আজ ২৫ জুলাই অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ ৮২ পার করে ৮৩ বছরে প্রবেশ করেছেন। দেশের সবচেয়ে আলোচিত সংগঠন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি তিনি। তিনি একাধারে সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ ও সমাজ সংস্কারক। মহামারি কোভিড সংক্রমণের কারণে তিনি প্রায় দুই বছর স্বেচ্ছাবন্দি হয়ে ঘরেই থেকেছেন। তার মতো কর্মযোগীর পক্ষে এই কর্মহীন বন্দিত্ব কেমন ছিল? এ প্রসঙ্গসহ বিভিন্ন বিষয়ে অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের সাক্ষাত্কার নেওয়া হয়। জন্মদিনের শ্রদ্ধার্ঘ্য হিসেবে আজ এই সাক্ষাত্কারটির চুম্বক অংশ প্রকাশিত হলো। গত ৯ এপ্রিল আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের বাসায় গিয়ে এই সাক্ষাত্কারটি গ্রহণ করেছেন কথাসাহিত্যিক মিলা মাহফুজা।
প্রশ্ন: স্যার, করোনার এই দীর্ঘ স্বেচ্ছাবন্দি সময়টা কি লেখার কাজে ব্যয় করলেন?
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ: এই দীর্ঘ বন্দিসময়ে লেখালেখি করেছি। প্রচুর লিখেছি, তা নয়; নতুন চারটে বই লিখেছি। তবে ৩৮টা বই পরিমার্জন ও সংশোধন করেছি, দুইবার করে। প্রথম লেখার পর ঐ লেখাগুলো আর দেখার সুযোগ পাইনি। কিন্তু বইগুলো ঐ অবস্থায় বাজারে থাকুক, পাঠকের হাতে যাক, সেটা ঠিক না। বইয়ের পরিশীলিত চেহারা দেওয়ার কথা ভেবেছিলাম, এবার সেটা করতে পেরেছি। রবীন্দ্রনাথ তার সব লেখাই বহুবার সংশোধন করতেন।
প্রশ্ন: এই বইগুলো কি কেন্দ্র সম্পর্কিত?
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ: না, সবগুলো কেন্দ্র নিয়ে নয়। গল্প, প্রবন্ধ, ভ্রমণ, আত্মজীবনী আছে। আত্মজীবনীই ২২০০ পৃষ্ঠা। ‘নিষ্ফলা মাঠের কৃষক’, ‘আমার উপস্থাপক জীবন’ এ ধরনের গোটা দশেক বই এর মধ্যে পড়ে। এখন একটা লিখছি, নাম ‘আলোর ইস্কুল’। এটা কত বড় হবে জানি না। আমি বইয়ের ওপর লিখে দেব ‘পড়িবার জন্যে নহে। নাড়াচাড়া করিবার জন্য’। ‘বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও আমি’—এ বইটা হচ্ছে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের আইডিয়া। আর ‘আলোর ইস্কুল’ বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সুখ দুঃখময় যাত্রা ও সংগ্রামের গল্প।
প্রশ্ন: ‘আলোর ইস্কুল’ বই শুরু করেছেন কোথা থেকে?
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ: কেন্দ্র গড়ার একেবারে প্রথম দিকে একদিন সাংবাদিক আবেদ খানের বাসায় আড্ডা দিতে দিতে আমি কেন্দ্রের স্বপ্নের কথা বলি। সেই স্বপ্নের পথ ধরে একদিন আমরা দশ জন সভ্য জোগাড় করে নায়েম অডিটরিয়ামে জড়ো হই। ঠিক হলো পরের সপ্তাহে প্রত্যেকে পড়ে আসবে একটা বই। বইটি হলো জসীমউদ্দীনের ‘নকশী কাঁথার মাঠ’, প্রতিটি বইয়ের দাম সাড়ে তিন টাকা। অর্থাৎ দশ জনের জন্য দশটা বই কিনতে হলে আমাদের লাগবে ৩৫ টাকা। কিন্তু এত টাকা আমাদের নেই। অনুষ্ঠানে ছিলেন আশরাফুজ্জামান খান। সেকালের ঢাকার খুব বিখ্যাত মানুষ। তিনি কিনে দিলেন বইগুলো। উনি ছাড়াও আরো কয়েকজন ভদ্রলোক ও ভদ্রমহিলা উপস্থিত ছিলেন সে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে। তারপর কত কষ্ট কত দুঃখ, কত আনন্দের মধ্য দিয়ে চলছে আমাদের যাত্রাপথ।
প্রশ্ন: ৪২ বছর হয়ে গেল কেন্দ্রের বয়স!
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ: হ্যাঁ, তা হলো। এ সময়ে আমরা ২ কোটি ছেলেমেয়েকে বই পড়িয়েছি। আমার মনে হয় এর ১ শতাংশও যদি অল্প কিছু অবদান রাখে তাহলেও তো একটা সফলতা।
প্রশ্ন: এই ২ কোটির কত পার্সেন্ট ভালো মানের কিছু করবে বলে আপনার মনে হয়?
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ: সেটা এভাবে বলা যাবে না। পৃথিবীর সব জায়গায় দেখা যায় ৫ থেকে ৭ শতাংশ লোক হচ্ছে সক্রিয়, সৃজনশীল ও ক্ষিপ্র। যারা তাদের চারপাশে একটা ঘুর্ণাবর্ত তৈরি করতে পারে। পৃথিবীতে এরাই মানব সমাজের মূলকেন্দ্র। বাকিরা ঘোরে এদের উঞ্ছবৃত্তি করে। আমরা একটা বড় ঝাকি জাল ফেলি, তাতে টেংরা পুঁটির সঙ্গে দু-একটা বড় মাছও ওঠে। যদি বাঘা বাঘা দু-তিনটা মাছ ধরা যায় তাহলে বাকিগুলো ফেলে দিলেও অসুবিধা নেই।...মহাভারতের কুরু-পাণ্ডবদের যুদ্ধে কত অক্ষৌহিনী সৈন্য যুদ্ধ করেছিল কিন্তু জয়ের পর হস্তিনানগরে প্রবেশ করেছিল পাণ্ডবদের কজন!...চর্যাপদের হরিণীকে যেমন পাওয়া যায় না। তাকে শুধু খোঁজা যায়—আর এই খোঁজাটাই যেমন তাকে পাওয়া। তেমনি আমাদেরও চেষ্টা আলোকিত মানুষ জন্মের জন্য।
প্রশ্ন: মোবাইল লাইব্রেরিতে সাড়া কেমন?
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ: মোবাইল লাইব্রেরির অবদান অনেক। আমরা স্কুল-কলেজে পাঁচ বছরে ১০০টা নির্বাচিত বই পড়াই। কিন্তু মোবাইল লাইব্রেরিতে গাড়ি ভর্তি বই পাঠকদের বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে। আর ঐ বয়সে বই ভর্তি এ রকম একটা গাড়ি পাওয়া! গাড়ি থেকে ‘আলো আমার আলো’ গানটা কানে এসে বাজে। চারপাশের ঘরবাড়ি থেকে ছেলেমেয়েরা দৌড়ে আসে। বই নেয়, এভাবে বছরের পর বছর পড়ে। যাদের প্রতিভা আছে, তারা যদি এই সুবিধা পায় তাহলে তো কথাই নেই। প্রতিভাবানদের অনেক সময় অতো পড়তেও হয় না। তবে আরো বড় ট্যালেন্ট হতে গেলে, রবীন্দ্রনাথ হতে গেলে পড়তে হবে। মাইকেল, বঙ্কিম, রামমোহন হতে গেলে পড়তেই হবে। বড় প্রতিভাবানদের এগুলো না পড়ে উপায় নেই।
প্রশ্ন: এখনকার কোনো কোনো লেখক মনে করেন তিনি লেখার ফর্ম ভেঙে নতুন ফর্ম তৈরি করছেন। এ বিষয়ে আপনার মত কী?
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ: ফর্ম যে ভাঙতে পারেনি, সে তো লেখকই হয়নি। ওটাই তো লেখক জীবনের হাতেখড়ি। তবে ভাঙাচোরা যা-ই হোক, লেখার একটা নিজস্ব বৈশিষ্ট্য থাকতে হবে। ফুটবল খেলতে গেলে উন্মুক্ত জায়গায় খেলা যায় না। সুতরাং চার দিকে দাগ দিয়ে একটা আয়তক্ষেত্র বানিয়ে নিতে হয়। যতো কারুকাজ এই ক্ষেত্রের ভেতরে। সারা পৃথিবীময় তো ছবি আঁকা যায় না তার জন্যে আলাদা করে ইজেল লাগে, একটা ক্যানভাস লাগে, এই যে আটকে দেওয়া হলো চার দিক, এতে ইমাজিনেশনের চূড়ান্ত প্রয়োগের সুযোগ করে দেওয়া হলো। তা না হলে সব প্রতিভা তরল পদার্থের মতো ছড়িয়ে যাবে
প্রশ্ন: বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের জন্য কি আপনি লেখকসত্তাকে বিসর্জন দিয়েছেন?
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ: আমার বাবা সাহিত্যের লোক। আমার পরিবারে সাহিত্য। আমার মনটাও সাহিত্যমুখী। সুতরাং লেখক হওয়াই আমার পক্ষে ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু এক সময় আমার ভেতরে দ্বন্দ্ব শুরু হলো—আমি বড় না আমরা বড়? যেদিন এই দ্বন্দ্ব শুরু হলো, সেদিন আমার মনে হলো—আমিই শুধু লেখক হব? তাহলে আমি তো স্বার্থপর হয়ে গেলাম না! আমি কি একাই পড়ব, একাই আলোকিত হব? সব মানুষকে আলোকিত হতে হবে না? এমনি করে ‘আমি’ ছেড়ে ‘আমরা’র দিকে যাত্রা শুরু হলো। এই দ্বন্দ্বে পড়ে আমার লেখক সত্তা দ্বিতীয় হয়ে গেল। এতদিনে আমি মাত্র ৪০টা বই লিখতে পেরেছি। তবে এটা নিয়তি তাড়িত হয়ে নয়, সজ্ঞানে। আমার জন্মগত প্রবৃত্তির তাড়না আমাকে ও পথে হাঁটতে বাধ্য করেছে। তবে ‘আমি’র দিকেও আমি হাঁটতে পারতাম। কারণ দুদিকেই আমার সমান প্রবণতা ছিল। কিন্তু সামনে তখন নতুন দেশ, একটা বড় জাতিতে নির্মাণ করার পর্ব। তাই ‘আমরা’র কাছে ‘আমি’ হেরে গেল।
প্রশ্ন: আপনি সবসময় বলেছেন নতুন বাংলাদেশ গড়তে লক্ষ লক্ষ নির্মাতা প্রয়োজন। তারা কি তৈরি হয়েছে?
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ: তৈরি কখন কীভাবে হয় তা কী করে বলব। তৈরি হতেও পারে, নাও পারে। কিন্তু যদি হয়ও কী ভাবে কোন দৈবস্পর্শে কে বলতে পারে, তার জবাব কে দিতে পারে! রবীন্দ্রনাথের কবিতায় আছে—এক খ্যাপা পরশ পাথর খুঁজে বেড়াচ্ছিল। পরশ পাথর সেই পাথর যার স্পর্শে লোহা সোনা হয়ে যায়। সমুদ্র পাড়ে দিনের পর দিন পাগলের মতো খোঁজার পর একদিন সে আবিষ্কার করল তার হাতের বালাটা সোনা হয়ে আছে। সে বুঝল পরশ পাথর খোঁজার কোনো এক সময় সে এর স্পর্শ পেয়ে গিয়েছিল কিন্তু সে তাকে চিনতে পারেনি। আমরাই কি এই পরশ পাথরদের সব সময় চিনতে পারি?
প্রশ্ন: বাংলাদেশ কি উন্নতির দিকে এগোচ্ছে?
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ: বাংলাদেশ বস্তুগত উন্নতির দিকে যাচ্ছে। কিন্তু নৈতিক দিকে অগ্রসর হয়নি। বরং পিছিয়েছে। এই ঢাকা শহরে একদিন বাঘ ছিল, চিতাবাঘ ছিল বিস্তর। আমার স্কুলজীবনেই বিজয় সরণির ওদিকে গেলে গা ছমছম করত। এই শহরে এখন সারা দেশের সম্পদ পুঞ্জীভূত হয়েছে। ২০৩৫ সালের মধ্যে ঢাকার চেহারা অনেকটাই বদলে যাবে। দৃষ্টিনন্দন হবে কিন্তু ব্যাপারটা হলো যে, টাকা থাকলে আমরা প্রাসাদ বানাতে পারি, কিন্তু প্রাসাদে থাকার জন্য রাজহূদয় দরকার, সেই রাজহূদয় একদিনে কোথায় পাব? আমাদের প্রাসাদ হচ্ছে, কিন্তু রাজহূদয় যে দূরআস্ত। তবে তাও হবে। আমি আশাবাদী মানুষ।