অণুজীব বিজ্ঞানীরাই এগিয়ে এসেছেন করোনা মোকাবিলায় এবং বিভিন্ন রোগের ভ্যাক্সিন আবিষ্কারের জন্য গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। আমাদের দেশের অনুজীববিজ্ঞানীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। অণুজীববিজ্ঞানী ড. সেঁজুতি ও ড. সমীর সাহা কর্তৃক করোনার জিনোম সিকোয়েন্স উন্মোচিত হয়েছে। আজকের অ্যান্টিবায়োটিক, ভ্যাকসিন বা টিকা থেকে শুরু করে ওষুধের এক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান স্টেরয়েডসহ বংশগতি, বাস্ত্তসংস্হান, বিবর্তন, পরিবেশ, খাদ্যের গাজন পদ্ধতি, জৈবপ্রযুক্তি, জ্বালানি, খনিজ পদার্থ, কৃষি, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, এমনকি ডায়াবেটিক রোগীর এক অত্যাবশকীয় ওষুধ ইনসুলিন—সবকিছুতে অণুজীব বিজ্ঞানীদের অবদান অনস্বীকার্য।
পৃথিবীতে যত অণুজীব আছে, তার ৯৫ শতাংশই মানুষের জন্য কল্যাণকর। শুধু ৫ শতাংশ অণুজীব ক্ষতিকর—যা মানুষ, পশুপাখি, গাছপালায় রোগ-ব্যাধি সৃষ্টি করে। অণুজীব ব্যবহার করে আমরা পরিবেশদূষণ দূর করতে পারি, এছাড়া খাদ্য উত্পাদন বাড়ানো, রোগ শনাক্তকরণ, রোগের প্রতিষেধক তৈরি, বিরূপ আবহাওয়ায় বীজ ও গাছ উত্পাদন করাসহ বিজ্ঞানের প্রায় সব ক্ষেত্রে অণুজীববিজ্ঞানীদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। উন্নত দেশে অণুজীব বিজ্ঞানী মানে দেশের স্বাস্হ্যসেবায় ডাক্তারদের পাশাপাশি পরিপূরক হিসেবে নিয়োজিত মহত্ একটি পেশা এবং গবেষণার মাধ্যমে দেশের নীতিনির্ধারণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন। আর বাংলাদেশে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পর্যাপ্ত চাকরি ও গবেষণার সুযোগের অভাবে বিদেশে পাড়ি জমানো কিংবা নিজের ফিল্ড পরিবর্তনে বাধ্য হয়ে অন্য পেশায় নিয়োজিত হওয়া।
১৯৭৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম অণুজীবিজ্ঞান বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশ কিছু পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অণুজীববিজ্ঞান বিভাগ চালু হয়েছে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, বিসিএস-এর টেকনিক্যাল ক্যাডারে অণুজীববিজ্ঞানীদের (অণুজীববিজ্ঞানে অনার্স-মাস্টার্স করাদের) ঠাঁই মেলেনি। কিন্তু ফিশারিজ (মত্স্য) ক্যাডার হিসেবে রয়েছে অণুজীববিজ্ঞান পদ, যাতে আবেদন করার অনুমতি নেই অণুজীববিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের।
অথচ স্বাস্হ্যসেবার মানোন্নয়নে বিসিএসে মাইক্রোবায়োলজিস্টদের (অণুজীববিজ্ঞানীদের) জন্য আলাদা ক্যাডার থাকাটা কতটা জরুরি ছিল, কোভিড ১৯-এর সংকটময় মুহূর্তে তা ভালোভাবেই টের পাওয়া গেছে। মেডিক্যাল কলেজগুলোয় লেকচারার পদে নিয়োগ প্রক্রিয়া বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি)-এর নীতিমালা অনুযায়ী সম্পন্ন হয়। প্রতিটি মেডিক্যালে অণুজীববিজ্ঞান বিভাগ থাকলেও সেখানে আবেদনের সুযোগ দেওয়া হয় শুধুই এমবিবিএস পাস করা ডাক্তারদের। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রাণরসায়নবিদ/অণুজীববিজ্ঞানী/বায়োটেকনোলজিস্ট স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করছেন।
কিন্তু তাঁদের জ্ঞানকে দেশ ও দেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করার জন্য মানসম্পন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান কয়টি আছে আমাদের? একমাত্র আইসিডিডিআরবি-তে কিছু ছেলেমেয়ে কাজের সুযোগ পাচ্ছে এবং তাতেই আইসিডিডিআরবি-র সুনাম ছড়িয়ে পড়ছে। আমরা তাদের জন্য উপযুক্ত কর্মক্ষেত্র তৈরি করতে না পারায় ৮০ জনই বিদেশ যাচ্ছেন এবং তাঁদের মেধা দিয়েই তাঁরা ইউরোপ, আমেরিকা, জাপান প্রভৃতি দেশের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকতার পাশাপাশি বিশ্বখ্যাত গবেষণাগারগুলোতে গবেষণা করছেন। যাঁরা বিভিন্ন কারণে বিদেশ যেতে পারেন না, তাঁরাও একসময় অন্যান্য সরকারি চাকরিতে চলে যান।
অথচ অণুজীববিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সারির বিষয় এবং সর্বোচ্চ মেধাবীরাই এই বিষয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায়। যাঁদের ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, জিনোম নিয়ে গবেষণা করে দেশের বিজ্ঞান ও চিকিত্সা ক্ষেত্রে অবদান রাখার কথা, তাঁরাই অনুরূপ অবদান রাখছেন, কিন্তু সেটি জাপান, ইউরোপ কিংবা আমেরিকায়। সরকার যদি কোটি কোটি টাকা খরচ করে তাদের পড়াশোনা করিয়ে তৈরি করতে পারে, তবে এ দেশে তাদের কর্মসংস্হানের ব্যবস্হা করে জাতির সেবা করার সুযোগ কেন তৈরি করা যাবে না? অবশ্যই যায়। দরকার কেবল সদিচ্ছার। অবশ্যই মেডিক্যাল কলেজগুলোয় অণুজীববিজ্ঞান বিভাগের লেকচারার নিয়োগ পরীক্ষায় এমবিবিএস ডাক্তারদের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের অণুজীববিজ্ঞানীদেরও সুযোগ দেওয়া দরকার।
সরকারিভাবে গবেষণাবান্ধব বাজেট প্রণয়ন করে গবেষণার সঙ্গে সম্পৃক্ত সব ডিসিপ্লিনের মেধাবী শিক্ষার্থীর দেশেই থেকে দেশের উন্নয়নে গবেষণার সুযোগ করে দেওয়াসহ অতি শীঘ্র বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে (বিসিএস) অণুজীববিজ্ঞান ক্যাডার সৃষ্টি করা, মেডিক্যাল সেক্টরে অণুজীববিজ্ঞানীদের অন্তর্ভুক্ত করা এখন সময়ের দাবি। পরবর্তী পৃথিবী হবে বায়োলজিক্যাল পৃথিবী। বহুমাত্রিক কারণে নিঃসন্দেহে অণুজীববিজ্ঞানের কদর অনেক বেড়ে যাবে। অণুজীববিজ্ঞানের গবেষণা পৃথিবীর জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে। ‘এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট’ থেকে শুরু করে নিত্য নতুন ভাইরাস মোকাবিলায়। কৃত্রিম মিউটেশন থেকে শুরু করে কৃত্রিম জীবন। সবক্ষেত্রেই নেতৃত্ব দেবে অণুজীববিজ্ঞান।
শিক্ষার্থী, অণুজীববিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা