উপকূলবাসীর দুঃখ ‘বাঁধভাঙা’ 

প্রাকৃতিক দুর্যোগে বারবার বিধ্বস্ত দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূল। নদীর পানি বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসে সবচেয়ে বেশি সংকট দেখা দেয় এ উপকূল জুড়ে।

সাম্প্রতিক সময়ে নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে সুন্দরবনসংলগ্ন খুলনার কয়রা উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়নের চরামুখা এবং সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার খোলপেটুয়া নদীর দুর্গাবাটি গ্রামে বেড়িবাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয় বেশ কয়েকটি গ্রাম। মানবেতর জীবন যাপনে বাধ্য হয় শত শত পরিবার। লোকজন পড়ে খাবার পানির তীব্র সংকটে। বিগত দিনে আঘাত হানা আইলা, সিডর, আম্ফানে বিধ্বস্ত মানুষ আজও উঠে দাঁড়াতে পারেনি। তার ওপর প্রতি বছর ঝড়-ঝঞ্ঝা তো রয়েছেই। সাম্প্রতিক সময়ে এসব অঞ্চল জুড়ে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। আকাশ থাকছে অধিকাংশ সময়ই মেঘাচ্ছন্ন। উপকূলবর্তী এলাকায় জোয়ারের প্রভাবে নদীর পানি স্বাভাবিকের তুলনায় ৩ থেকে ৪ ফুট উচ্চতায় বৃদ্ধি পায়। অতিরিক্ত পানির চাপে ভেঙে যায় এসব অঞ্চলে থাকা নড়বড়ে বেড়িবাঁধ। যার ফলে আবার নতুন করে ডোবে মৎস্য ঘের, পুকুর, রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি। পানিবদ্ধতায় স্থবির হয়ে পড়ে জীবনযাত্রা।

এক সাম্প্রতিক খবরমতে, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খুলনা জেলার কয়রা উপজেলায় অধিকাংশ বেড়িবাঁধের বেশকিছু অংশ নড়বড়ে ছিল। যার ফলে পানির তীব্র চাপ সহ্য করতে না পেরে সেসব বেড়িবাঁধ ভেসে চলে গেছে। বিস্তৃত অঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। শুরু হয়েছে আইলা, আম্ফানের মতো মানবেতর জীবনযাপন। কয়রা উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়নের দুটি গ্রামে বর্তমান ২০০ পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়ে। আগের ক্ষত শুকাতে না শুকাতেই আবার এমন বিপর্যয় তাদের সর্বস্বান্ত করেছে। ছোট ছেলেমেয়ে, পরিবারে বৃদ্ধদের নিরাপদ জায়গায় স্থানান্তরিত করতেও তারা বেশ ভোগান্তিতে পড়ছে। প্রায় একযুগ আগে ঘূর্ণিঝড় আইলায় বিধ্বস্ত উপকূলের এসব অঞ্চলে আজ অবধি খাবার পানির সংকট কাটিয়ে উঠতে পারেনি লোকজন। উপরন্তু, অতিবৃষ্টি, নদীর পানি বৃদ্ধির ফলে জলাবদ্ধতায় দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল এলাকায় লবণাক্ত পানির প্রভাবে এবং সুপেয় পানির উৎস না থাকার কারণে উপকূল অঞ্চলের মানুষ খাবার পানির চরম সংকটের মধ্যে রয়েছে। এর ফলে তারা টাইফয়েড জ্বর, রক্ত আমাশয়, ডায়রিয়া, কলেরা, চর্মরোগসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এসব রোগ তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এজন্য উপকূলবর্তী জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে আরো বেশি কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে; তা না হলে মানচিত্র থেকে এসব অঞ্চল অতিদ্রুত বিলীন হয়ে যাবে।

তবে এত দুঃখ-দুর্দশার মধ্যেও তারা আশা করে পথ চেয়ে বসে আছে তাদের ঘিরে সরকারের নেওয়া পরিকল্পনার দিকে। কিছুদিন আগে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলায় উপকূলীয় এলাকায় পুরোনো বাঁধ সংস্কারের পাশাপাশি টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণে ১ হাজার ২৩ কোটি টাকার ‘সাতক্ষীরা জেলার পোল্ডার নং-১৫ (শ্যামনগর) পুনর্বাসন’ শীর্ষক একটি প্রকল্প একনেকে অনুমোদন হয়েছে। পাশাপাশি উপকূলীয় জেলা খুলনার কয়রা উপজেলায় একটি প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে যার পোল্ডার নং- ১৪/১। এখানে ১ হাজার ৭২ কোটি ৩১ লাখ টাকার একটি প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এ দুটি উদ্যোগের ফলে কিছুটা হলেও আশার আলো দেখছে নদীভাঙনে নিঃস্ব হওয়া উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ। 

তবে এ জনপদের মানুষকে বাঁচাতে, জীবনমানের উন্নয়ন ঘটাতে ইতিমধ্যে যে প্রকল্প দুটি পাশ হয়েছে তা সুপরিকল্পিতভাবে এবং স্বচ্ছতার মধ্য দিয়ে দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। পাশাপাশি খাবার পানির সংকট, নিরাপদ স্যানিটেশন ব্যবস্থায় সরকারকে আরো বেশি গুরুত্ব দিয়ে উপকূলবাসীর পাশে দাঁড়াতে হবে।

লেখক : শিক্ষার্থী, সরকারি বিএল কলেজ, খুলনা