স্পষ্টবাদিতায় অনন্য ‘ইত্যাদি’

আবু সাঈদ

 

বরাবরের মতো এবারও ঈদের আনন্দকে বহুগুণে বাড়িয়ে দিল ‘ইত্যাদি’। বিনোদনের মাধ্যমেও যে চমত্কার ও নান্দনিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ নানা বার্তা দেওয়া যায়, সেটাই আবারও নতুন করে জানান দিল দর্শকনন্দিত অনুষ্ঠানটি। দুর্নীতি, প্রযুক্তির অপব্যবহার, সড়ক দুর্ঘটনাসহ সমসাময়িক নানা বিষয় হানিফ সংকেতের মতো তাঁর অনুষ্ঠানকেও করে তুলেছে স্পষ্টবাদিতায় অনন্য। উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের ঈদের কেনাকাটা সম্পর্কিত তিনটি বিষয় উঠে এসেছে তিনটি মিউজিক্যাল ড্রামায়। কোনো প্রকার দরাদরি ছাড়াই এক দামে উচ্চবিত্তের কেনাকাটার ধরন দেখে বিক্রেতার মন্তব্য, ‘মনে মনে বলি, কোথায় এঁরা পায় যে খুঁজে টাকার চোরা গলি।’ মধ্যবিত্তের কেনাকাটা দেখে বিক্রেতার মন্তব্য, ‘সত্ পথের আয়, হিসেব করে ব্যয়।’ আর অতি বাস্তব ও চিরায়ত একটি সত্য উঠে এসেছে নিম্নবিত্তের কেনাকাটা দেখে এক বিক্রেতার মন্তব্যে, ‘সুখী হতে পয়সা লাগে না।’ আর এই ‘পয়সা’র জন্য কতজনের যে কতশত দুর্নীতি ও অনিয়মের উত্সব, তা ছোটবেলার নানা ছড়ার মাধ্যমে চমত্কারভাবে তুলে ধরা হয়েছে। তাতে অভিনয় করেছেন চঞ্চল চৌধুরী, মম, ঈশিতা ও শহীদুজ্জামান সেলিম। সংগীতশিল্পী না হয়েও শিল্পীরা বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে চমত্কার কণ্ঠ দিয়েছেন। খাবারে ভেজাল, বৃক্ষনিধন, সামাজিক সম্পর্কের অবনতি, সড়ক দুর্ঘটনা, মাদকের ব্যবহার, সুউচ্চ দালান নির্মাণে বা যান চলাচলে নিয়ম না মানাসহ সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয় উঠে এসেছে ছড়ার আদলে করা এই পর্বটিতে। এই একটি আইটেমেই উঠে এসেছে দেশের পুরো চালচিত্র। আবার ফাইল আটকে বাড়তি ‘পয়সা’ নেওয়ার জন্য যেসব কর্মকর্তা পাঁয়তারা করেন, তাঁদের জন্য চমত্কার বিদ্রুপ হলো, ‘ফাইল হারানোর মাইকিং’।

আলীবাবা ও চল্লিশ চোরকে নিয়ে কমেডি একটি গানে এমন চিত্র ফুটিয়ে তুলতে দেখানো হলো ‘চিচিং ফাঁক’ বলে পাহাড়ের গুহায় গিয়ে এখন আর লাভ নেই। ওই গুহাই এখন শূন্য, ‘চলছে বাইরে চুরির খেল, চলছে দখলদারির খেল।’ আলীবাবা, চল্লিশ চোরের সর্দার ও আলীবাবার পালিতা মেয়ে মর্জিনার সুরেলা কথোপকথনে একটি রম্য, অথচ বিদ্রুপাত্মক এক চিত্র উঠে এসেছে। মীর সাব্বির, মিলন ও নাদিয়া চমত্কার অভিনয় করেছেন এই পর্বে। সময়ের পরিবর্তনে বেশভূষার এমন পরিবর্তন সমাজের নানা অসঙ্গতির দিকে বিদ্রুপের তীরও ছুড়ে দেয়। সময়ের গুরুত্ব তুলে ধরার পাশাপাশি এবারের দর্শক পর্বটি সাজানো হয়েছে প্রতীকী ঘড়ি দিয়ে। দর্শক পর্বের নাটিকায় চমত্কার দার্শনিক বার্তা তুলে ধরা হলো ‘শুধু সময় কাটালেই চলবে না, সময়কে কাজে লাগাতে হবে।’ এই পর্বে মিথিলাকে কিছুটা মলিন মনে হলেও অপূর্ব ছিলেন বেশ উজ্জ্বল। তবে তাত্ক্ষণিকভাবে দর্শকরা চমত্কার অভিনয় করেছেন। সময়ের প্রবাহে আমাদের সুখী-সুন্দর জীবনের স্বর্ণালি পারিবারিক অতীত-ঐতিহ্যও হারিয়ে যেতে পারে না। কিন্তু এমনটিই করা হচ্ছে বর্তমানের অনেক নাটকে। বাবা-মা-ভাইবোন-চাচা-চাচি চরিত্রগুলোকে বাদ রেখে গুটিকয়েক চরিত্রের মধ্যে যে কিছু নাটক সীমাবদ্ধ রাখা হচ্ছে, সে বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। বর্তমানে কিছু অসাধু মিডিয়া ব্যবসায়ীদের এমন কর্মকাণ্ড সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে বিভিন্ন অভিনয়শিল্পীদের প্রতীকী ক্ষোভ সমাবেশের মধ্য দিয়ে। টিভি অনুষ্ঠানে লাইভ, অর্থাত্ সরাসরি সম্প্রচারের পাশাপাশি বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তির যুগে যুক্ত হয়েছে ‘ফেসবুক লাইভ’। কিন্তু অন্যের বিপদকে পুঁজি করে নিজের জনপ্রিয়তা বাড়াতে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ে অনেকে। একটি সড়ক দুর্ঘটনায় রিকশাচালকসহ দুইজন যাত্রী মারাত্মক আহত হওয়ার পরও তাঁদের হাসপাতালে না নিয়ে কেউ কেউ শুরু করেন ‘ফেসবুক লাইভ’। মানুষের এমন অমানুষ হয়ে ওঠার দিকটির দিকে চরম বিদ্রুপ ছুড়ে দিল একটি খণ্ড নাটিকা। এবারের নানি-নাতি পর্বটিও ছিল বেশ উপভোগ্য। ‘ইত্যাদি’র অন্যতম আকর্ষণ বিদেশিদের পর্ব। বিদেশিরা আঞ্চলিক ভাষায় গ্রামের সহজ-সরল মানুষের চরিত্রে অভিনয় করে তুলে ধরলেন নারী অধিকার ও নারী শিক্ষার ওপর চমত্কার একটি বিষয়। বরাবরই বিদেশিদের এই পর্বটি শেষ করা হয় চমত্কার একটি সামাজিক বক্তব্য দিয়ে, আর তারপরই শুরু হয় বিদেশিদের দিয়ে বাংলা গানে জমজমাট নাচ। যা দর্শকরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখেন এবং ভাবতে থাকেন বিদেশিদের মাধ্যমে তুলে ধরা বক্তব্যের বিষয়ে। আর এই অসাধারণ ও অসম্ভব কাজটি একমাত্র হানিফ সংকেতের দ্বারাই সম্ভব। এ ধরনের বিষয়গুলো বাংলাদেশ টেলিভিশন ফিলার হিসেবে চালাতে পারে। নিজ উদ্যোগে হানিফ সংকেত এই বিষয়গুলো উপস্থাপন করে দেশের কল্যাণে একটি বড় ভূমিকা রাখছেন, যা অবশ্যই প্রশংসনীয়। সবকিছু মিলিয়ে বলা যায়, এবারের ঈদের আনন্দের সঙ্গে একাত্ম হয়ে আনন্দের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে সবার প্রিয় উপস্থাপক হানিফ সংকেত নির্মিত এ অনুষ্ঠান। ঈদের এ ‘ইত্যাদি’তেও ছিল দেশাত্মবোধক গান—‘বাংলাদেশের আকাশে যে-ই উঠল ফুটে চাঁদের হাসি, বলল আকাশ, এ দেশটাকে ভালোবাসি, ভালোবাসি, ভালোবাসি, ভালোবাসি।’ আর এই গানের রেশ ধরেই অনুষ্ঠান শেষ করে হানিফ সংকেত বললেন, ‘ঈদ আসে চলে যায়—থাকে একদিন, ঈদের শিক্ষা হোক অন্তবিহীন। সে শিক্ষা ভালোবাসি ভালোবাসি, এসো দাঁড়াই পাশাপাশি।’ সব ভেদাভেদ ভোলার আহ্বান জানিয়েই শেষ করলেন ইত্যাদি। হূদয়ছোঁয়া উপস্থাপনা, চমত্কার ছন্দময় গাঁথুনি, নানা বিষয়ের সুসমন্বয় থাকে বলেই ‘ইত্যাদি’ সবসময়ই অনন্য, অনবদ্য, কালজয়ী।