প্রতিবছরের মতো এবারও রাজধানীতে মশাবাহিত সংক্রামক ব্যাধি ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। চার ঘণ্টায় একজন ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছেন। প্রতিনিয়তই চিকিত্সকের চেম্বার এবং হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের প্রাধান্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দু-এক দিনের উচ্চমাত্রার জ্বর, সঙ্গে কোমর ব্যথা ও চোখ বা মাথা ব্যথা নিয়ে তারা চিকিত্সকের শরণাপন্ন হচ্ছেন।
চিকিত্সকরা জানান, জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এই রোগের চিকিত্সা ও প্রতিরোধ করা সম্ভব। যেহেতু ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া এডিস মশার কামড়ে হয়, তাই রোগের বিস্তার, লক্ষণাদি ও রোগটি সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকলে এ রোগ থেকে অনেকাংশে মুক্ত থাকা সম্ভব।
জ্বর আসলে চিকিত্সকরা শুধু প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। অ্যান্টিবায়োটিক বা এসপিরিন জাতীয় ওষুধ না খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে চিকিত্সকরা বলেন, এই সকল ওষুধ খেলে মৃত্যু ঝুঁকির আশঙ্কা রয়েছে। টানা ৪/৫ দিন জ্বর না কমলে কিংবা শরীরে উচ্চ তাপমাত্রার সঙ্গে প্রচণ্ড ব্যথা থাকলে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকের পরামর্শ নিতে হবে। এই ধরনের উপসর্গই ডেঙ্গু কিংবা চিকুনগুনিয়া জ্বরের। এই রোগ প্রতিরোধে এডিস মশার বংশবিস্তার নির্মূলের কোনো বিকল্প নেই বলেও চিকিত্সকরা উল্লেখ করেন।
ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার জীবাণু এডিস মশা দ্বারা বাহিত হয়। মশাটি সাধারণত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন স্থির এবং স্বল্প গভীর জলাধারে বংশবিস্তার করে। এছাড়া বাসাবাড়ি ও আঙ্গিনায় জমে থাকা পরিষ্কার পানি, যেমন ফুলের টব, এয়ারকুলার বা ফ্রিজের নিচে জমে থাকা পানি, ফেলে দেওয়া ডাব বা নারিকেলের খোসা, টিনের কনটেইনার, গাড়ির টায়ার ইত্যাদির মধ্যে জমে থাকা পানিতে এডিস মশা বংশবিস্তার করে। রোগের প্রাদুর্ভাব নভেম্বর পর্যন্ত থাকে বলে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা উল্লেখ করেন। মশাটি শুধু দিনের বেলায় গোধূলিলগ্নেই কামড়ে থাকে। এটি কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয়। একমাত্র সংক্রমিত মশা কামড়ালেই রোগটি হয়। একই মশার কামড়ে চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়।
তবে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে এডিস মশার বংশবিস্তার নির্মূলে কর্মকাণ্ড চোখে পড়েনি। এর ওপর রাজধানীর গলিপথের অধিকাংশ রাস্তঘাট মেরামত করা হয়নি। সরকারি কলোনির রাস্তাঘাটের বেহাল দশা। এই সকল এলাকায় জমে থাকা স্বচ্ছ পানিতে এডিস মশা বংশবিস্তার করছে। আজিমপুর কলোনি, হাতিরপুল, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, ভূতেরগলি, কাঠালবাগান, গুলশান, বনানী, উত্তরা, মিরপুর, মানিকনগর, বাড্ডা, খিলগাঁও, সবুজবাগ এলাকায় এডিস মশার বিস্তার বেশি।
প্রখ্যাত মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ বলেন, ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া থেকে রক্ষা পেতে হলে এডিস মশা নিধনের কোনো বিকল্প নেই। তিনি বলেন, যাদের একবার ডেঙ্গু হয়েছে তাদের চারবার পর্যন্ত হওয়ার সম্ভবনা থাকে। এক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। চিকুনগুনিয়া একবার হলে সাধারণত দ্বিতীয়বার হওয়ার সম্ভবনা নেই। এদিকে চলতি জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে রাজধানীতে গড়ে প্রতিদিন কমপক্ষে সাতজন (চার ঘণ্টায় একজন) ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হন। ১ থেকে ৮ জুন পর্যন্ত ৫৫ জন ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্তের সংখ্যা ৯। এছাড়া বর্তমানে রাজধানীর বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ২৩ জন চিকিত্সাধীন।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার জীবাণুবাহক এডিস মশার বংশ বিস্তার নির্মূলে কেন্দ্রীয়ভাবে কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে। সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
ঢাকা দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকন বলেন, আমরা ঘরে ঘরে কার্যক্রম চালাচ্ছি। আমাদের প্রধান কাজ হলো জনসচেতনতা তৈরি। কারণ সাধারণ মানুষ ঘরদোর পরিষ্কার রাখলে ও পানি জমতে না দিলে এডিস মশা বংশ বিস্তার করতে পারবে না।