কেও সহজে বিভিন্ন প্রয়োজনীয় তথ্য জানতে পারছে। যশোরের একটি নকশিকাঁথা অনেকের পক্ষেই যশোর গিয়ে কেনা সম্ভব নয়। কিন্তু ই-কমার্স সেই সুযোগ করে দিয়েছে। যে নারী ঘরে বসে কেক বা মজার পিঠাপুলি বানাতেন আর চেনাজানা পরিচিতজনের কাছে বিক্রি করতেন, এখন ঐ অচেনা নারীর কেক ও পিঠাপুলি চেনা-অচেনা অনেকে কিনছেন ই-কমার্সের বদৌলতে। ফলে পণ্যের বাজার এখন অনেক বেশি বিস্তৃত, অনেক প্রসারিত। কোনো কারণে যদি পণ্যের বাজার বড় হয়, তাহলে সেই বাজারে নতুন নতুন উদ্যোক্তার আগমন ঘটবে, এটাই স্বাভাবিক।
একদিকে বৃহত্ আকারের বাজার, অন্যদিকে বিপুলসংখ্যক বিক্রেতার সমাগমের ফলে বাজারের আয়তন প্রতিনিয়ত প্রসারিত হবে, এটাই স্বাভাবিক। তাছাড়া এখন নগরজীবনে প্রচণ্ড যানজটের কারণে বাজারে গিয়ে কেনাকাটার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে অনেকেই। বাজারের দোকানপাট কিংবা শপিং মল দিনে ১০ ঘণ্টার মতো খোলা থাকলেও ই-কমার্স বছরের ৩৬৫ দিন আর দিনের ২৪ ঘণ্টাই খোলা। এ কারণে দর্শক এই সুযোগ পুরোপুরি গ্রহণের ব্যাপারে তুমুলভাবে আগ্রহী হয়েছে ই-কমার্সের মাধ্যমে। বাংলাদেশ ই-কমার্সের সম্ভাবনা অনেক দূর পর্যন্ত প্রসারিত। আগামী দিনগুলো অনেক সম্ভাবনাময় ই-কমার্সের জন্য। এক কথায় বলা যায়, এ দেশের খুচরা ব্যবসার সিংহভাগ ক্রমেই ই-কমার্সের আওতায় চলে আসবে।
ই-কমার্সের দুর্বলতার দিক হচ্ছে, কেউ প্রতারণার শিকার হলে অভিযোগ দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে বর্তমানে নাগরিক জীবনের জটিলতা ও ব্যস্ততা বেড়ে যাওয়ায় বাজারে গিয়ে কেনাকাটার প্রবণতা ক্রমেই কমে আসছে। এ কারণে ই-কমার্সের ভবিষ্যৎ অনেক উজ্জ্বল সহজেই বলা যায়। কোনো মানুষ সাধারণত কিছু কেনার সময় প্রথমে পণ্যের গুণগত মান নিয়ে সংশয়ে থাকে, সন্দেহ করে। পণ্যটি কিনে ঠকছে না জিতছে তা নিয়ে অনেক ভাবনা-চিন্তা করে। কিন্তু একবার পণ্যটি কেনার পর তার মনে জেগে ওঠা সংশয়-সন্দেহ কেটে গিয়ে একধরনের আস্থাভাব সৃষ্টি হয়, যদি পণ্যটি গুণে-মানে ভালো ও সন্তোষজনক হয়। ই-কমার্সে পণ্য কিনে চরম প্রতারণার শিকার হয়েছে এমন ক্রেতার সংখ্যাও কম নয়। সবাইকে এটা উপলব্ধি করতে হবে, ই-কমার্সে এ ধরনের প্রতারক ব্যবসায়ীরা দীর্ঘ মেয়াদে টিকে থাকতে পারেন না। প্রধানমন্ত্রী বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে ‘ডিজিটাল বাণিজ্য কর্তৃপক্ষ’ গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন। দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ ও সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা এবং অনিয়ম-বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধের লক্ষ্যে গঠন করা হচ্ছে এই কর্তৃপক্ষ। ডিজিটাল বাণিজ্য কর্তৃপক্ষ গঠনের উদ্যোগ নিতে হবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে। ঐ নির্দেশনার পর ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছে মন্ত্রণালয়।
দেশে দ্রুত ই-কমার্স ব্যবসার সম্প্রসারণ হচ্ছে। আগামী ২০২৩ সালে এই বাণিজ্য ৩ হাজার কোটি টাকা ছাড়াবে। ই-কমার্স সম্প্রসারণের পাশাপাশি প্রতারণাও বাড়ছে। যদিও প্রতারণা বন্ধে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কিছুটা উদ্যোগ নিয়েছে। তবে ডিজিটাল বাণিজ্য কর্তৃপক্ষ গঠনের পর ই-কমার্স সেলও এটির অন্তর্ভুক্ত করা হবে। ভবিষ্যতে ই-কমার্স বাণিজ্য করতে হলে এই কর্তৃপক্ষ থেকে লাইসেন্স নিতে হবে। এটির অন্যান্য কাজের মধ্যে থাকবে দেশে ও বিদেশের ব্যবসা নিয়ে গবেষণা, ঝুঁকি মূল্যায়ন ও যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা। এছাড়া করপোরেট সেবা, ব্যবসার পর্যবেক্ষণ বিভাগ ও ব্যবসার গুণমান নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের উদ্যোগ থাকবে এখানে। পৃথক একটি আইনের মাধ্যমে ডিজিটাল বাণিজ্য কর্তৃপক্ষ পরিচালনা করা হবে। থাকবে এই কর্তৃপক্ষের নিজস্ব আইনে পরিচালিত আদালতের ব্যবস্থা। এছাড়া আমদানি ও রপ্তানি বাণিজ্য, স্থানীয় বাজার তদারক করবে এটি। ডিজিটাল বাণিজ্য কর্তৃপক্ষ গঠিত হলে সব ধরনের তদারকি কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে । ই-কর্মাস, এফ-কমার্সসহ (ফিজিক্যাল বাণিজ্য) সব ধরনের বাণিজ্য এখান থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হবে। এটি প্রথমে আইসিটি মন্ত্রণালয়ের অধীনে ছিল। সেখান থেকে স্থানান্তর করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ওপর ন্যস্ত করা হয়। এ নিয়ে কাজ চলছে। আইন প্রয়োগের মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্যকে একটি শৃঙ্খলায় আনতে ডিজিটাল বাণিজ্য কর্তৃপক্ষ গঠনের প্রয়োজনীয়তা আছে। আইনগুলো যুগোপযোগী না থাকায় এখন স্থানীয় বাজারগুলোতে বিশৃঙ্খলা হচ্ছে।
ই-কমার্স খাতে কর্মসংস্থান হয়েছে হাজার হাজার মানুষের। নতুন নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি হচ্ছে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে এই সেক্টরে উদ্যোক্তা হওয়ার প্রবণতা বেশি লক্ষ করা যায়। প্রতি বছরই বাড়ছে উদ্যোক্তা, বাড়ছে কর্মসংস্থান। ই-কমার্স একটি স্মার্ট ব্যবসা সন্দেহ নেই। এখানে উন্নত গ্রাহকসেবা, গ্রাহক সন্তুষ্টি সম্পর্কে ভালো ধারণা না থাকলে ব্যবসায় সফলতা পাওয়া সম্ভব নয়। ইতিমধ্যে অনেকে ই-কমার্স ব্যবসায় জড়িত হলেও অধিকাংশই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারছেন না। অনেকেই বুঝে-না বুঝেই এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন। কারণ, ব্যবসা ভালোভাবে না বুঝে শুরু করলে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে না বা টিকে থাকতে পারে না। এ ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। এক কথায় বলা যায়, কেবল যোগ্যরাই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকবে। ই-কমার্সের বিস্তৃতির জন্য সরকারকে আরো সচেষ্ট হতে হবে। কারণ, সরকারিভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেনে ডিজিটাল প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহারকে উত্সাহিত করা হচ্ছে। এখনো ই-কমার্স নিয়ে সরকারিভাবে কোনো নীতিমালা প্রণীত হয়নি। নীতিমালা না থাকার কারণে ই-কমার্সে প্রতারণা, জালিয়াতি, অনিয়ম হলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ সম্ভব হচ্ছে না। এর ফলে আস্হার ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যা ই-কমার্সের বিকাশের পথে বিরাট বাধা হয়ে উঠেছে।
আজ সবাইকে উপলব্ধি করতে হবে, আমাদের অর্থনীতিতে অফুরন্ত সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে পারে ই-কমার্স। ই-কমার্সে সঠিক সময়ে ক্রেতার হাতে পণ্যটি পৌঁছে দেওয়াটাই হলো বেশ গুরুত্বপূর্ণ। ক্রেতার হাতে তার কেনা পণ্যটি যথাসম্ভব স্বল্পতম সময়ে পৌঁছে দেওয়ার সব ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। ই-কমার্সে ভালো পণ্য প্রাপ্তি নিয়ে নানা সন্দেহ-সংশয় থাকায় এ বিষয়টিও বেশ গুরুত্বপূর্ণ সন্দেহ নেই। ই-কমার্সে নিয়োজিতদের অবশ্যই পণ্যের গুণমানের দিকে নজর দিতে হবে। কোনো রকম ফাঁকি কিংবা জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে ব্যবসা করলে তা নিয়ে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। কারণ, ক্রেতাদের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়ে ফেললে ই-কমার্স ব্যবসার ভিত্তিটাই হারিয়ে যায়। ই-কমার্সের দুর্বলতার দিক হচ্ছে, কেউ প্রতারণার শিকার হলে অভিযোগ দেওয়ার সুযোগ নেই। প্রচলিত পদ্ধতির কেনাকাটায় জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে কেউ অভিযোগ করলে তার প্রতিকার পেতে পারেন। কিন্ত ই-কমার্সে প্রতিকার পাওয়ার পথ নেই।
বাংলাদেশে ডিজিটাল বিপ্লব ঘটে গেছে আরো আগেই। কিন্তু তার পরও সরকার ই-কমার্স নিয়ে একটা নীতিমালা করতে পারেনি। এটা ই-কমার্সের যথাযথ বিকাশের পথে অন্তরায় হয়ে উঠছে। নীতিমালা না করলে প্রতারণা বাড়ে এবং মানুষের আস্থার ঘাটতি তৈরি হয়। ই-কমার্সের ক্ষেত্রে যেসব সমস্যা বা প্রতারণার সুযোগ রয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। এজন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করতে হবে। ই-কমার্সকে শক্তিশালী করতে বিশ্বাস ও জবাবদিহির আওতায় আনতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। প্রতারিত যেকোনো গ্রাহক অভিযোগ করলে তার প্রতিকার পাওয়ার জন্য একটি প্ল্যাটফরম তৈরি করা হচ্ছে। এসব কাজ সম্পন্ন হলে ই-কমার্সের ব্যবসা নিরাপদ হবে।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার, সোনালী ব্যাংক লিমিটেড