ডি-৮ সম্মেলন-২০২২ বাংলাদেশের অর্জন ও সম্ভাবনা

দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্হিতিশীল দেশ হিসেবে বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের গুরুত্ব ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে, বিগত এক দশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের নেতৃত্বদানের চিত্র বিশেষভাবে লক্ষণীয়। আন্তঃসরকারি আন্তর্জাতিক সংগঠন তথা ডি-৮ গ্রুপে বাংলাদেশের নেতৃত্ব দান ও সাংগঠনিক তত্পরতা দৃষ্টি কেড়েছে সবার। ডি-৮ এর ২০২১ সালের শীর্ষ সম্মেলনে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে সভাপতিত্ব হস্তান্তর করেন। এরই ধারাবাহিকতায় গত ২৭ জুলাই ঢাকায় ডি-৮ সম্মেলনের মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে—পুনরায় সভাপতিত্বের দায়িত্ব পড়েছে বাংলাদেশের ওপর। এবারের সম্মেলনে প্রাধান্য পেয়েছে সংকটকালীন নানা সমস্যা। খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা, বাণিজ্য, পর্যটন ও জলবায়ু পরিবর্তনসহ বেশ কিছু সমসাময়িক বিষয় ঘুরেফিরে এসেছে আলোচনার টেবিলে। ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও বৈশ্বিক চলমান সংকটকালে ‘বৈশ্বিক সত্তা’ হিসেবে দ্বিপাক্ষিক এবং বহুপাক্ষিক সম্পৃক্ততার মাধ্যমে ডি-৮ বিশ্ব অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে বদ্ধপরিকর বলেই মনে হয়েছে আমাদের।

এই সংগঠনটি পাঁচটি অনন্য বৈশিষ্টের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। প্রথমত, নব্য আঞ্চলিকতার যুগে এটি একটি আন্তঃআঞ্চলিক সহযোগিতার উদ্যোগ। দ্বিতীয়ত, এটি মধ্যম এবং ক্রমবর্ধমান শক্তিগুলোর যৌথ প্রচেষ্টাকে উপস্হাপন করে, যা বিশ্বের একটি নতুন ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। তৃতীয়ত, এটি ইসলামি সভ্যতার ইতিহাস এবং পরিচয়ের ভিত্তিতে সংহতিকে মেলে ধরে। চতুর্থত, অন্যান্য বহুপাক্ষিক সংগঠনের তুলনায় ডি-৮-এর নীতিগুলো অনন্য; যেমন—এটি সংঘর্ষের পরিবর্তে শান্তির কথা বলে:সংঘাতের পরিবর্তে সংলাপ, শোষণের পরিবর্তে সহযোগিতা, দ্বিমুখী নীতির পরিবর্তে ন্যায়বিচার, বৈষম্যের পরিবর্তে সমতা এবং নিপীড়নের পরিবর্তে গণতন্ত্রই এ সংগঠনের মূলনীতি।

১৯৯৭ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বাংলাদেশ ডি-৮-এর সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। বিশেষ করে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই বহুপাক্ষিক গুরুত্বপূর্ণ সংগঠনের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে সংযুক্ত। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৯৭ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম ডি-৮ শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন। ১৯৯৯ সালে ঢাকায় দ্বিতীয় ডি-৮ শীর্ষ সম্মলন সফলতার আলো ছড়িয়েছিল। কোভিড-১৯-এর চ্যালেঞ্জিং সময়েও বাংলাদেশ সফলভাবে দশম শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজন করার মধ্যে দিয়ে সংগঠনটিকে আরো দৃশ্যমান করে তোলে। সংগঠনটিকে আরো কার্যকর করতে বাংলাদেশ আন্তরিক প্রতিশ্রুতি প্রদর্শন করে আসছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০২১-এর ডি-৮ সম্মেলনে সদস্য রাষ্ট্রেগুলোর উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘দক্ষতা বিকাশের মাধ্যমে আমাদের তরুণদের শক্তি বাড়ানো, আইসিটির সম্পূর্ণ সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো, প্রয়োজনীয় আইনি, প্রাতিষ্ঠানিক এবং অবকাঠামোগত কাঠামো তৈরি করা এবং বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সুবিধার্থে সংযোগ স্হাপনের উন্নতিতে কাজ করে যাচ্ছি আমরা।’ প্রধানমন্ত্রীর কথার বাস্তব চিত্র দেখছি আমরা বিভিন্ন সেক্টরে। বাস্তবিক অর্থেই, সংগঠনটিকে আরো প্রাণবন্ত, সক্রিয় এবং কার্যকর করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশ।

২০২২-এর বিশ্ব এখন মোটা দাগে দ্বৈত সংকটে—করোনা মহামারি এবং ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে ডি-৮-এর মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার বিষয়টি কূটনৈতিক মহলে প্রশংসার দাবি রাখে নিঃসন্দেহে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে জ্বালানি ও খাদ্যসংকট ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। যুদ্ধের দীর্ঘস্হায়িতা বিশ্ববাসীর মধ্যে এই শঙ্কাকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। এসবের মধ্যেই বাংলাদেশকে নিজস্ব জনসংখ্যার বাইরে প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর বাড়তি বোঝা টানতে হচ্ছে। সার্বিক বিচারে বাণিজ্য, খাদ্য, জ্বালানির সমস্যা নিরসনের বিকল্প পথ খোঁজা এবং বিশ্ববাজারের অনিশ্চয়তা দূরের প্রচেষ্টার পাশাপাশি রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক আলোচনার নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে ডি-৮-এর সদ্যসমাপ্ত সম্মেলনে।

একটি অনন্য বহুমাত্রিক সংগঠন হিসেবে ডি-৮ শুরু থেকেই ব্যাপক সম্ভাবনাময় হলেও, এখনো অনেক কিছুই অবিশ্লেষিত। ২৫ বছরের পথচলায় ডি-৮ বৈশ্বিক কূটনীতি এবং আন্তঃসংগঠন সহযোগিতায় তেমন বড় প্রভাব ফেলতে পারেনি বটে; তবে, সাংগঠনিক বিবর্তনে বেশ কয়েকটি মাইলফলক অর্জন করেছে গ্রুপটি। এদিক থেকে ডি-৮কে আন্তঃআঞ্চলিক সহযোগিতা এবং কূটনীতির ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফরম হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। এবারের সম্মেলনে ডি-৮-এর বেশ কিছু সম্ভাবনাময় দিক সামনে এসেছে। ডি-৮ ১৯৯৭ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে ১১টি শীর্ষ সম্মেলন আয়োজনের সফলতা দেখিয়েছে। এটি যে কোনো আঞ্চলিক বা আন্তঃআঞ্চলিক সংস্হার জন্য একটি বিশাল অর্জন। এর মাধ্যমে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বহুপাক্ষিক সহযোগিতার সদিচ্ছা ও পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বোঝাপড়ার পরিবেশ প্রসারিত হয়েছে।

সদস্যগুলোর মধ্যে বহুমাত্রিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে কৃষি এবং খাদ্যনিরাপত্তা, বাণিজ্য, পরিবহন, শিল্প সহযোগিতা, পর্যটন, জ্বালানি ও খনিজের মতো উন্নয়নের প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলো সম্পর্কে সুস্পষ্ট রূপরেখা অঙ্কিত হয়েছে। তাছাড়া, ডি-৮-এর প্রস্তাবিত বিষয়গুলোর মধ্যে প্রেফারেনশিয়াল ট্রেডিং অ্যারেঞ্জমেন্ট (পিটিএ) একটি। ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের রিপোর্ট অনুযায়ী, আগামী ২০২৩-এ ডি-৮-এর সদস্যগুলো পিটিএ বাস্তবায়িত করবে বলে আশা করা হচ্ছে। কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার যুগে বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক পর্যায়ে বৈদেশিক নীতি বাস্তবায়নের পরিপূরক হিসেবে ডি-৮ একটি ভূরাজনৈতিক ব্লক হিসেবে আবিভূ‌র্ত হচ্ছে ক্রমশ। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, সংযোগ এবং প্রযুক্তি শেয়ারিংয়ের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে গ্রুপটিকে অপার সম্ভাবনার ‘পীঠভূমি’ হিসেবে দেখছেন অনেকেই। উপরন্তু, বাণিজ্য, সুরক্ষাবাদ, কোভিড মহামারি, দারিদ্র্য, জলবায়ু পরিবর্তন, সন্ত্রাসবাদ, কানেকটিভিটি, মানবিক সহায়তা, অভিবাসনবিরোধীর মতো বিষয়গুলোতে বৈশ্বিক ফোরামে কূটনৈতিক দরকষাকষির জন্য একটি সম্ভাবনাময় প্ল্যাটফরম তৈরি করেছে ডি-৮।

ডি-৮ বাংলাদেশের জন্য বিভিন্ন দিক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনীতি থেকে শুরু করে কূটনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক ক্ষেত্রে চমত্কার সুযোগ প্রদান করে সংগঠনটি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর ঐতিহাসিক মুহূর্ত উপলক্ষ্যে বাংলাদেশ ডি-৮-এর দশম শীর্ষ সম্মেলন আয়োজন করে ১১তম সম্মেলন আয়োজনেও সফলতা দেখিয়েছি আমরা। এর মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বিশ্ব নেতৃবৃন্দের সঙ্গে বাংলাদেশের ধারাবাহিক শীর্ষ বৈঠকের ফলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্ব, রাষ্ট্রপরিচালনা এবং সক্ষমতা প্রদর্শিত হলো বিশ্ববাসীর সামনে। তুরস্ক থেকে ডি-৮-এর সভাপতিত্ব পাওয়ার পর ডি-৮-এর সম্মেলন আয়োজনের মাধ্যমে বাংলাদেশ তার কূটনৈতিক তত্পরতা বৃদ্ধির সুযোগ পাচ্ছে। বাংলাদেশ বর্তমানে ইন্ডিয়ান ওশান রিম অ্যাসোসিয়েশনের (আইওআরএ) ভাইস চেয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক বিশেষ সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন, যা অত্যন্ত ইতিবাচক।

একাদশ সম্মেলনের মাধ্যমে বাংলাদেশ ডি-৮-এ একটি নতুন গতিশীল ও উদ্ভাবনী ধারণার জন্ম দিয়েছে, যা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বৈদেশিক নীতি এবং বিভিন্ন উন্নয়ন-চ্যালেঞ্জকে তুলে ধরার একটি উপলক্ষ্য প্রদান করে। এর ফলে বাণিজ্য, রোহিঙ্গাসংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, বিনিয়োগ, খনিজ সম্পদ, আইসিটি ও পর্যটনকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্র প্রসারিত হবে সামনের দিনগুলোতে। ভূরাজনীতি ও কৌশলের ক্ষেত্রে এই ডি-৮-এর গুরুত্ব অপরিময়। গ্রুপটিতে বাংলাদেশের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং সভাপতিত্ব, বাংলাদেশের সাথে চীন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপান এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের দরকষাকষির ক্ষেত্রে কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই নেতৃবৃন্দকে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনে সমর্থন দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। এর মাধ্যমে মিয়ানমার সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য সমর্থন জোগাড় করার জন্য একটি নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। মোটকথা, ডি-৮ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং সামাজিক অগ্রগতিতে সাফল্যের গল্প তুলে ধরার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ফোরাম, যা কার্যত বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে উত্তরোত্তর সমুন্নত করবে।

একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, ডি-৮ সংগঠনের নেতৃৃবৃন্দ দেখিয়েছেন, তারা একসঙ্গে কাজ করতে পারেন। ডি-৮-এর শক্তিশালী দিক হলো—এটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে নেতারা বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক চ্যালেঞ্জসমূহ নিয়ে আলোচনা এবং বিভিন্ন সমস্যা সম্পর্কে তাদের মতামত বিনিময় করতে ১১ বার সম্মেলনে বসেছেন। অর্থাত্, বিশ্ব ব্যবস্হায় ডি-৮-এর সদস্যরাষ্ট্রগুলো এখন ‘শক্তিশালী অর্থনৈতিক শক্তি’ হিসেবে বিবেচিত। আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে ডি-৮-এর গুরুত্ব অনুধাবন করে গত ফেব্র‚য়ারিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘ডি-৮ অন্তভু‌র্ক্ত দেশগুলো একসঙ্গে কাজ করলে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক জোট তৈরি করা সম্ভব।’ ২০২১ সালে কোভিড মহামারিকালে শীর্ষ সম্মেলন আয়োজনের পরের বছরেই অর্থাত্ বিশ্বরাজনীতির চলমান সংকটের মধ্যে মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক আয়োজন করা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জন্য একটি টার্নিং পয়েন্ট ছিল। এবারের সফল সম্মেলন আয়োজন মধ্য দিয়ে সক্ষমতার প্রশ্নে আরো এক ধাপ এগিয়ে গেল বাংলাদেশ। বাংলাদেশের দক্ষ ও সফল নেতৃত্ব এই সংগঠনকে নতুন উদ্দীপনা দিচ্ছে—এ কথা বলাই বাহুল্য। সামনের দিনগুলোতে আঞ্চলিক কিংবা আন্তর্জাতিক পরিসরে টেকসই পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্র সমুন্নত রাখার মাধ্যমে বাংলাদেশ ‘অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করবে’ বললে বাড়িয়ে বলা হবে না মোটেই।

লেখক: আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক