অতিমারি করোনা-পরবর্তী রাশিয়া বনাম ইউক্রেন যুদ্ধ (ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণে মূলত রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ) বিশ্বের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক তথা মানবিক শৃঙ্খলাকে বিপর্যস্ত করে দিচ্ছে। অপরিণামদর্শী পরিণতির দিকে ধাবিত হচ্ছে শক্তিধর রাষ্ট্রসমূহ। আমরা বিশ্বায়নের যুগে আছি, এখানে সম্ভাবনা ও সংকট উভয়ই সামগ্রিক। সহজ কথায়, ‘বিশ্বায়ন’ একটি অভিযাত্রা, যেখানে সব দেশ একটি জাহাজের ভিন্ন ভিন্ন ডেকের যাত্রী। কেউ প্রথম শ্রেণির যাত্রী, কেউবা আবার দ্বিতীয়, তৃতীয় শ্রেণির। এই যাত্রায় কোনো দুর্যোগ এলে তার প্রভাব ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় সবার ওপরেই পড়ে। ঠিক সে সূত্রানুসারে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের নেতিবাচকতা সব দেশকে প্রভাবিত করছে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে অর্থনীতি। অর্থনৈতিক তত্ত্ব আর কৌশল দিয়ে বিদ্যমান সংকট কতটুকু দূর করা যাবে, তা নিয়ে সংশয় আছে, তবে মানবিক ঐক্য ও প্রচেষ্টার মাধ্যমে অনেকাংশে এ পরিস্থিতির উত্তরণ সম্ভব।
জাতিগতভাবে বাঙালি অদম্য। লড়াকু। আজন্ম-সংগ্রামী। সুতরাং আমাদের নিত্যকার জীবনাভ্যাসের মধ্যেই আছে বৈশ্বিক সংঘাতজাত প্রভাব থেকে মুক্তির পথ। যেমন: দেশের কোনো এলাকায় বা অঞ্চলে যখন প্রাকৃতিক দুর্যোগ আসে তখন আক্রান্ত এলাকার প্রতিটি পরিবার তার সদস্যদের নিয়ে নিজেদের বিদ্যমান সহায়-সম্পত্তি রক্ষা এবং সীমিত ব্যয়ের মধ্য দিয়ে সংকটকাল অতিক্রম করার চেষ্টা করে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষেত্রে এটা আমাদের চিরায়ত কৌশল ও প্রমাণিত সফল উদ্যোগ। অনুরূপভাবে, অন্য কোনো সমস্যা বা সংকটের উদ্ভব হলেও পরিবারের সদস্যরা সম্মিলিত প্রচেষ্টায় উত্তরণের পথ খোঁজে। আমরা বর্তমানে সাড়ে ১৬ কোটি মানুষের একটি বিশাল পরিবার। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধভাবে ও ধৈর্য সহকারে যদি এই সংকটকাল অতিক্রম করতে পারি, তাহলে আমাদের সামনে আছে অমিত সম্ভাবনা ও সমৃদ্ধি। আমাদেরকে এ সময়ে আরো বেশি কর্মমুখী ও উত্পাদনমুখী হতে হবে। সেটি সুনাগরিক হিসেবে কর্তব্যও বটে।
জাতিসংঘের ইন্টারন্যাশনাল মাইগ্রেশন রিপোর্ট-২০১৭ অনুযায়ী, বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশের দক্ষ জনশক্তির সংখ্যা ৭০ লাখ। তবে বর্তমানে তা ১ কোটি ছাড়িয়েছে। আমরা তাদের বলি ‘রেমিট্যান্সযোদ্ধা’। বৈশ্বিক এই সংকটে তারা প্রত্যেকে তাদের পরিবারের জন্য যদি মাসে ২০০ ডলার করে পাঠায় তাহলে সম্মিলিতভাবে দেশে আসবে ২ বিলিয়ন ডলার। আর ১২ মাসে আসবে ২৪ বিলিয়ন ডলার। ইন্টারন্যাশনাল মাইগ্রেশন রিপোর্ট-২০২২ অনুযায়ী বাংলাদেশে ২০২১ সালে ২১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। যদিও হুন্ডির মাধ্যমে রেমিট্যান্সের একটি বড় অংশ এদেশে আসে, যা অদৃশ্যভাবে অর্থনীতিতে শক্তি জোগায়। তাছাড়া, রেমিট্যান্সের বাইরে এক্সপোর্ট ও অন্যান্য সোর্স তো আমাদের আছেই। বর্তমান সময়ে প্রতিকূল কারণে সবারই রিজার্ভ কমছে, বাড়ছে মুদ্রাস্ফীতি। উল্লেখ্য, রিজার্ভের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক নিরাপদ মানদণ্ড অনুযায়ী আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার পর্যাপ্ত উদ্বৃত্ত নেই সত্য, তবে ঘাটতিও নেই।
বাঙালি সংস্কৃতির একটি আদি নীতি হচ্ছে সাদাসিধে জীবনযাপন বা মিতব্যয়িতা। সারা জীবন বাড়ির মুরুব্বিদের বলতে শুনেছি, অর্থের অপচয় কোরো না, সঞ্চয় করো, স্থায়ী আমানত গড়ো। এ পরামর্শ কিন্তু সংকটের সতর্কবার্তা নয়, এটি নিরাপদ ও সচ্ছল জীবনের মূলমন্ত্র। এটি মাঙ্গলিক পরামর্শ। সংকট আসার আগেই যদি সতর্কতা অবলম্বন করা যায় তাহলে তো সংকট সৃষ্টির সম্ভাবনা অনেকাংশে হ্রাস পায়। সে বিবেচনায় বঙ্গবন্ধুকন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ‘কৃচ্ছ্রতাসাধন’ একটি নিগূঢ় অভিভাবকসুলভ পরামর্শ। তার পরামর্শ অনুসরণ করলে ব্যক্তি পর্যায়ের কল্যাণ-ফল জাতীয় পর্যায়ে প্রতিফলিত হবে। তাছাড়া, জ্বালানি ব্যয় সাশ্রয়কল্পে আমদানি নিয়ন্ত্রণ ও বিদ্যুতের শিডিউল লোডশেডিং এবং অপচয় রোধ একটি কার্যকর উদ্যোগ। সবার উচিত এ উদ্যোগকে ধৈর্য সহকারে গ্রহণ করা। বিলাসিতাকে সাময়িক সময়ের জন্য বর্জন করা। সব দেশই নিজের মতো করে তাদের অর্থনীতি বাঁচানোর চেষ্টা করছে। অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বলছে, ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য দুর্বল প্রবৃদ্ধি, শক্তিশালী মুদ্রাস্ফীতি এবং সাপ্লাই চেইনের সম্ভাব্য দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতির মধ্য দিয়ে বিশ্ব অর্থনীতিকে ‘ভারী মূল্য’ দিতে হবে। ইউরোপ জুড়ে জ্বালানিসংকট মোকাবিলায় নানা রকম নিষেধাজ্ঞা ও জরিমানার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যেমন : ইতালি ও জার্মানিতে সন্ধ্যার পরে সব দোকানপাট ও আলোকসজ্জা বন্ধ, গরম পানির গোসল বন্ধ। জার্মানিতে ফেস-২ সর্তকতা জারি। ফ্রান্সে দোকানের দরজা বন্ধ রেখে এসি ব্যবহার না করলে ৭৫০ ইউরো জরিমানা। মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ কতৃর্ক মে মাসে ৫০ বেসিস পয়েন্টের ভিত্তিতে দ্রুতগতিতে সুদের হার বাড়ানো ইত্যাদি।
অর্থনৈতিক মানদণ্ড বা সূচকে আমরা এখন উন্নয়নশীল দেশ। এক্ষেত্রে আমাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতার বিবর্তন হয়েছে গাণিতিক হারে আর মনস্তত্ত্ব বা জীবনশৈলীর বিবর্তন হয়েছে জ্যামিতিক হারে। অর্থাৎ উন্নয়নশীল দেশের নাগরিক হলেও আমাদের একটি বড় অংশের জীবনাচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গি এখন উন্নত দেশের নাগরিকদের মতোই। তাছাড়া, প্রান্িতক থেকে মধ্যবিত্ত পর্যায়ের মানুষের জীবনমানেরও বেশ দ্রুত উন্নয়ন হয়েছে। আমাদের খাদ্যাভ্যাস, পোশাক-পরিচ্ছদে এখন শৌখিনতার ছোঁয়া লেগেছে এবং সেটি প্রায় সর্বজনীন। ফলে জীবনযাপনের ধারাবাহিকতায় একটুখানি ছন্দপতন ঘটলেই আমরা প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছি, হতাশ হয়ে যাচ্ছি। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে, যুদ্ধটা ব্যষ্টিকের হলেও এর প্রতিফল পড়ছে সামষ্টিকের ওপরে। আর বাংলাদেশ একটি উদীয়মান অর্থনীতির দেশ। গাছের জীবনচক্রকে উদাহরণ হিসেবে বলি, উদীয়মান পর্যায়ে একটি গাছের কাণ্ড, শাখা-প্রশাখা থাকে সজীব, তরুণ। তখন তার সুরক্ষার ও যত্নের প্রয়োজন হয়। আমাদের অর্থনীতিরও সুরক্ষা ও আন্তরিক যত্নের প্রয়োজন, যাতে কোনো এক্সটার্নাল-ফোর্স তার বিকাশ পর্যায়কে নষ্ট না করতে পারে। আর সেজন্য প্রয়োজন আমাদের সংযম ও সংহতি।
বাঙালি জাতিসত্তার ইতিহাস ও ঐতিহ্য হচ্ছে মানবিক সম্প্রীতি। এই সম্প্রীতির শক্তিতে আমরা আমাদের ভাষার অধিকার, মুক্তির অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছি, নানা সময়ের প্রাকৃতিক বা জাতীয়-আন্তর্জাতিক বিপর্যয় মোকাবিলা করেছি। সেই শক্তিমত্তার অনন্য উৎস থেকে আমরা সাড়ে ১৬ কোটি জনগণ কি একবার সমস্বরে বলতে পারি না যে, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমরা আপনার সঙ্গে আছি সব সংকট ও সম্ভাবনায়। আপনি লড়ে যান অদম্য প্রত্যয়ে যে লড়াই শুরু করেছেন পঁচাত্তরের পর থেকে, যে লড়াই আপনার হাত ধরে পুনর্জাগরণ পেয়েছিল একাশিতে, যে লড়াই আপনার নিরন্তর সারথি।’ আমাদের জন্য কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের উক্তি স্মর্তব্য—সংকোচের বিহ্বলতা নিজেরে অপমান,/সঙ্কটের কল্পনাতে হোয়ো না ম্রিয়মাণ।/ মুক্ত করো ভয়, আপনা মাঝে শক্তি ধরো, নিজেরে করো জয়।
লেখক : কর্মকর্তা, বাংলা একাডেমি