‘জয়পাড়ার মনির’ নামে এক দালালের (আসল বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া) মাধ্যমে লেবানন যান নারগিস আক্তার। দালাল বিদেশ যাওয়া বাবদ ৫০ হাজার টাকা নেয়। তাকে লেবাননে এক বাসায় গৃহপরিচারিকার কাজ দেয়। সেখানে অনেক নির্যাতন সহ্য করে কাজ করেন। পরে গৃহকর্তার দ্বারা যৌন নির্যাতন ও অত্যাচার বেড়ে গেলে সেখান থেকে তিনি পালিয়ে যান। বাংলাদেশে তার পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুব খারাপ থাকায় তিনি দেশেও ফিরতে চাননি। ২০২০ সালের শেষ দিকে বাংলাদেশে ফেরত আসেন তিনি। দেশে ফেরার পর প্রতিবেশীরা তার সঙ্গে কথা বলেনি। অনেকে তাকে নিয়ে কটূক্তি করেছে।
আরেক জন সৌদি আরব ফেরত গৃহকর্মী বেবী আক্তার জানান, চলতি বছর জানুয়ারি মাসে দালালের মাধ্যমে ৪০ হাজার টাকা খরচ করে সৌদি আরব গিয়েই বিপদে পড়েন। মালিক খেতে দেয় না। মারধর করে। তিন দিন বাথরুমে আটকায় রাখে। একদিন সুযোগ বুঝে পালান তিনি। অনেক কষ্টে বাংলাদেশ দূতাবাসে পৌছান । ১৫ দিন দূতাবাসের তত্ত্বাবধানে থাকার পর দেশ থেকে ২২ হাজার টাকা পাঠালে দেশে ফেরা হয় তার। সম্প্রতি জাতীয় প্রেসক্লাবে এ সম্পর্কিত এক অনুষ্ঠানে এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা জানান তারা। বেশ কয়েক দশক ধরে দেশের অভিবাসী নারী শ্রমিকরা রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখলেও তাদের নিরাপদ অভিবাসন বাধা দূর হচ্ছে না—এমন অবস্থায় আজ (৩০ জুলাই) বিশ্ব জুড়ে পালিত হচ্ছে বিশ্ব মানব পাচার প্রতিরোধ দিবস। দিবসটি উপলক্ষে বিজ্ঞজন নিরাপদ নারী অভিবাসন নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
কিছু পরিসংখ্যান :জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো—বিএমইটির তথ্য মতে, ১৯৯১ সাল থেকে ২০২২-এর মে পর্যন্ত ১০ লাখ ৫০ হাজার ৮১৯ জন নারী অভিবাসী হয়েছেন। যাদের অনেকের নির্যাতনের সংবাদ গণমাধ্যমে প্রকাশ পায়। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের তথ্য মতে, ২০২০ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সন্তান নিয়ে দেশে ফিরেছেন ১২ জন নারী। মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফিরেছেন ৬৫ জন। ২০২১ সালের ২২ অক্টোবর রাতে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে দেশে ফেরেন এক বাংলাদেশি নারী কর্মী। সেন্টার ফর উইমেন অ্যান্ড চিলড্রেন স্টাডিজ সিডব্লিউসিএসের প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ইসরাত শামীম বলেন, অভিবাসী নারী শ্রমিকরা যেমন দেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখছে। নিজেদের পরিবারেও স্বচ্ছলতা আনছেন। তারাই বেশি নির্যাতনের শিকার হন। তারা দালালদের মাধ্যমে অনেক টাকা খরচ করেও পাচারের শিকার হন।
আইনের আওতায় আনা : আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) ও ওয়ার্ক ফ্রি ফাউন্ডেশনের ২০১৭ সালের প্রতিবেদন মতে, পাচার হওয়া ভুক্তভোগীদের ৭১ শতাংশ নারী ও মেয়ে শিশু এবং ২৯ শতাংশ পুরুষ ও ছেলে শিশু। সুপ্রিম কোর্টের ৩০ জুন, ২০২০ প্রকাশিত পরিসংখ্যান মতে, সারা দেশে এ সংক্রান্ত বিচারাধীন মামলা রয়েছে ৪ হাজার ৬০১। কেন বিচার হয় না—এমন প্রশ্নের জবাবে আইনি সহায়তা দানকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতির প্রেসিডেন্ট অ্যাডভোকেট সালমা আলী বলেন, বিয়ে করে অনেক স্বামী স্ত্রীকে বিক্রি করে দেয় দালালদের কাছে। অনেকেই স্বামীর সঠিক নাম ঠিকানা বলতে পারেন না। তারা দরিদ্র । তাই অর্থাভাবে মামলা চালিয়ে নেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। রয়েছে দীর্ঘসূত্রতা। পাচার আইনে ভুক্তভোগী ও সাক্ষীর নিরাপত্তার বিষয়টি থাকলেও লোকবলের অভাবে তা সম্ভব হয় না। পক্ষান্তরে পাচারকারী চক্র প্রভাবশালী হয়।
দক্ষতা উন্নয়নে গুরুত্বারোপ :ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শরণার্থী ও অভিবাসনবিষয়ক গবেষণা সংস্থা রামরুর গবেষণায় দেখা যায়- করোনাকাল শেষে দেশের নারী অভিভাসন উল্লেযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। সবুজের অভিযান ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক বেগম বলেন, এখন শহরের বস্তিগুলোতে দালালদের তৎপরতা বেড়েছে। তাদের গবেষণা বলছে, ৮০ শতাংশ নারী বিএমইটিকে না জানিয়ে দালালের মাধ্যমে বিদেশে যায়। তাই নিরাপদ অভিবাসনের ওপর গুরুত্ব দেন রামরুর প্রধান অধ্যাপক ড. তাসনিম সিদ্দিকী। তিনি বলেন, নারী অভিবাসন নিরাপদ করতে যে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় তা আধুনিক করে তথ্যপ্রযুক্তিকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। দ্বিতীয়ত তাদের প্রত্যেকের মোবাইল ব্যবহারে নিশ্চয়তা দিতে হবে। তৃতীয়ত অভিবাসী নারী শ্রমিকদের পরিবারকে সরকারের পক্ষ থেকে মনিটরিংয়ের মধ্যে রাখতে হবে। ভুক্তভোগী অভিবাসী নারী শ্রমিকের জন্য সরকারে আশয়কেন্দ্র করার ওপরও গুরুত্ব দেন এই বিশেষজ্ঞ।