মরে যাচ্ছে মাছ-গাছপালা, হুমকির মুখে পরিবেশ

মির্জাপুরে কারখানার কেমিক্যাল ও মনুষ্য বর্জ্যে দূষিত নদী খাল বিল

টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে শিল্পকারখানার কেমিক্যালসহ মনুষ্য বর্জ্যে নদী খাল বিল দূষিত হয়ে পড়েছে, মরে যাচ্ছে মাছ, ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে গাছপালা ও ফসলি জমির। উপজেলার গোড়াই শিল্পাঞ্চলের আশপাশসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় মাছের মড়ক দেখা দেওয়ায় এলাকার জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, শিল্পকারখানার দূষিত বর্জ্য অপরিকল্পিতভাবে নদী ও খাল-বিলে ফেলার কারণেই প্রতি বছর মাছের ব্যাপক মড়ক দেখা দেয়। পানি দূষিত হওয়ার ফলে আবাদি ইরি বোরোসহ সবজি, ফল বাগান এবং বিভিন্ন প্রজাতির গাছ মরে যাচ্ছে। এ বছর নদী ও খাল-বিলে মাছের মড়ক দেখা দিয়েছে অনেক বেশি। সেই সঙ্গে এলাকার পরিবেশও পড়েছে হুমকির মুখে।

গতকাল শুক্রবার মহেড়া, কোদালিয়া, সোহাগপাড়া, রহিমপুর, সৈয়দপুর, হাঁটুভাঙ্গা, পলাশতলী ও আজগানা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ঐসব এলাকার নদী-নালা, খাল-বিল কারখানার বর্জ্যে মারাত্মকভাবে দূষিত হয়ে পড়েছে। ফলে পরিবেশও পড়েছে হুমকির মুখে। একই অবস্থা মহেড়া ইউনিয়নের মহেড়া পুলিশ ট্রেনিং সেন্টার (পিটিসির) উত্তর পাশে বয়ে চলা খাল-বিলে। পিটিসির ময়লা-আবর্জনা ক্রমাগত খালে ফেলার কারণে পানি কালচে হয়ে গেছে, দুর্গন্ধে ভরে গেছে আশপাশের বাতাস।

গোড়াই এলাকার বাসিন্দা বাবুল সিকদার ও রাজাবাড়ী কলেজের প্রভাষক মো. নুরুল ইসলাম সিকদারসহ একাধিক ব্যক্তি অভিযোগ করেন, গোড়াই শিল্পাঞ্চলের অর্ধশতাধিক শিল্পকারখানার বর্জ্য দীর্ঘদিন ধরে বংশাই নদী ও এলাকার খাল-বিলে ফেলায় পানি দূষিত হয়ে মাছে ব্যাপক মড়ক দেখা দিয়েছে।

তারা জানান, এলাকার পরিবেশ রক্ষার জন্য প্রতিটি শিল্পকারখানায় ময়লা-আবর্জনা শোধানাগার চালুর জন্য (ইটিপি প্লান্ট) সরকারি নির্দেশনা রয়েছে। অথচ মির্জাপুর উপজেলার গোড়াই শিল্পাঞ্চলে অধিকাংশ শিল্পকারখানা ইটিপি প্ল্যান্ট (ময়লা শোধনাগার) চালুর সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়ন না করে দূষিত ময়লা-আবর্জনা নদী ও খাল বিলে ফেলেই চলেছে। এতে পানি দূষিত হয়ে মাছের ব্যাপক মড়ক দেখা দিয়েছে। একই অবস্হা মহেড়া ইউনিয়নের পিটিসির আশপাশে। তদন্ত সাপেক্ষে পানি দূষণ বন্ধে দ্রুত ব্যবস্হা নেওয়ার জন্য এলাকাবাসী ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন।

বংশাই লৌহজং নদীর পাশাপাশি মির্জাপুর পৌরসভা, মহেড়া, জামুর্কি, ফতেপুর, বানাইল, আনাইতারা, ওয়ার্শি, ভাতগ্রাম, ভাওড়া, বহুরিয়া, গোড়াই, লতিফপুর, আজগানা, তরফপুর ওবাঁশতৈল ইউনিয়নের ৩৫ খালের কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এলাকার একশ্রেণির মাটি ব্যবসায়ী ও ভূমি দস্যুরা দিন দিন এসব খালের দুই পাশ দখল করে আবাদি জমি, রাস্তাঘাটা ও বসতি গড়ে তুলেছে। উল্লেখযোগ্য খালের মধ্যে রয়েছে মির্জাপুর পৌরসভার বারই খাল, বংশাই ছোট নদী, শুভল্যা-বরাটি খাল, জামুর্কি-গুনটিয়া খাল, আছিমতলা-কদিমধল্যা-শুভুল্যা খাল, থলাপাড়া-পারদিঘি খাল, ভুলয়া-কুড়াতলী খাল, মহেড়া-ফতেপুর খাল, চুকুরিয়া-বানাইল খাল, ওয়ার্শি-নাগরপাড়া খাল, দেওহাটা-বহুরিয়া খাল, ভাওড়া-বহুরিয়া খাল, ভাতগ্রাম-ইচাইল খাল, বহুরিয়া-ওয়ার্শি খাল, গোড়াই-নাজিরপাড়া-সোহাগপাড়া খাল, আজগানা-পলাশতলী খাল, লতিফপুর-তরফপুর খাল, পাথরঘাটা-তক্তারচালা খাল, জামুর্কি-চুকুরিয়া-গুনটিয়া খাল, পেকুয়া-বালিয়াজান খালসহ ৩৫টি দখল আর দূষণের কবলে পরে কোন চিহ্ন খঁুজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে এলাকাবাসী অভিযোগ করেছে। নাব্য হারিয়ে এলাকার মানুষ চরম বিপাকে পড়েছেন।

এ ব্যাপারে মির্জাপুর উপজেলা সহকারী মত্স কর্মকর্তা মো. গিয়াস উদ্দিন বলেন, এলাকাবাসীর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ঘটনাস্হল পরিদর্শন করে ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, নদী ও খাল-বিলের পানি দূষিত হওয়ার মূল কারণ হচ্ছে শিল্পকারখানার ময়লা-আবর্জনা শোধনাগার না করেই অপরিকল্পিতভাবে ফেলছে। রাসয়নিক পদার্থের মাত্রা বেড়ে গিয়ে পানি দূষণের ফলে নদী ও খাল বিলের মাছ মরে যাচ্ছে। প্রতি বছরই এ ধরনের ঘটনা ঘটছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কতৃ‌র্পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্হা নেওয়া হবে।

এ ব্যাপারে পরিবেশবাদী সংগঠন বেলার বিভাগীয় সমন্ময়কারী গৌতম চন্দ্র চন্দ বলেন, গোড়াই শিল্পাঞ্চলের বংশাই নদীতে দূষিত ময়লা-আবর্জনা শোধন না করেই অপরিকল্পিতভাবে নদীতে ফেলা হচ্ছে। পানি দূষিত হয়ে মাছের যেমন মড়ক দেখা দিয়েছে, সেই সঙ্গে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে এলাকার জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে। এ বিষয়ে প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত ব্যবস্হা নেওয়া হবে।

টাঙ্গাইল জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জমির উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট, জলজ প্রাণী ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করার জন্য যারা নদীতে ময়লা-আবর্জনা ফেলে পানি দূষিত করছে তদন্তসাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্হা নেওয়া হবে। পিটিসির এক পুলিশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ঊর্ধ্বতন কতৃ‌র্পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে এ বিষয়ে ব্যবস্হা নেওয়া হবে।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. হাফিজুর রহমান ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) মীর্জা জুবায়ের হোসেন বলেন, শিল্পকারখানাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ময়লা আবর্জনা ফেলে যেন পানি তথা পরিবেশ দূষিত না করা হয় সেজন্য তদন্তসাপেক্ষে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্হা নেওয়া হবে।