‘প্রতিটি মানুষ শতভাগ অসহায়’

এই লেখাটা একটু অন্য ধরনের। বলা যেতে পারে আত্ম-উপলব্ধিমূলক। ধরে নিলাম, আপনি কারো আগে-পিছে থাকেন না, সততা এবং সাবধানতার সাথে জীবন-যাপন করেন, নিজের মত করে থাকার চেষ্টা করেন। কিংবা ধরে নিলাম, আপনি তথাকথিত বিশাল ক্ষমতাধর, পয়সাওয়ালা ব্যক্তি। অবস্থান যেখানেই থাকুক, আপনি চাইলেই কি সকল ধরনের বিপদ-আপদ থেকে দূরে থাকতে পারেন? রোগমুক্ত থাকতে পারেন? এক কথায় উত্তর, না। কয়েকটা উদাহরণ দিলে হয়তো বুঝতে সুবিধা হবে।

  • আমার পরিচিত একজন আছেন, যিনি মোটর সাইকেলের ঘোর বিরোধী। সব সময় বলতেন, মোটর সাইকেল একটা ঝুঁকিপূর্ণ বাহন। উনি নিজে কখনোই মোটরসাইকেল চালাননি কিংবা কখনো তিনি এটাতে চড়েনও নি। কয়েকদিন আগে তিনি রাস্তার পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ করে পেছন থেকে একটা মোটর সাইকেল চালক উনাকে ধাক্কা দিয়ে চলে গেলেন। মাঝবয়সী মানুষটির পায়ের হাড় ভেঙে গিয়েছিল। উনার দুর্ঘটনার কথা শুনে প্রথমেই মনে হয়েছিল, যেখানে বাঘের ভয় সেখানে সন্ধ্যা হয়।
  • আমি এমন একজনকে চিনতাম, যিনি সব সময় বলতেন, এই সব খাবার খেলে হার্ট খুব ভালো থাকে। খাদ্য তালিকায় সব সময় সেই খাবারগুলো রাখতেন। অথচ উনি হার্ট অ্যাটাক করে মারাই গিয়েছিলেন।
  • আমার এক স্কুল বন্ধু। সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ। কয়েকদিন আগেও তার সাথে দেখা হয়েছিল। দেখা হওয়ার একদিন পরেই জানতে পারলাম, ওর কোমরে আর পায়ে খুব ব্যথা। হাটতে পারছে না। হাসপাতালে ভর্তি হল। এক্সরে করার পর জানতে পারল, পায়ের শিরায় ৭০% ব্লক। এখন অপারেশন করা লাগবে। অথচ সুস্থ একটা মানুষ ছিল। একদিনের ব্যবধানে মারাত্মক অসুস্থ। পুরোপুরি বিছানায় শয্যাশায়ী।
  • আমার বাসার পাশে একটা রেস্টুরেন্ট আছে। অফিস থেকে ফিরে মাঝেমধ্যে আমি সেখানে বসি। রেস্টুরেন্টের মূল কারিগর ছেলেটির নাম সুলতান। আমি গেলে আলাদাভাবেই খাতির-যত্ন করে। আমি কি খাব, আজকে কি খেলে ভালো লাগবে, বলার আগেই দেখা যায় সুলতান ব্যবস্থা করে ফেলে। সন্ধ্যার পর রেস্টুরেন্টে ঢুকলাম। সুলতান কে দেখতে পেলাম না। মালিককে জিজ্ঞেস করলাম, আপনার মূল কারিগর কোথায়? মালিক বলল, দুপুরে চুলা জ্বালানো ছিল। চুলার উপরের কড়াই পাশে রাখতে গিয়ে কড়াইয়ের গরম তেল সুলতানের হাতে, বুকে পড়ে যায়। ঐ সময় সুলতানকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। এখন বাসায় আছে। ২০/২২ বছর ধরে সুলতানের সারাটা দিন সময় কাটে গরম তেল, আগুনের সাথে। অথচ সেখান থেকেই দুর্ঘটনা।
  • আবার এমনও দেখা গেছে, একজন সুস্থ মানুষ। রাতে খেয়ে ঘুমিয়েছে। হঠাৎ করে পেট ব্যথা শুরু। আগে কখনো এই সমস্যা ছিল না। প্রচন্ড পেট ব্যথা। পরের দিন লবণ পানি থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের ট্যাবলেট খেলেন। কিন্তু পেট ব্যথা গেল না। পরে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী টেস্ট করে জানতে পারলেন, পাকস্থলীতে পাথর। দ্রুত অপারেশন করতে হবে।
  • মানুষ আসলেই খুব অসহায়। আগামীকাল আপনার জীবনে কি ঘটবে, সেটা তো অনেক দূরের ব্যাপার। এক মুহূর্ত পরে কি ঘটতে যাচ্ছে, সেটাই তো কেউ ধারণা করতে পারে না। আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে অনেক সময় হঠাৎ করে মানুষের মৃত্যু আমরা সরাসরি দেখতে পাচ্ছি। কথা বলতে বলতে মানুষ মারা যাচ্ছে। চলতে চলতে কখন যে কে থেমে যাবে, সেটা কল্পনা করার সামান্য শক্তি যদি মানুষের থাকত, তাহলে পৃথিবী থেকে অনেক অন্যায়, জুলুম, অবিচার দূর হয়ে যেত।

আমাদের উচিত নিজেদেরকেই প্রশ্ন করা। একবার ভাবুন তো, যাদের জন্য আপনি অন্যায়ভাবে, অন্যের সাথে প্রতারণা করে, অর্থ উপার্জন করছেন, আপনি বিপদে পড়লে কেউ কি আপনার অন্যায়, অপরাধের ভাগ নিবে? অন্যায় করার অপরাধে আপনার যদি কখনো শাস্তি হয়, আপনার সেই কষ্টের ভাগীদার কাউকে পাবেন? কাউকে পাবেন না। পৃথিবী একটা নোংরা স্বার্থপরের জায়গা। 

এখানে আপনার সকল দুঃখ-কষ্ট কখনো দূর হবে না। কারণ একটা সমস্যা দূর হলে, আপনার সামনে আরেকটা সমস্যা হাজির হবে। একইভাবে সকল প্রত্যাশাও কখনো পূরণ হয়না। একটা পূরণ হলে, নতুন প্রত্যাশা এসে যোগ হয়। মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত এভাবেই চলতে থাকে। সব কিছুতেই মানুষ অসহায়। এই আত্ম উপলব্ধি আমাদের সকলের থাকা প্রয়োজন। আর শুধুমাত্র দৌড়ানোর নাম জীবন নয়। চাওয়া পাওয়ার প্রতিযোগিতায় না নেমে থামতে শিখুন। সময়মত থামতে পারার নামও জীবন।

লেখক : যুগ্ম পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক।