শিক্ষা ও জ্ঞানের ক্ষেত্রে ইসলাম যেরূপ জোর তাগিদ দিয়েছে, অন্যকোনো ধর্মে সেরূপ তাগিদ দেওয়া হয়নি। পবিত্র কোরআন ও রসুলুল্লাহর (স.) শিক্ষা মুসলমানদের মধ্যে জ্ঞানস্পৃহার সঞ্চার করে। রসুলুল্লাহর (স.) পবিত্র বাণী থেকে জানা যায় যে, শিক্ষালাভ করাকে তিনি প্রত্যেক মুসলমানের অবশ্য কর্তব্যরূপে, এমন কি, আল্লাহর প্রতি গভীর অনুরাগ হিসেবে বিবেচনা করেন। তিনি দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত জ্ঞানার্জনের প্রতি গুরুত্বারোপ করেন।
মুসলমানগণ খিলাফত যুগের সুপ্রসিদ্ধ পূর্বসূরিদের কাছ থেকে একটি মূল্যবান শিক্ষাপদ্ধতি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করেন। এ উপমহাদেশেও তারা রাজনৈতিক মতবাদের সঙ্গে শিক্ষাগত ও সাংস্কৃতিক চিন্তাধারাও নিয়ে আসেন। এ প্রসঙ্গে এনএনল মন্তব্য করেন যে, ‘ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের ভারত অভিযান কেবল একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যাপারেই সীমাবদ্ধ নয়, শিক্ষা ও জ্ঞানের ক্ষেত্রেও এটি যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা করে।’ প্রকৃতপক্ষে, মুসলমানগণ এ উপমহাদেশের শিক্ষাক্ষেত্রে সর্বজনীনতা ও উদারতার আদর্শের প্রবর্তন করেন। তারা সব মানুষের কাছে এবং এমন কি ব্রাহ্মণদের উপেক্ষিত নিম্নশ্রেণির হিন্দুদের কাছেও শিক্ষার দ্বার উন্মুক্ত করে দেন। মুসলিম সুফি-দরবেশগণ তাদের অনুগামী শিষ্যদের শিক্ষার প্রতি জোর দেন এবং যথার্থভাবে শিক্ষিত না হওয়া পর্যন্ত কোনো ব্যক্তিকে তার শিষ্যত্বে বরণ করেননি।
মধ্যযুগীয় ইউরোপের মঠের অনুরূপ মুসলিম খানকাহ্সমূহও শিক্ষা বিশেষত ধর্মীয় শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করে। ভারতের সর্বত্র দৃশ্যমান দরগাহ্ অথবা মাজারসমূহ হচ্ছে দরবেশ হিসেবে সুপরিচিত বিখ্যাত সুফিদের সমাধিস্থল, যাদের তাদের গভীর জ্ঞানের জন্য জনগণ মুর্শিদ বা আধ্যাত্মিক শিক্ষক হিসেবে ভক্তি ও শ্রদ্ধা করত। এ সব সুফি-পণ্ডিতদের মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ ছিলেন আজমিরের মুইনউদ্দিন চিশতি (রহ.)। মহান খাজা মুইনউদ্দিন চিশতি (রহ.) ছিলেন ভারতে চিশতিয়া তরিকার প্রতিষ্ঠাতা। ১২৩৬ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ইন্তেকাল করেন এবং তখন থেকেই তার সমাধিস্থল অসংখ্য পুণ্যার্থীর তীর্থস্থান হিসেবে পরিগণিত। তার প্রচারিত মতাদর্শ তার সুপ্রসিদ্ধ অনুগামীদের দ্বারা অনুসৃত হয়, যারা তাদের জীবদ্দশায় খানকাহ্ প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে বিদ্যালয়ও ছিল। এসব বিদ্যালয়ে ধর্মীয় শিক্ষাদানের পাশাপাশি মরমি মতাদর্শও প্রচার করা হতো। এসব শিক্ষাকেন্দ্র রাষ্ট্র কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত মক্তব ও মাদ্রাসার শিক্ষাকার্যক্রমের পরিপূরক হিসেবে ব্যাপকভাবে কাজ করে।
বাংলার চিশতিয়া সুফিগণ শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে উত্তর-ভারতীয় চিশতিয়া সুফিগণের আদর্শই অনুসরণ করেন। তারা বাঙালি জনগণের শিক্ষাবিষয়ক উন্নতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। অধিকাংশ চিশতিয়া সুফিগণই ঐ যুগের শ্রেষ্ঠ আলেম ছিলেন। আখি সিরাজউদ্দিন উসমান, আলাউল হক, নূর কুতুব-উল-আলম, মীর সৈয়দ আশরাফ জাহাঙ্গীর সিমনানি ও অন্যান্য সুফিদের জীবন এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। তাদের প্রতিষ্ঠিত খানকাহ্গুলো ছিল শিক্ষা ও জ্ঞানের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। আখি সিরাজউদ্দিন অতি তরুণ বয়সে সে যুগের সবচেয়ে খ্যাতিমান সুফি সাধক শায়খ নিজামউদ্দিন আউলিয়ার শিষ্য হওয়ার বাসনায় দিল্লি গমন করেন। কিন্তু নিজামউদ্দিন আউলিয়া মন্তব্য করেন, ‘আধ্যাত্মিক ব্রতের জন্য শিক্ষাই হলো প্রথম স্তর; কিন্তু তার (আখি সিরাজ) সেরূপ শিক্ষা নেই।’
নিজামউদ্দিন আউলিয়া বলতেন যে, ‘শিক্ষাহীন সুফি শয়তানের ভাঁড়স্বরূপ।’ অবশেষে নিজামউদ্দিন আউলিয়ার অন্যতম বিদ্বান শিষ্য মাওলানা ফখরউদ্দিন জাররাদি আখি সিরাজউদ্দিনের শিক্ষার ভার গ্রহণ করেন। আখি সিরাজউদ্দিন মাওলানা রুকনউদ্দিনের অধীনেও শিক্ষা লাভ করেন। আখি সিরাজউদ্দিন লক্ষণাবতীতে একটি ‘খানকাহ্’ প্রতিষ্ঠা করেন। এই খানকাহ্ ধমীর্য়, শিক্ষা, সাংস্কৃতিক ও মানবসেবামূলক কার্যাবলির কেন্দ্রে পরিণত হয় এবং এর প্রভাব সমগ্র দেশে বিস্তার লাভ করে। নিজামউদ্দিন আউলিয়ার গ্রন্থাগারের কিছু সংখ্যক পুস্তক আখি সিরাজউদ্দিন লক্ষণাবতীতে সঙ্গে করে এনেছিলেন এবং এগুলোর দ্বারাই এদেশে ইসলামি মরমিবাদসংক্রান্ত প্রথম গ্রন্থাগার গড়ে ওঠে।
বাংলার সুপ্রসিদ্ধ চিশতিয়া সুফি শায়খ আলাউল হক ও তদীয় প্রখ্যাত পুত্র শায়খ নূর কুতুব-উল-আলমের খানকাহ্ ছিল বিদ্যাশিক্ষা ও আধ্যাত্মিক জ্ঞানার্জনের বিখ্যাত কেন্দ্র। নূর কুতুব-উল-আলম পান্ডুয়ায় একটি সুবৃহৎ মাদ্রাসা ও চিকিত্সালয় প্রতিষ্ঠা করেন। এর ব্যয়ভার নির্বাহের জন্য বাংলার সুলতান আলাউদ্দীন হোসেন শাহ্ ভূমি দান করেন। এই বিশাল শিক্ষালয়টি উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে জ্ঞানান্বেষণকারীদের আকৃষ্ট করে এবং এই শিক্ষালয়ে বহু বিশিষ্ট আলেম ও সুফি শিক্ষাপ্রাপ্ত হন এবং তারা কয়েক শতাব্দী তাদের আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব ও জ্ঞানের দ্বারা বাংলার গৌরব বৃদ্ধি করেন।
কেবল সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনেই নয় বরং সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও চিশতিয়া সুফিগণ তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। শায়খ নূর কুতুব-উল-আলম মরমিবাদ সম্বন্ধে কবিতা রচনা করেন। তিনি আনিছ-আল-গুরাবা নামে ফার্সি ভাষায় মহানবির (স.) চল্লিশটি হাদিছ সংকলন করেন। বিভিন্ন শায়খ, উলেমা ও অনুগামী শিষ্যদের কাছে লিখিত নূর কুতুব-উল-আলমের যে কতিপয় পত্রাবলি প্রকাশিত হয় তাতে তার ইসলামি মরমিবাদের সুগভীর জ্ঞানের পরিচয় পাওয়া যায়। নূর কুতুব-উল-আলমের অনুগামী শিষ্য হুসামউদ্দিন মানিকপুরি রফিক-আল-আরেফিন এবং আনিছ-আল-আশেকিন নামে দুটি প্রসিদ্ধ গ্রন্থ রচনা করেন, যা ইসলামি মরমিবাদ শিক্ষার জন্য সুবিদিত। এই আধ্যাত্মিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অগ্রদূতদের কাছে বাঙালি মুসলমান সমাজ গভীরভাবে ঋণী।
প্রকৃতপক্ষে বাংলার চিশতিয়া সুফিগণের খানকাসমূহ ছিল ধর্মীয় ও বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনের মহাকেন্দ্রস্বরূপ। এ কেন্দ্রগুলো কেবল বাংলার জন্যেই নয়, বরং সমগ্র ভারতের জন্য সুফি-দরবেশ ও পণ্ডিত ব্যক্তিদের জন্ম দেয়। আশরাফ জাহাঙ্গীর সিমনানি, নাছিরউদ্দিন মানিকপুরি, হুসাইন জুক্কারপোষ, হুসামউদ্দিন মানিকপুরি, শায়খ কাকু ও উত্তর ভারতের অন্যান্য কয়েক জন বাংলার আধ্যাত্মিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনের খ্যাতনামা শিক্ষার্থীর ছিলেন। এভাবেই বাংলার চিশতিয়া সুফিগণ বাঙালি মুসলমানদের শিক্ষা ও সংস্কৃতিবিষয়ক উৎকর্ষ সাধনের ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রাখেন।
লেখক: অধ্যাপক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়