ঝরনা দেখার আনন্দ রূপ নিলো বিষাদে!

চট্টগ্রামের একদল শিক্ষার্থী মিরসরাইয়ের খৈয়াছড়া ঝরনা দেখে ফেরার পথে তাদের বহনকারী মাইক্রোসে ট্রেনের ধাক্কায় ১১ জন শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে। এই ঘটনায় আহত হয়েছে আরো ৬ জন। গতকাল শুক্রবার বেলা দেড়টার দিকে উপজেলার ১২নং খৈয়াছড়া ইউনিয়নের পূর্ব খৈয়াছড়া গ্রামের ঝরনা এলাকার রেলক্রসিংয়ে মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনা ঘটে। এতে শিক্ষার্থীদের ঝর্ণা দেখার আনন্দ মুহূর্তেই বিষাদে পরিণত হয়ে যায়। দুর্ঘটনার পর থেকে এদিন বিকাল ৫টা পর্যন্ত ঢাকা-চট্টগ্রাম রেললাইনের চট্টগ্রামমুখী অংশে রেল যোগাযোগ বন্ধ থাকে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছে, ট্রেন আসার সময় রেলক্রসিংয়ে বাঁশের বার ফেলা থাকলেও মাইক্রোবাসের চালক তা ঠেলে রেললাইনে উঠে পড়েন। কিন্তু লাইন পার হবার আগেই দ্রুতগতির ট্রেনটি ধাক্কা দেয় মাইক্রোবাসকে। তবে আরেকটি পক্ষের দাবি, গেটম্যান মো. সাদ্দাম হোসেন গেটবার না ফেলে জুমা’র নামাজ আদায় করতে গিয়েছিলেন।

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, শুক্রবার সকালে চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার আমান বাজার এলাকা থেকে একটি মাইক্রোবাসযোগে খৈয়াছড়া ঝরনা দেখতে যায় ১৬ শিক্ষার্থী। ঝরনা দেখা শেষে বেলা দেড়টায় দিকে ফেরার পথে ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা মহানগর প্রভাতি তাদের বহনকারী মাইক্রোবাসকে ধাক্কা দিলে ঘটনাস্থলেই ১১ জন নিহত হয়। আহতদের প্রথমে মিরসরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ও পরে তাদের অবস্থার অবনতি হলে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।

নিহতরা হচ্ছে, গাড়ীর চালক আবদুর আজিম সাব রেজিঃ বাড়ি হাজী মোহাম্মদ ইউসুফের ছেলে গোলাম মোস্তফা নিরু (২৬), হাজী জালাল কোম্পানি বাড়ীর মো: ইলিয়াছের ছেলে মোহাম্মদ হাসান (১৮), লাইনম্যান কবিরের বাড়ির আবদুল হামিদের ছেলে শিক্ষক জিয়াউল হক সজীব (২২), আজিজ মেম্বারের বাড়ির জানে আলমের ছেলে ওয়াহিদুল আলম জিসান (২৩), বজল কন্ট্রাক্টর বাড়ির মোজাফফর আহমদের ছেলে মোসহাব আহমেদ হিসাম (১৬), বাছা মিয়া সওদাগর বাড়ির মনসুর আলমের ছেলে মো. মাহিম (১৭), আবু মুসা খান বাড়ির মোহাহের হোসেনের ছেলে মোস্তফা মাসুদ রাকিব (১৯), মজিদ আব্বাস চৌ. বাড়ির বাদশা চৌধুরীর ছেলে শিক্ষক রিদুয়ান চৌ (২২), পারভেজের ছেলে সাগর (১৭), আবদুল ওয়াদুদ মাস্টারের বাড়ির আবদুল মাবুদের ছেলে ইকবাল হোসেন মারুফ (১৭), আবদুস শুক্কুর লাইনম্যান কবিরের বাড়ি আয়াতুল ইসলাম (১৭)।

চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের মেডিক্যাল অফিসার নিবেদিতা ঘোষ বলেন, ট্রেন দুর্ঘটনায় আহত ছয়জনকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আনা হলে তাদেরকে হাসপাতালের ২৮ ও ২৪ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করানো হয়। এরা হলেন- মাইক্রোবাসের হেলপার তৌকিদ ইবনে শাওন (২০)। তিনি আকবর শাহ থানাধীন শেরশাহ কলোনির মো. সোলাইমানের ছেলে। আহত বাকী পাঁচজন হলো- আমান বাজার এলাকার মৃত পারভেজ এর ছেলে তছমির পাবেল (১৬), মনসুর আলমের ছেলে মো. মাহিম (১৮), ছৈয়দুল আলমের ছেলে মো. সৈকত (১৮), আব্দুর রহিমের ছেলে তানভীর হাসান হূদয় (১৮) ও আবুল কাসেমের ছেলে মো ইমন (১৯)। তাদের সকলের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

এদিকে ঘটনার পরপর মিরসরাই থানা পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের উদ্ধার কর্মীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে দুর্ঘটনাকবলিত মাইক্রোবাস থেকে হতাহতদের উদ্ধার করে। পরে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক করতে লেনের ওপর থাকা দুর্ঘটনাকবলিত মাইক্রোবাসটি অপসারণ করতে ফায়ার সা‌র্ভিস কমী‌র্রা চেষ্টা চালায়। পরে বিকাল ৫টার নাগাদ মাইক্রোবাসটি লেন থেকে অপসারণ করতে সক্ষম হয়। এরপর ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়।

এসময় দোকানদার ভোলা মিস্ত্রী জানান, ঘটনার পর থেকে গেটকিপারকে দেখা যায়নি। তবে তারা শুনেছেন, দুর্ঘটনার সময় গেটকিপার সাদ্দাম পাশের একটি মসজিদে জুমা’র নামাজ আদায় করতে গিয়েছিলেন। রেল লাইনে গেইটবার ফেলানো ছিলো না বলে তারা শুনেছেন।

চট্টগ্রাম রেলওয়ে থানার অফিসার ইনচার্জ মো. নাজিম উদ্দিন বলেন, প্রাথমিক ভাবে ধারণা করা হচ্ছে গেইটম্যানের দায়িত্বে অবহেলার কারণে এতো বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে। তাকে সন্ধ্যা ৬টায় আটক করা হয়েছে। নিহতদের লাশ চট্টগ্রাম রেলওয়ে থানায় নেওয়া হয়েছে। সেখানে থেকে পরিচয় সনাক্ত করে স্বজনদের কাছে লাশ হস্তান্তর করা হবে।

চট্টগ্রাম রেঞ্জের পুলিশের ডিআইজি আনোয়ার হোসেন জানান, নিহতরা একটি কোচিং সেন্টারের শিক্ষার্থী। এদের ৬ জন এসএসসি পরীক্ষার্থী, ৫ জন এইচএসসি পরীক্ষার্থী।

চট্টগ্রাম জেলা রেলওয়ে পুলিশের পুলিশ সুপার মো. হোসেন চৌধুরী বলেন, দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। চট্টগ্রাম পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের জিএম মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ট্রেন দুর্ঘটনায় হতাহতের বিষয়টি অত্যন্ত বেদনাদায়ক। ঘটনা তদন্তে চট্টগ্রাম রেলওয়ের এডিশনাল চীফ ইঞ্জিনিয়ার ট্র্যাক আরমান হোসেনকে প্রধান করে ৪ সদস্য বিশিষ্ট একটি ও বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা মো. আনছার আলীকে প্রধান করে ৫ সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি ঘটন করা হয়েছে। আগামী ৩ কার্যদিবসের মধ্যে তাদের প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন ফেলে দুর্ঘটনার মূল কারণ জানা যাবে। ঘটনার অধিকতর তদন্তের জন্য গেইটম্যান সাদ্দাম হোসেনকে রেলওয়ে পুলিশ হেফাজতে দেওয়া হয়েছে।

আহতদের অবস্থা আশঙ্কাজনক: চট্টগ্রাম অফিস জানায়, দুর্ঘটনায় আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীনরা আছে তৌকিদ ইবনে শাওন, তাসমির পাভেল, মো. মাহিম, মো. সৈকত, তানভীর হাসান হৃদয় ও মো. ইমন। এদের মধ্যে ৫ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। মিরসরাইয়ে দুর্ঘটনায় হতাহতদের অধিকাংশই হাটহাজারীর যুগীরহাট এলাকার আরঅ্যান্ডজে কোচিং সেন্টারের শিক্ষার্থী। কোচিং সেন্টারের চারজন শিক্ষকও ছাত্রদের সাথে মিরসরাই গিয়েছিল। তারা নিজেরাও ছাত্র।

কীভাবে দুর্ঘটনাটি ঘটলো: পুলিশ ও স্থানীয় লোকজনের বরাত দিয়ে বিবিসি জানায়, ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাওয়া আন্ত:নগর ট্রেন মহানগর প্রভাতীকে দেখেও মাইক্রোবাসটি দ্রুত লেভেল ক্রসিং পার হওয়ার চেষ্টা করছিলো। মূহুর্তের মধ্যেই মাইক্রোবাসটি ট্রেনের সামনের ইঞ্জিনের ধাক্কায় দুমড়ে মুচড়ে যায়। দ্রুতগতি সম্পন্ন ট্রেনটি মাইক্রোবাসটিকে ঠেলে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে নিয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত যেখানে গিয়ে ট্রেনটি থামে সেখানে ট্রেনের সামনেই মাইক্রোবাসটি লাইনের ওপরই আড়াআড়ি পড়ে ছিল।

স্হানীয়রা কয়েকজন জানিয়েছেন, ট্রেনটি যখন আসছিলো তখন বাঁশের একটি ব্যারিয়ার সেখানে দেয়া ছিলো। কোন গার্ড না থাকলেও মাইক্রোবাস যাত্রীরা নিজেরাই ব্যারিয়ারটি সরিয়ে ফেলে। অর্থাৎ ট্রেনটি ক্রসিংয়ে আসার আগেই রেললাইন পার হওয়ার চেষ্টা করছিলো মাইক্রোবাসটি। অন্যদিকে চট্টগ্রামের রেল কর্মকর্তাদের দাবি, ওই গেটে গেটকিপার ছিলো এবং ট্রেন আসার আগে গেটও ফেলা হয়েছিলো। কিন্তু মাইক্রোবাসের চালক জোর করেই ব্যারিকেড তুলে মাইক্রোবাস নিয়ে ট্রেন লাইনে উঠে যান।